অকূলের কাল।। অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী।। সুপ্রকাশ।।
'লোকটির নাম ভগবান দাস। ক্ষিতির মনে হলো স্বয়ং ভগবানই বুঝি চলে এসেছেন তাকে সাহায্য করতে। দইজুড়িতে নেমে ক্ষিতিকে সাইকেলের রডে বসিয়ে হাওয়ার বেগে সাইকেল চালাল ভগবান। তবুও ঘাটে নামতে না নামতেই পশ্চিম আকাশে টুপ করে ডুবে গেল সূর্য। ক্ষিতিকে নামিয়ে দিয়ে ভগবান বলল,— নদী পেরিয়ে যেদিকে শ্মশান দেখতে পাবেন, সেদিকেই সজা হাঁটবেন। এদিক উদিক হেলবেননি মোটে। তাইলেই লালগড় পেয়ে যাবেন।
তখনও যেটুকু আলো ছিল তাতে চারদিকে পড়ে থাকা ভাঙ্গা হাঁড়ি, পোড়া কাঠ ইত্যাদি দেখে শ্মশান চিনতে অসুবিধে হলো না ক্ষিতির। শ্মশানের গায়ে লেগে থাকা মোটা আলে পা দিতেই ঝুপ করে দিনের শেষ আলোটুকুও নিভে গেল। সেদিন সম্ভবত অমাবস্যা। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। আন্দাজে পা চালাল ক্ষিতি। আল তো সরলরেখায় চলে না, হামেশাই ডাইনে বাঁয়ে ঘুরে যায়। মাঝে মাঝেই পিছলে যাচ্ছে তার পা। একটু পরে অন্ধকার খানিক সয়ে গেল চোখে। তারাদের ক্ষীণ আলোয় ভরসা করে আল ছেড়ে ধেনোমাঠে নেমে সরলরেখায় চলতে শুরু করল সে। আর তখনই তার সামনে থেকে ছায়ার মতো কিছু সরে গেল, একটু দূরেই সমস্বরে শিয়াল ডেকে উঠল। ডাকাবুকো ক্ষিতির বুকও দুরুদুরু, ধানগাছের গোড়ায় হোঁচট খায় সে। কাঁধের ব্যাগ ক্রমশ ভারী হতে থাকে। লালগড়ের দিকেই এগোচ্ছে তো সে! মনে সন্দেহ চেপে বসতেই অবশ হয়ে ওঠে পা। দোলনের মুখ ভেসে আসে মনে, সময়ের আন্দাজ লুপ্ত হয়ে যায়। কতক্ষণ পরে, বলতে পারবে না সে, অনেক দূরে হঠাৎ-ই একটা ক্ষীণ আলো ভেসে ওঠে। নিমেষেই উজ্জীবিত শরীর, পায়ে গতি সঞ্চার হয়। আলো লক্ষ্য করে সটান পা চালায় ক্ষিতি। পায়ের তলায় শিয়াকুলের ঝোপ। কাঁটার আঁচড় অগ্রাহ্য করে পা বাড়াতেই সামনে নালা। ততোক্ষণে আকাশময় তারা ফুটেছে। অন্ধকারেও অদ্ভুত এক আবছা আলো। তারই দৌলতে লঙজাম্পে নালা পেরিয়ে যায় ক্ষিতি। ঝুরগুন্ডা ছেঁকে ধরেছে তার প্যান্ট। সেগুলো কাঁটার মতো বিঁধে চলেছে তাকে। নালা পেরোতেই চোখের সামনে মোরামের লাল রাস্তা। রাস্তার ধারে ল্যাম্পপোস্টের উপর থেকে ঝুলছে টিমটিমে বাল্ব। সেই আলোই এখন ভীষণ উজ্জ্বল লাগছে ক্ষিতির চোখে। কিছুক্ষণ আগেই মনে হচ্ছিল কোথাও পৌঁছোতে পারবে না, আর এই মুহূর্তে ভোজবাজির মতোই রাস্তার ওপারে আলোর নীচে সাইনবোর্ডে জ্বলজ্বল করছে 'বিনপুর-১ সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিকের কার্যালয়'। তার ব্যাগে থাকা সরকারি চিঠি তবে অলীক নয়! তার বাস্তব অস্তিত্ব ঘাপটি মেরে বসে আছে এখানে। গ্রাম-ট্রাম কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। খোলা প্রান্তরের মাঝখানে কয়েকটা হলুদ রঙের একতলা বাড়ি। মাঠের এক কোনায় অনেকখানি জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা বটগাছ। তার তলায় একটা খোলা গুমটি। সেখানে অন্ধকারকে খানিক সরিয়ে কেরোসিনের কুপি জ্বলছে। সামনের বেঞ্চে দু'জন লোক চায়ের গ্লাস হাতে বসে।
আবিষ্কারের আনন্দটা ফিকে হতেই একটা হালকা উদ্বেগ ঘনিয়ে এল ক্ষিতির মনে। অফিস নিশ্চয় ছুটি হয়ে গেছে এখন, কোথায় জমা দেবে তার চিঠি? আজকের দিন পেরিয়ে গেলেই তো চিঠি বাতিল!
