অকূলের কাল।। অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী।। সুপ্রকাশ।।

'৬৯-৭০-এ, অবশেষে ক্ষিতির কলকাতা-দর্শন। জীবনে প্রথম বার।
ক্ষিতির খুড়তুতো দাদা, তার কাকার সেজ ছেলে অমরশঙ্কর স্কটিশ চার্চ কলেজের অধ্যাপক। স্কটিশের অনেক হস্টেল। তার মধ্যে একটার নাম অগিলভি। সেই হস্টেলের অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিন্টেনডেন্ট হয়ে তিনি সেখানেই থাকেন, হস্টেলের মধ্যেই কোয়ার্টার। তাঁরই তত্ত্বাবধানে ক্ষিতির কলকাতায় আসা। স্কটিশের আর একটা হস্টেল, হরি ঘোষ স্ট্রিট যেখানে গ্রে স্ট্রিটের সঙ্গে এসে মিশেছে, নাম 'দ্য রেসিডেন্স'। এই হস্টেলটা স্কটিশ অন্য কলেজদেরকে খয়রাত করে দিয়েছে। পাঁচমিশালি কলেজের ছেলে, এমনকি চাকরি-করা লোকও এখানে জায়গা পেয়ে যায়। অমরশঙ্কর এখানেই ক্ষিতির থাকার ব্যবস্থা করেছেন।

প্রথমে অগিলভিতে, অমরশঙ্করের কোয়ার্টারে এসেই উঠল ক্ষিতি। প্রায় ঝাড়া হাতপা হয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। পরনে একটা মাখনজিনের প্যান্ট আর হাওয়াই শার্ট, একটা ছোটো ব্যাগে বোর্ড থেকে পাওয়া ডুপ্লিকেট অ্যাডমিট-মার্কস শিট, একটা পাজামা, বাড়িতে দু-ভাঁজ করে লুঙির মতো করে পরার জন্যে দুটো ধুতি, গোটা দুয়েক গেঞ্জি-জাঙ্গিয়া, কয়েকটা গল্প-কবিতা-উপন্যাস ইত্যাদি লেখা খাতা আর পকেটে তিনশো টাকা। প্যান্টের কোমরের বোতাম নেই, সেটা নেমে গিয়ে কোমরের চওড়া হাড়ে আটকে থাকে। অমরশঙ্কর কথা কম বলেন, ভাইয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখলেন, তারপর বললেন,— দুদিন এখানেই থাক, রবিবার তোর হস্টেলে নিয়ে যাব।

সেই দুদিন অমরশঙ্করের নির্দেশমতো আর জি কর, মেডিক্যাল কলেজ আর রফি আহমেদ ডেন্টাল কলেজে গিয়ে ভর্তির ফর্ম নিয়ে এল ক্ষিতি। অমরশঙ্কর তাকে বাসের নম্বর-টম্বর কীসব বলছিলেন, ক্ষিতির মাথায় ঢোকেনি। নম্বরওলা বাস এই প্রথম দেখছে সে, নম্বর বললেই বুঝে নিতে হয় কোন নম্বর কোন রাস্তা দিয়ে কোথা থেকে কোথায় যাবে। সেই ঝামেলায় না গিয়ে হেঁটেই কাজ সেরেছে সে। রাস্তাটা খানিক জেনে নিয়েছিল দাদার থেকে, বাকিটা রাস্তার লোককে জিজ্ঞেস করে খুঁজে নিয়েছে। অগিলভি থেকে বেরিয়ে বিডন স্ট্রিট, বিডন স্ট্রিট ধরে বাঁদিকে কিছুটা গেলেই বিধান সরণি, বিধান সরণির পুরনো নাম কর্নওয়ালিস স্ট্রিট। বাস তো চলছেই, ছোটো সাইজের ট্রেনের মতো ট্রামও চলছে ঘড়ঘড় করে। ট্রামের পিঠ থেকে একটা হুকওলা ডান্ডা উপর দিকে উঠেছে, হুকের মাথায় ছোটো চাকা রাস্তার উপরের ইলেকট্রিক তারের তলায় গিয়ে ঠেকেছে। নীচে চলে ট্রামের চাকা উপরে চলে হুকের চাকা। এই প্রথম দেখল ক্ষিতি। দেখার মতোই জিনিস।

