বৃক্ষমানুষের ছায়া।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।।
"গৌর ভাঙতে শুরু করেছিলেন অনেক আগে থেকেই।
যেদিন একান্নবর্তী সংসারের মহাবৃক্ষ থেকে গৌর শুকনো পাতার মতো খসে পড়েছিলেন, অনেক ল্যাটা-প্যাটা খেয়ে পড়াশুনো চালিয়ে, বেশ কয়েকটি পেশার ঘাটে-বেঘাটে এলোমেলো ঠোক্কর খেয়ে, অনেক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা-টরিক্ষা দিয়ে এখনকার চাকরিটা জোগাড় করেছিলেন— তার আগে থেকেই 'ছোটো' আর 'সাশ্রয়' শব্দ দুটো তাঁর সঙ্গী। একটা প্যান্ট, একটা জামা। চটি কিনতেন অবিশ্বাস্য কম টাকার মধ্যে— একেবারে জবাব দেওয়ার আগে সেটাকে বার বার সেলাই করে পিন মেরে চালাতেন। সস্তার হোটেলে পাঁচসিকের ডাল-ভাত-তরকারি।
তখন কীই-বা বয়স— অনন্ত খিদে। তবু, অতিরিক্ত ভাত নিতে গিয়ে চারবার ভাবতেন— পকেটের এককোণে পড়ে-থাকা খুচরো পয়সার সঙ্গে ভাতের পরিমাণ মিলিয়ে দেখতেন মনে মনে, তারপর পেটে খিদে নিয়েই খাওয়া ছেড়ে উঠে পড়তেন টেবিল থেকে। কতদিন হয়েছে হোটেলের ভেতরে পা দিয়েও সরিয়ে নিয়েছেন পা— কোয়ার্টার পাউরুটির আধখানা আর একগ্লাস চা দিয়ে সে-বেলাটা চালিয়ে দিয়েছেন। শেষ ট্রেনে নির্বাস বাসভূমিতে নেমে বাসভাড়ার পনেরো পয়সা বা চার-আনা বাঁচাবার জন্য মাইল-চারেক হেঁটে একাকী আশ্রয়ে ফিরতেন দিনের পর দিন। এমনভাবে একসপ্তাহ হাঁটার পর একদিন রাতে পাউরুটির বদলে জুটত বাসুদার হোটেলের ডাল-ভাত আর এক-টুকরো মাছ।
'জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা'— মা কথাটা খুব বলতেন।
এই সাশ্রয়ী অভ্যাস তাঁকে অর্থ-তাড়না বা ঋণ থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে— অল্পে সন্তুষ্ট থাকতে শিখেছেন।
চাকরির শুরুর দিকে যা বেতন পেতেন গৌর, তা ছোটোমাপের কাঁথার মতো। তার মধ্যে একজনই আঁটত না, তো তিনি আর হিয়া, তাঁরা দু-জন। গা ঢাকতে গেলে পা বেরিয়ে যায়— পা ঢাকতে গেলে গা! সে-নিয়ে হিয়ার কোনোকালে কোনো হেলদোল ছিল না। কেননা নিজের জীবনেই ছোটোবেলা থেকে ধান ও চালের আনুপাতিক হিসেব জানতেন হিয়া। তাঁর বাপের বাড়ির সংসারে মেয়েদের আদর ছিল না এতটুকু। জমি-জমা-বাড়ি-ঘর মিলিয়ে স্থাবর সম্পত্তি কম ছিল না, কিন্তু প্রথম থেকেই তা বাড়ির ছেলের জন্য সংরক্ষিত ছিল। সেই সংরক্ষণের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছিলেন তাঁরা। সমস্ত জমি, বাগান, বাড়ি বেচে দিয়ে শ্বশুরবাড়ির আশ্রয় নিয়েছিলেন। গৌর কিছুটা চলবার মতো রোজগারে পৌঁছোবার আগে পর্যন্ত হিয়াকে তার দিদিদের শ্বশুরবাড়িতে আশ্রিতের মতো থাকতে হয়েছে।
অন্যদিকে, মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার আগেই বহুপ্রসূতা দুর্বল ও রুগনা মায়ের নিষ্ক্রান্তি হিয়াকে একেবারে একা করে দিয়েছিল। পরীক্ষার ফিজের টাকা জোগাড় করার জন্য ছোটোবেলা থেকেই পুজোর জামা বা শাড়ির বদলে হাত পেতে বিবাহিত দিদিদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে জমিয়ে রাখতে হয়েছে তাঁকে। এইভাবেই দাঁতে দাঁত চেপে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েটের দরিয়া পর্যন্ত পাড়ি দিয়েছিলেন হিয়া।
কবে থেকে যে গৌরের সঙ্গে হিয়ার জীবনটা জড়িয়ে গিয়েছিল আজ আর তার হদিশ পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু, এই সম্পর্কের কারণেই বাপের বাড়িতে মেয়েদের প্রতি সার্বিক অবহেলার স্বাভাবিক রীতির মধ্যেও হিয়াকে অস্বাভাবিক ও মাত্রাহীন বঞ্চনা, অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য, নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র চন্দ্রশেখর ও শৈবলিনীর বাল্য-প্রণয়ের সম্পর্কের সাধারণীকরণ করেছিলেন এই বলে যে— 'বাল্যকালের ভালোবাসায় বুঝি কিছু অভিসম্পাত আছে'— প্রচুর গ্রন্থ-পাঠের সূত্রে এই বাক্যটির সঙ্গে গৌর আর হিয়ার বাল্যাবধি পরিচয় ছিল। ওই একই পরিচ্ছেদে কয়েক পঙ্ক্তি পরেই বঙ্কিমচন্দ্রর দ্বিতীয়বার সতর্কবার্তা— 'বাল্য-প্রণয়ে কোনো অভিসম্পাত আছে।' কিন্তু, হিয়া আর গৌরের জীবনে এই ঋষিবাক্যটি সত্য হয়ে দেখা দেয়নি। তাঁর জীবনের সর্বত্র হিয়ার ছোঁয়া না-থাকলে যে কী হতো একথা ভাবতেই গৌরের বুকটা আজও হিম হয়ে আসে।
নিতান্ত অনাদরের বিয়ের পরেও দীর্ঘদিন হিয়ার দুটি ভিন্ন শাড়ি ছিল না।
ছেলে জন্মাবার পর ফুটপাথের মাটিতে পাতা পসরা থেকে জামা কিনে এনে পরিয়েছেন— কিন্তু, কিনে দিয়েছেন অজস্র বই। দামি দামি হেল্থ-ড্রিঙ্কের বদলে পুষ্টিকর সুষম আহার দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এই অগ্রাধিকারের চৈতন্যই তাঁকে মুক্তি দিয়েছে অর্থাভাবের অস্বস্তিকর তিমিরাচ্ছন্ন বোধ থেকে।
—'ঝুড়ির পানে আর-ইকটু আগ্যে আস্যে বসো, জেঠু।' নিতাইয়ের হিসহিসে স্বর শুনে ভীষণ চমকে উঠলেন অন্যমনস্ক গৌর।
চমক ভেঙে বুঝতে পারলেন বাজারের কোলাহলমুখর, কোপনস্বভাব সমস্ত পরিবেশটার মধ্যে সহসা নেমে এসেছে একধরনের সচকিত-স্তব্ধতা।"
বৃক্ষমানুষের ছায়া
দুর্লভ সূত্রধর
অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
মুদ্রিত মূল্য : ৩৬০ টাকা
সুপ্রকাশ
Comments
Post a Comment