অকূলের কাল।। অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী।। সুপ্রকাশ।।

'কিছুদিনের মধ্যেই দেখা গেল মলয়ের সঙ্গে মনোজিৎদার দাবা বেশ জমে উঠেছে। অনুপম আর প্রদীপও দাবা খেলায় পোক্ত হয়ে উঠল ক্রমশ। দাবা দিয়ে মনোজিৎদাকে কাছে টানা যাচ্ছে না, আবার অনুপম প্রদীপও সেদিকে চলে যাচ্ছে দেখে ক্ষিতির মন খারাপ হচ্ছিল। একদিন সে একঝাল তাস কিনে নিয়ে এল। তারপর ব্রিজ খেলা আরম্ভ করল। তার গ্রামের নিরক্ষর লোকেরাও অক্সন ব্রিজে ওস্তাদ। সেই ঐতিহ্যের ভাগীদার ক্ষিতিও। অনেক ছোটো থেকেই সে এই খেলা রপ্ত করেছে। দেখা গেল শচি, দিনু, প্রদীপ এবং অনুপমও অক্সন ব্রিজটা খেলতে পারে। কিছুদিনের মধ্যেই দাবা ছেড়ে ব্রিজে ভিড়ে গেল প্রদীপ অনুপম। এই চারজন ক্ষিতির মতোই পড়াশুনায় ফাঁকিবাজ। প্রতি সন্ধেয় আর ছুটির দিনে নিয়মিত তাসের আসর বসতে লাগল। দেখা গেল ক্ষিতিই ব্রিজের সব চাইতে কুশল খেলোয়াড়। কাজেই আসরের মধ্যমণি সে-ই। দিনুর 'কাকু' এই আসরেই ক্রমশ সকলের কাকু হয়ে উঠতে লাগল। এখন কাকু উপন্যাসের খাতা নিয়ে লিখতে বসলে কেউ না কেউ এসে বলে, আরে কাকু তোর ভবেনকে এখন ঘুম পাড়িয়ে রাখ। ব্রিজ হবে কখন? লেখার চাইতে ব্রিজের আকর্ষণ ক্রমশ বেশি মনে হচ্ছে কাকুর।

অভীক হস্টেলে এসেছে সবার শেষে। নরেন্দ্রপুরে ভর্তি হয়েও মাস তিনেকের মধ্যে মহারাজদের সঙ্গে গণ্ডগোলে জড়িয়ে টিসি নিয়ে জয়পুরিয়ায় ঢুকেছে। ফিজিকস। দারুণ চেহারা। লম্বা, ফরসা, চৌকো মুখ, মেদহীন টানটান শরীর। মুখের মধ্যে হালকা কঠোরতার আভাস। কথা বলার সময় চিবুকে রেখা ফেলে প্রতিটি শব্দ চেপে চেপে উচ্চারণ করে। পড়াশুনায় বেশ মনোযোগ। কর্তৃত্ব করার প্রবণতা আছে। ভালো খারাপ নিয়ে স্পষ্ট মতামত তার। সব নেশাই খারাপ, তার মধ্যে তাস খেলা নিকৃষ্টতম। তাসের আসর বসলে তার চারপাশে ঘোরাঘুরি করে আর মাঝেমাঝেই তার মতামত স্পষ্ট করে ব্যক্ত করতে থাকে। 'শালা কাকুটাই যত নষ্টের গোড়া, সব বন্ধুদের বারোটা বাজাচ্ছে'। কাকু বা অন্য কেউ তাতে কর্ণপাত করে না। তারা ব্রিজেই একাগ্র হয়ে থাকে। হতাশ না হয়ে অভীক সুযোগ বুঝে তাসের প্যাকেট হাপিশ করতে লাগল। তাতেও যখন আসরে তাসের অভাব দেখা গেল না, পুরনো নিখোঁজ হলে নতুন চলে আসে, অভীক খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ল। তারপর একদিন সে নিঃশব্দে এসে কাকুর পিছনে বসে গেল। দেখে দেখে, দরকারে কাকুকে প্রশ্নে প্রশ্নে কণ্টকিত করে ব্রিজ শেখার চেষ্টা করতে লাগল। অবশেষে একদিন ঘোষণা করল, আমিও খেলব আজ, কাকুর পার্টনার।

