শেকল ভাঙার গান।। অলোক সান্যাল।। সুপ্রকাশ।।

"ঢালু জমির মুখে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষকে চিনে নেওয়ার দুর্বার বাসনায় ঘাড় ঘুরিয়েছিল নূর। প্রথম দর্শনে ঠিক এই কথাটাই নূরের মাথায় উঁকি মারল। সামনে এখন কোনও আড়াল নেই। যেকোনও মুহূর্তে তাকে দেখতে পেয়ে যাবে। যেভাবেই হোক তার আগে গুহায় পৌঁছাতে হবে। সে কি পারবে? গুহাটা যে অনেক উঁচুতে। ভয় দ্বিধা সব ঝেড়ে ফেলে প্রাণপণে ছুটতে শুরু করল নূর। একবার মায়ের কাছে পৌঁছোতে পারলে আর কোনও ভয় নেই। চেহারায় যত তাগড়াই হোক না কেন, তার মায়ের কাছে প্রতিপক্ষ ঠিক জব্দ হয়ে যাবে।

আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে উঠল পুরন্দরের। বাইনোকুলারে চোখে লাগিয়েও ঘাস-পাতার ফাঁক গলে সে ছুটন্ত বাঘটাকে ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছে না। চামড়ার ডোরাকাটা দাগগুলোকে চেনবার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল পুরন্দর। বাঘ চেনার এটা অন্যতম উপায়। হলুদ রঙের ওপরে ডোরাকাটা দাগগুলো অনেকটা মানুষের আঙুলের ছাপের মতন। মানুষের আঙুলের ছাপ যেমন ব্যক্তিবিশেষে আলাদা হয়, বাঘেদের ডোরাকাটা দাগও তেমন। সমস্যা তৈরি করেছে তার জিপের সামনে বেখাপ্পাভাবে বেড়ে ওঠা ঝোপ। ঝোপের ফাঁক গলে শরীরের দাগগুলোকে ঠিকভাবে নজর করা যাচ্ছে না। রাজবাগের অঞ্চলে টি২৯-এর রাজত্ব। অবশ্য অনেকদিন হল এদিকটায় তার দেখা মেলেনি। অন্য কোনও বাঘও হতে পারে। হয়তো সাময়িকভাবে টহল দিতে এসেছে। দিন কয়েক পরে আবার নিজের এলাকায় ফিরে যাবে। পুরন্দর জিপের ইঞ্জিন চালু করে দ্রুত ডানদিকে এগিয়ে গেল। একটা ফাঁকা জায়গা না হলে সামনে কী ঘটছে বোঝা যাবে না। একেবারে টিলার কাছে গিয়ে থামল সে। এখান থেকে গুহামুখ এবং ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া ঘাসজমি ভালোভাবে নজরে আসছে। পুরন্দর ব্যাকুল চোখে গুহার দিকে তাকাল। চাঁদনি সম্ভবত ওখানেই আছে। ও কি এখনও বিপদ টের পায়নি? পুরন্দর ঢালু জমিতে নজর রাখল। বাইনোকুলার নামিয়ে রাখল পাশে। খালি চোখেই এখন দিব্যি সব নজরে আসছে। নূর ছুটছে বাঁচার তাগিদে। কিছুটা দূরত্বে তাকে অনুসরণ করছে একটা বড়োসড়ো হলুদ শরীর। প্রতিটা লাফের সঙ্গে কমে আসছে দুজনের ফারাক। এভাবে মেয়েটা বাঁচতে পারবে না। পুরন্দরের হাত তার অজান্তে ড্রাইভিং সিটের পাশে দাঁড় করিয়ে রাখা বন্দুককে স্পর্শ করল। শৈশব বাদ দিলে জীবনের বাকি সময়ের প্রায় সবটুকু সে জঙ্গলে কাটিয়েছে। রনথম্বোরে প্রায় একশো ডোরাকাটা প্রাণীকে কাছ থেকে দেখেছে। নূরের মতো অন্য কেউ তার এত কাছাকাছি আসেনি। বাঘেরা এমনিতে মানুষকে এড়িয়েই চলে। দুষ্টু মেয়েটা সেসব নিয়মের তোয়াক্কা করে না। বেশ কয়েকবার তো তার জিপের হাত খানেকের মধ্যেও এসে দাঁড়িয়েছে! ঘাড় ঘুরিয়ে রীতিমতো গম্ভীর ভঙ্গিতে পায়চারি করার ফাঁকে তাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করেছে। মাঝেমধ্যে আলতো সুরে আওয়াজ করেছে 'ঘাউউউ'। বাঘেদের ভাষা পুরন্দরের জানা নেই, তবে হলপ্ করে বলতে পারে নূরের সেই ডাকে যুদ্ধের আহ্বান ছিল না। দিন-দিন তাদের দুজনের সম্পর্ক যেন বাপ-মেয়ের মতো হয়ে উঠছে! মেয়েকে বিপদে পড়তে দেখে বাপ কি হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারে? বন্দুকটা ছুঁয়ে পুরন্দর সম্ভবত সেই কথাই ভাবল। তবে ক্ষণিকের জন্যই। পরমুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলে নিল। না, ওদের দুনিয়ায় মানুষের পা রাখা উচিত নয়। এতদিন ধরে সে তো মনেপ্রাণে এটাই মেনে এসেছে। আজ হঠাৎ সব ভুলে নিজেকে ভগবান রূপে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। নূরকে বাঁচানোর একমাত্র অধিকার তার মায়ের। সেই অধিকার কেড়ে নেওয়ার অর্থ প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধাচরণ করা। ওই তো, চাঁদনি গুহা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। ভীষণ হুংকার দিয়ে ছুটে যাচ্ছে নীচে! লড়াইটা যাদের, তাদের কাছেই থাক। নিজের ছানাকে বাঁচাতে বাঘিনী অনেক অসাধ্য সাধন করতে পারে। লড়াই হোক কিংবা কৌশলী ভালোবাসা, চাঁদনি তার মেয়ের জন্য তৃণীরের সব অস্ত্র প্রয়োগ করবে। নিশ্চিতভাবেই।