প্রথমে গেল আর জি কর। সেই কলেজে প্রি-মেডিক্যাল পড়ছে শ্যামল। ক্ষিতির প্রিয়তম বন্ধু, গড়বেতায় বাড়ি। গড়বেতা স্কুলে তার এক বছরের সিনিয়ার। স্কুলে পড়ার শেষের দিকে বোর্ডিংয়ে থেকে শ্যামলদের বাড়িতেই দু-বেলা খাওয়াদাওয়া করত ক্ষিতি। মাসখানেকের মতো ছিলও তাদের বাড়িতে। সে-বাড়ির সকলেই ক্ষিতিকে ভালবাসে। বলতে গেলে সেটাও তার আর একটা বাড়ি, এখনও। শ্যামলের সঙ্গে তার নিয়মিত চিঠি চালাচালি হয়। এখানে চান্স পেলে সে সবচেয়ে খুশি হবে, শ্যামলের সঙ্গে একই হস্টেলে থাকতে পারবে। শ্যামল জানত সে আসছে। তাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে ফর্ম তুলল, তার হস্টেলে নিয়ে গিয়ে দুজনে বসে ফর্ম ভর্তি করে জমা দিল। বাসে ওঠা নিয়ে ক্ষিতির ঘাবড়ানো দেখে শ্যামল হাসল খুব। তারপর বলল, প্রথম প্রথম সকলেরই এরকম লাগে, দাঁড়াও কদিন যেতে দাও। তারপর যেদিনই সময় পাব, বিকেলের দিকে তোমায় বাসে করে এদিক ওদিক নিয়ে যাব। দেখবে সব সহজ হয়ে গেছে।

সেদিন আর অন্য দুটো কলেজে যাওয়া হল না। শ্যামলই বলল,— এখনও বেশ কিছুদিন সময় আছে। কাল একসঙ্গেই দুটো কলেজ থেকে ফর্ম তুলতে পারবে। মেডিক্যাল সোজা রাস্তা, কর্নওয়ালিস স্ট্রিট ধরে সোজা চলে যাবে। আর সেখান থেকে রফি আহমেদ কলেজ বেশি দূরে নয়। তবে অন্য রাস্তায়, লোকজনকে জিজ্ঞেস করলেই বলে দেবে।

পরের দিন তাই করল ক্ষিতি। খুব একটা অসুবিধা হল না। সকাল এগারটায় বেরিয়েছিল, দুটোর মধ্যেই ফিরে এল। একটু একটু করে কলকাতা-দর্শন বেশ হচ্ছে তার। সবচেয়ে যেটা অবাক লাগছে— সারা শহরটা, রাস্তাঘাট, মানুষ চলার জন্যে ফুটপাথ— সবই সিমেন্ট দিয়ে মোড়া। মাটি দেখতে চাইলে জায়গায় জায়গায় পার্ক আছে, সেখানে ঢুকতে হবে। সেখানে কিছু সবুজেরও দেখা পাওয়া যাবে। ফুটপাথেও কোথাও কোথাও গাছ আছে কিন্তু তার গোড়াতেও মাটির দেখা মেলে না, সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। সেসব গাছ বড়ো মলিন, ধুলোয় ঢাকা তাদের বিবর্ণ পাতা।