গুটি গুটি পায়ে সে দোকানির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দোকানি তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই ক্ষিতি বলল,— দাদা, বিডিও অফিস কোনটা?
দোকানি বলল,— অফিস তো ছুটি হয়ে গেছে গা। বেঞ্চিয়ে বসে চা খেয়ে ঘর চলে যান আজ। কাল সকাল সকাল চলে আসবেন।
ক্ষিতি বলল,— আমার খুব জরুরি দরকার। আজ না হলে বিপদে পড়ে যাব।
দোকানি একটু ভাবল। তারপর বলল,— তাইলে এক কাজ করুন গা। ডানদিকের ওই শেষ বাড়িটায় চলে যান। বিডিও সাহেবের কোয়ার্টার।
ক্ষিতি একটু ইতস্তত করছিল। দোকানি তাকে তাড়া দিল,— যান না, যান। উনি ঘরেই আছেন। এই মাত্তর চা দিয়ে এলম। খুব ভালো লোক। নিভভয়ে চলে যান গা। কাজ হয়ে গেলে চা খেয়ে যাবেন। আমি আছি।
ক্ষিতি গিয়ে দাঁড়াল কোয়ার্টারের সামনে। দরজা হাঁ করে খোলা। সামনে এক ফালি বারান্দা। বারান্দায় উঠে সে গলা ঝাড়ল। ভেতর থেকে আওয়াজ এল,—
কে?
ক্ষিতি ঘরে পা বাড়াল, তার হাতে উদ্যত সরকারি খাম। সেদিকে তাকিয়েই বিডিও বললেন,— ও! ট্রেনিং!
তাঁর গলায় তাচ্ছিল্য ঝরে পড়তে স্পষ্ট শুনল ক্ষিতি। তিনি এবার বললেন,— তা এত দেরি কেন? অফিস তো বন্ধ হয়ে গেছে।
ক্ষিতি দাঁড়িয়েই আছে। কথার শুরু কীভাবে করবে ভাবছে। বিডিও তার হতচ্ছাড়া দশা দেখে কিছু একটা অনুমান করলেন। সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে বললেন,— বসুন। জল খাবেন?
সহানুভূতির ছোঁয়া পেয়ে সাহস বাড়ল ক্ষিতির। সে দেখল বিডিও তরুণ এবং সুদর্শন। তার চেয়ে বয়সে হয়ত বছর পাঁচেকের বড় হবেন। সে খানিক সহজ হলো। জল খেয়ে তার ঘুরপাকের বৃত্তান্ত শোনাল। বিডিও মন দিয়ে শুনছিলেন। শুনতে শুনতে তাঁর মুখ ক্রমশ হাঁ হচ্ছে। শেষে হাঁ বন্ধ করে বললেন,— ইস্, এত ঝুঁকি নিয়ে আজই আসার কী দরকার ছিল? কাল সকালে এলেই তো পারতেন।
এবার হাঁ হওয়ার পালা ক্ষিতির। বলল,— চিঠিতে যে লেখা আছে—
বিডিও মৃদু হাসলেন। তাঁর সেই হাসির মধ্যেই সরকারি চলনের কায়দাকানুন অকথিত আছে বলে মনে হলো ক্ষিতির।'
অকূলের কাল
অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত
মুদ্রিত মূল্য : ৪০০ টাকা
সুপ্রকাশ
Comments
Post a Comment