কাকুর ব্র্যাকেটে অভীকই ঢুকল সবার শেষে এবং কয়েকদিনের মধ্যেই সে ব্র্যাকেটের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করল নিজেকে। হস্টেলের খাওয়া চলে মেস-পদ্ধতিতে। এক মাসের জন্য একটি ছেলে মেসের ম্যানেজার নিযুক্ত হয়। তার কাজ সকাল-বিকেলের টিফিন সহ চার দফা খাবারের মেনু ঠিক করা, বাজার করা, হিসাবপত্র রাখা, মাসের শেষে একটা গ্র্যান্ড ফিস্ট দিয়ে সারা মাসের হিসাবপত্র দাখিল করা। পুরো মাসের খরচ অনুসারে ছাত্র পিছু মেস চার্জ হিসাব করে মেস সেক্রেটারির কাছে দাখিল করেই তার ম্যানেজারির মেয়াদ শেষ হয়। পরের মাসে অন্য কোনো ছাত্রকে ম্যানেজার নিযুক্ত করবে মেস সেক্রেটারি। কোন ম্যানেজার কেমন খাওয়াল তার একটা তুলনামূলক চর্চা চলে হস্টেলে। মেস চার্জ সাধারণত চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। সেই পরিমাণও ম্যনেজারের দক্ষতা ও সততার একটা মাপকাঠি হিসাবে বিবেচিত হয়। পরের বছর হোস্টেল কমিটি নির্বাচনের সময় মেস পরিচালনার সাফল্য অসাফল্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। হোস্টেল সুপার এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারের পরিচালনায় ছাত্র-কমিটির এই নির্বাচন কখনও হয় সহমতের ভিত্তিতে, কখনও বা ভোটাভুটির মাধ্যমে। নির্বাচিত এগারো জন সদস্য তাদের মধ্য থেকেই চারজন পরিচালন-সেক্রেটারি মনোনীত বা ক্ষেত্রবিশেষে নির্বাচিত করে— জেনারেল সেক্রেটারি, মেস সেক্রেটারি, কালচারাল সেক্রেটারি এবং গেম সেক্রেটারি।

তো হস্টেলের খরচ, কলেজের মাইনে, হাতখরচ ইত্যাদি নিয়ে ষাট টাকার কমে মাস চলে না কারোর। সবার বাড়ি থেকে সমান টাকা আসে না। কাকুর ব্র্যাকেটের অভীককে বাদ দিলে আর সকলের বাড়ির একই অবস্থা। কাকুর তো ষাট টাকাও সময়ে আসে না, দুশ্চিন্তা লেগেই থাকে। তার একমাত্র রোজগেরে দাদা অকালে চলে গেছেন। বৃদ্ধ বাবা মনের জোরেই এর তার থেকে হাওলাত নিয়ে টাকা পাঠান এবং একান্নবর্তী পরিবারের কারোর কারোর নীরব অনুযোগ সয়ে ধান বিক্রি করে নির্দিষ্ট সময়েই উত্তমর্ণদের ঋণ শোধ করেন। খুব দেরি হলে অমরশঙ্করের কাছ থেকে টাকা নিতে বলেন। অমরশঙ্কর অবশ্য বলা মাত্রই দিয়ে দেন, টাকা কবে ফেরত পাবেন সেই নিয়ে বাক্যব্যয় করেন না। যদিও কাকু এবাবদে তার বাবার অনুসারী, টাকা আসামাত্র প্রথমেই দাদার ধার শোধ করে আসে। দাদা সেক্ষেত্রেও রা-টি কাড়েন না। এই দাদাটির স্থিতধী চরিত্র বুঝে গেছে কাকু। না বলা কথাটি এই যে, লাগলে তো অবশ্যই নিবি, ফেরত দিতে পারলে ভালো, না পারলেও বলার কিছু নেই।

সমূহ দুশ্চিন্তার অবসান ঘটাল অভীক, কাকুর ব্র্যাকেটের স্বনিযুক্ত তত্ত্বাবধায়ক।'


অকূলের কাল
অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত

মুদ্রিত মূল্য : ৪০০ টাকা

সুপ্রকাশ

      

Comments

Popular posts from this blog

নৈশ অপেরা।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

অনন্যবর্তী।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।