রবিবার সকাল সকাল ভাত খেয়ে ক্ষিতিকে সঙ্গে নিয়ে হাতিবাগান বাজারে বেরলেন অমরশঙ্কর। ফুটপাথ নাকি পায়ে হাঁটার পথ, কিন্তু সেই পথে হরেকরেকমবা দোকান, পা ফেলারই জায়গা নেই। তারই ফাঁকফোকর দিয়ে পাকা দোকান খুঁজে নিয়ে ক্ষিতির জন্যে দুটো প্যান্ট আর দুটো জামা কিনলেন অমরশঙ্কর। রেডিমেড, ছিট কিনে সেলাই করার মতো সময় কোথায়! টেরিকটের জামাপ্যান্ট, এখন এগুলোই সবাই পরছে নাকি। পরে দেখল ক্ষিতি। একটু ঢলঢলে। তা হোক, অমরশঙ্কর বললেন, মাপ ঠিকই আছে। এরপর অনেকটা শ্যামবাজারের দিকে এগিয়ে গিয়ে একটা বিছানাপত্রের দোকান থেকে তোষক, চাদর আর বালিশ কেনা হল। সেসব বগলে নিয়ে ক্ষিতি দাদার পিছু পিছু 'দ্য রেসিডেন্স'-এ ঢুকে পড়ল। অমরশঙ্কর তাকে হস্টেলে দাখিল করে দিয়ে ফিরে যাওয়ার সময় বলে গেলেন এই হস্টেলের সুপার সচ্চিদানন্দ ঘোষ তাঁর মাস্টারমশায়, স্কটিশের ইকনমিক্স বিভাগের হেড। সে যেন অন্য সব দুষ্টু ছেলেদের সঙ্গে না মেশে। অগিলভির সুপার তরুণ সান্যালও যে স্কটিশের অর্থনীতির অধ্যাপক, সেটা আগেই জেনেছে ক্ষিতি। তিনি একজন কবি, তাঁর নাম আগে থেকেই জানত সে।

একটা পুরনো তিনতলা চকমিলানো বাড়িতে এই হস্টেল। চকমিলানো বাড়ি গল্প-উপন্যাসে পড়েছে ক্ষিতি। দেখল এই প্রথম। একটা ছাদহীন ফাঁকা বর্গক্ষেত্রকে ঘিরে চারদিকে চারটি বাহুর মতো দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটি। ফাঁকা জায়গাটি উঠোন। নীচতলা আর দোতলায় সামনের দিকে টানা বারান্দা। তিনতলার পশ্চিম দিকের বাহুতে একটি মাত্র ঘর রেখে বাকিটা খোলা ছাদ। সেই ঘরে থাকেন অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপার, বিমল পানিগ্রাহী। এই তলায় সামনে বারান্দা ছাড়াও পিছনের দক্ষিণ দিকে একটা চওড়া বারান্দা আছে। একতলায় ছাত্রদের থাকার জন্য দক্ষিণ দিকে দুটি মাত্র বড়ো ঘর। উত্তর দিকের পুরো বাহু জুড়ে কলতলা আর পায়খানা। পূর্ব দিকে বিশাল দুটি ঘর। একটি রান্নাঘর, অন্যটিতে উঁচুনিচু বেঞ্চি পাতা, খাওয়ার ঘর। পশ্চিম দিকে ভাঁড়ার আর ঠাকুর-দারোয়ানদের থাকার ঘর। একতলার উত্তর-পূর্ব কোণ থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে তিনতলা পর্যন্ত। তিনতলায় উত্তর দিকের বাহুতে দুটি ছোট ছোট ঘর। একটি সামনের দিকে, সিঁড়ির পাশেই, অন্যটি পিছন দিকে কাঠের তক্তা বসানো মেঝে পেরিয়ে সিঁড়ির মাথায়। বাকি পুব দিকের বাহু আর দক্ষিণ দিকের বাহুতে দুটি দুটি করে চারটি বড়ো ঘর। দক্ষিণ দিকের বাহুতে ছাদের সঙ্গে লাগানো বড় ঘরটি ১৯ নম্বর ঘর। ক্ষিতির জায়গা হয়েছে সেই ঘরটিতে।'


অকূলের কাল
অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত

মুদ্রিত মূল্য : ৪০০ টাকা

সুপ্রকাশ
      

Comments

Popular posts from this blog

নৈশ অপেরা।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

অনন্যবর্তী।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।