'ঘাউউউউ'

মায়ের গলার আওয়াজ পেতেই ছোটার গতি বাড়িয়ে দিয়েছিল নূর। পেছনের মাটিতে ভারী পায়ের শব্দ তাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে— প্রতিপক্ষ প্রায় ঘাড়ের ওপর নিশ্বাস ফেলছে। তবুও একটু আগে তার মনে মনের কোণে জমা হওয়া আশঙ্কার মেঘ মাকে দেখামাত্র জল হয়ে গেছে। মুহূর্ত পরেই মা-কে লাফিয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে দেখল নূর। নিশ্চিন্ত এবার। মা ব্যাটাকে খুব জব্দ করবে নির্ঘাত। ছোটা থামিয়ে সে এবার একরাশ কৌতূহল নিয়ে পেছনে ঘুরে দাঁড়াল। কিন্তু একী! ভেবেছিল তুমুল একটা লড়াই হবে। কই, তেমন কিছু হচ্ছে না তো!

পুরন্দরের বুকে কেউ বুঝি ভারী পাথর নামিয়ে রেখেছিল এতক্ষণ! সামনের দৃশ্য সেই চাপকে নিমেষে বাষ্পে পরিণত করল।

'টিপু!' অস্ফুটে বলে উঠল পুরন্দর। এই একটা নাম তার দ্রুত রক্ত চলাচলকে ক্রমশ স্বাভাবিক করে দিচ্ছে। এখন আর চিনতে অসুবিধা হচ্ছে না। টি২৯। পুরন্দরের কাছে তার নাম টিপু। নিখুঁত শিকারি এবং ভীষণ অনুভূতিপ্রবণ টিপু। ঢালু ঘাসজমিতে তখন দুই পূর্ণবয়স্ক বাঘ ও বাঘিনী নিজেদের মধ্যে আদুরে আলাপে ব্যস্ত। টিপু আলতোভাবে কামড় বসিয়ে দিল সঙ্গিনীর ঘাড়ে। বদলে সামনের বাঁ পায়ের ছোট্ট থাবড়া খেল মুখে। পালটা চাপড় খেয়ে চাঁদনি এবার ঘাসের ওপরে চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। সমর্পণ!

বাঘছানাদের সবচেয়ে ভয়ের কারণ তাদের বাবা— এমন বদনাম থাকলেও বাঘ কখনও তার ঔরসজাত সন্তানের ক্ষতি করে না। ছানাটি পুরুষ হলেও নয়। বরং কাছাকাছি থাকলে নিজের পরিবারকে রক্ষার দায় সে স্বেচ্ছায় নিজের মজবুত কাঁধে তুলে নেয়। আশ্চর্যের হলেও একথা সত্যি যে, শিকারের ভাগেও সে আপত্তি করে না। পুরন্দর এমন দৃশ্য আগেও দেখেছে। আর ভয় নেই। টিপু এসে গেছে। যতদিন একসঙ্গে থাকবে, পরিবারের একান্তে কাটানো সময়ের মাঝে বিরক্ত করতে আসবে না। দুষ্টু মেয়েটা এবার কিছুদিন তার আসল বাবার সঙ্গে সময় কাটাক। নিজেকে বলল পুরন্দর।"


শেকল ভাঙার গান
অলোক সান্যাল

অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী 

মুদ্রিত মূল্য : ২৫০ টাকা

সুপ্রকাশ
       

Comments

Popular posts from this blog

নৈশ অপেরা।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

অনন্যবর্তী।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।