হামারটিয়া।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।।

'২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে ডিডি হোমিসাইডের অবসরপ্রাপ্ত ইনস্পেকটর জাভেদ আহমেদের ঠিকানায় একটা হাতে-লেখা চিঠি পৌঁছোলে জাভেদ অবাক হলেন, কারণ ডিজিটাল যুগে এরকম চিঠি আসা প্রায় লুপ্ত হয়ে গেছে। তারপর প্রেরকের নাম দেখে তাঁর মনে হল আগে কোথায় যেন শুনেছেন। অবশেষে খাম খুলে চিঠিটা পড়তে গিয়ে নিশ্চিতভাবে মনে পড়ল তাঁর। হাতে চিঠি ধরে চোখ বুজে বসে থাকলেন প্রায় পনেরো মিনিট। তারপর বার বার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পড়লেন। হঠাৎ আপনমনে চেঁচিয়ে উঠলেন, 'বাস্টার্ড!' তাঁর স্ত্রী অবাক চোখে তাকালে বিরক্ত ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালেন জাভেদ। কয়েক দিন আগেকার সংবাদপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করলেন। আলমারি থেকে পুরোনো ফাইল খুলে দুপুর বেলা বসে থাকলেন ঝুম হয়ে। সেদিন জাভেদ সান্ধ্যভ্রমণে বেরোলেন না। সল্টলেকে নিজের বাড়ির ব্যালকনিতে চিঠি হাতে পায়চারি করলেন অস্থিরভাবে। একসময়ে সিদ্ধান্ত নিলেন চিঠির কথা তিনি ভুলে যাবেন। কিন্তু, পরদিন সকালে স্টাডিতে গিয়ে আবার তাঁর চোখে পড়ল। চিঠিটা সামনে খুলে বসে থাকলেন টানা একঘণ্টা। অবশেষে চোখ বুজে মাথা নাড়লেন নিজের মনে— এ বিষয়ে একটা স্টেপ তাঁকে নিতে হবে। এগোবার আগে কয়েক দিন সময় চাইছিলেন নিজেকে গুছিয়ে নেবার জন্য। কিন্তু, যত দিন গেল, জাভেদ আহমেদ সিদ্ধান্ত নিতে তত দেরি করছিলেন। কখনো পার্কে হাঁটতে গিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে তাঁর মনে পড়ত, একটা কাজ যেন অসমাপ্ত থেকে গিয়েছে। ডাক্তারের কাছে রুটিন চেক-আপ করতে গিয়ে হৃদযন্ত্র তাঁকে জানান দিত, হাতে সময় বেশি নেই। অবশেষে, জুলাই মাসে জাভেদ তাঁর প্রাক্তন কলিগ ইম্যানুয়েল গুহর সঙ্গে যোগাযোগ করলেন।

সল্টলেকের নির্জন বারের দোতলায় বসে বৃষ্টিস্নাত এক সন্ধ্যাবেলা ইম্যানুয়েল গুহর হাতে চিঠি তুলে দিলেন জাভেদ। শুনশান বারের ভেতর কালচে মেঘ ঢুকে পড়বার উপক্রম করছিল। সেই ছায়ায় ইম্যানুয়েলের স্থূলকায় শরীরটাকে আরও বেঢপ লাগছিল। ছাই রঙের পাঞ্জাবি আর জিন্স পরে থাকা ইম্যানুয়েলকে খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে জাভেদ বুঝলেন, বয়েসের আঁকিবুকি কতটা অভিঘাতময় হতে পারে। ইম্যানুয়েলের ভারী মুখ, আলগা চর্বির থাকে থাকে সময়ের শ্যাওলা, যখন চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেন মনে হয় আজীবন সেখানেই বসে থাকবেন। কোথাও যাবার তাড়া নেই। মন্থর গতি এবং সময় নিয়ে ধীরে কথা বলার অভ্যেস অবশ্য কম বয়েসেও ছিল। উলটোদিকে ইম্যানুয়েলের মনে হচ্ছিল, জাভেদকে বয়েসের তুলনায় বেশি বুড়োটে এবং শীর্ণকায় লাগছে। মাথার চুল পাতলা, ফুলে উঠেছে কপালের শিরা। ঢোঁক গিললে অ্যাডাম'স অ্যাপেল লাফিয়ে ওঠে। প্রায় কুড়ি বছর পর তাঁদের মুখোমুখি সাক্ষাৎ ঘটেছে। ইম্যানুয়েল গুহ, ডিডি হোমিসাইডের প্রাক্তন ইনস্পেকটর, কাঁচা-পাকা চুলে হাত বোলাতে বোলাতে চিঠিটা দু-বার পড়লেন। কালো মোটা ফ্রেমের চশমার আড়ালে তাঁর চোখ বোঝা যায় না। অজস্র আলোর ঝিকিমিকি। চিঠিটা ভাঁজ করে একপাশে রাখলেন। তারপর বেসিক প্রশ্নটা প্রথম জিজ্ঞাসা করলেন, যেটার জন্য জাভেদ প্রস্তুত ছিলেন। এই হত্যারহস্য জাভেদ সমাধান করে ফেলেছেন পঁচিশ বছর আগে। ঘটনার দিনেই খুনি ধরা পড়েছিল। সেক্ষেত্রে এখন কেন আবার এটাকে নিয়ে নতুন করে তিনি ভাবতে চাইছেন? উত্তরে জাভেদ মাথা পেছনে হেলিয়ে হাঁ করে শ্বাস নিলেন। 'ওল্ড মঙ্ক'-এ চুমুক দিয়ে বললেন, 'আমার বরাবরের খটকা ছিল।'

হামারটিয়া 
শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য  

প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী 
মুদ্রিত মূল্য : ৩৫০ টাকা

সুপ্রকাশ

Comments

Popular posts from this blog

নৈশ অপেরা।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

অনন্যবর্তী।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।