Posts

বৃক্ষমানুষের ছায়া।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।।

Image
"সমস্ত আঙিনায় নৈঃশব্দ্য নেমে এসেছে। হেমন্তের সন্ধে। ধোঁয়া ধোঁয়া অন্ধকার। টালিখোলার দিক থেকে মাঝে মাঝে মাটি কাটা মেশিনের দূরশ্রুত ঘটাং ঘটাং। আঙিনার মানুষগুলোর শ্বাসও যেন শোনা যাচ্ছে। যেন দীর্ঘকাল পরে অনাস্বাদিত প্রশান্তির খোঁজ পেয়েছে তারা। ফকির কথা থামালেন। বিষাণের বউ-মেয়ে মুড়ি-চা এনে দিল, আজ মুড়ির সঙ্গে লাল মুলোর কুচি। গৌর লক্ষ করলেন— আজও সুজি নামের ছেলেটি বসেনি, ঠিক বাড়ির আঙিনার ভেতরেও আসেনি। সেদিনের জায়গাটাতেই সেদিনের ভঙ্গিতেই দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা ভারি কাঁচুমাচু। তার চোখ টুনাকে ততদূর অনুসরণ করছে যতদূর দেখলে অন্যদের থেকে নিজের দৃষ্টি, নিজের লক্ষস্থলের গতিপথকে আড়াল করা যায়। টুনা কিন্তু মোটেও তাকে দেখছে না। কিন্তু, তার চোখ-দুটো হাসছে যেন। গৌর সুনন্দর দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। সুনন্দ হেসে বললেন— 'দেখেছি, দেখেছি। বিয়ে-থা করা হয়ে ওঠেনি বলে ভেবো না একেবারে কাঠখোট্টা বনে গেছি। নতুন একটা গল্পের জন্ম হচ্ছে।' মুড়ি খেতে খেতে সকলেই পাশাপাশি মানুষটার সঙ্গে অনুচ্চ স্বরে কথা বলছে। আজ কয়েক জন মেয়ে-বউকেও দেখা যাচ্ছে। গৌর আর সুনন্দ এইসব কথার মধ্যে মানুষগুলোর সুখ-দুঃখের, দৈনন্দিনের খবর পেলেন। কারো...

বৃক্ষমানুষের ছায়া।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।।

Image
"সদ্য-গড়ে-ওঠা মন্দিরটার সামনে দিয়ে এগিয়ে গিয়ে তাঁরা টালিখোলাটা বেড় দিয়ে অনেকটা পথ পেরোলেন। ভাটার পেছনদিকে মজুরদের ঘর। ঘরগুলো খুব নিচু, মনে হয় প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে সেখানে ঢুকতে হয়। প্রত্যেকটা ঘরে একটামাত্র বেড়ার দরজা, জানালার বালাই নেই। এই সন্ধে-হয়ে-আসা কপিশ বিকেলেও স্ত্রী-পুরুষ মজুরেরা কাঠের ছাঁচে মাটির দলা ঠুসে কাঁচা টালি বানিয়ে চলেছে। কয়েক জন সেগুলোকে মাটিতে সার দিয়ে রাখছে। রুক্ষ-চুলের অনেকগুলো বাচ্চা ধুলোখেলায় মেতে আছে। তাদের দেহাতি শব্দের আনন্দোল্লাস ছড়িয়ে পড়ছে ঈষৎ ভারি হয়ে-আসা শেষ-বিকেলের বাতাসে। ভাটার একেবারে পুব-প্রান্তে মাটির স্তূপে তখনও একটা বড়ো মাটি-কাটা বেঁকো-মেশিন ঘটাং ঘটাং শব্দে মাটি সরাচ্ছে। ভাটার পেছনে পাড়া-ঘরের এলাকায় ঢুকে আঁকাবাঁকা খান-দুয়েক রাস্তা পেরিয়ে লোকটিকে অনুসরণ করে অনেক লোকের কৌতূহলী চোখে বিদ্ধ হতে হতে তাঁরা ভেঙে-পড়া বেড়া-দেওয়া একটা পরিচ্ছন্ন আঙিনায় প্রবেশ করলেন। গৌর অনুমান করলেন— এই সেই অগ্নিদগ্ধ গোয়াল ঘর, এখানেই পুড়ে গিয়েছিল বিষাণের বকনা বাছুরটা। গোয়াল ঘরের ডান পাশে আড়াআড়ি খান-দুয়েক ঘর, বসতঘর হবে— তার ফুটো টালির চালও প্লাস্টিক শিট দিয়ে পুলটিস দেওয়া। বসতঘ...

বৃক্ষমানুষের ছায়া।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।।

Image
"এখনও ভালো করে রোদ ওঠেনি, রাস্তার পাশের ঘাসের ডগায়, রাস্তার পাশ-বরাবর সবজির মাঠে কচি পালং-এর পাতায় ভোররাতের শিশিরবিন্দুগুলো টলটল করছে— এত সকাল বলেই বেশ একটু শীত-শীত ভাব। সুনন্দর পাশে একটা বাহারি ব্যাগ ভ্যানের মেঝেয় রাখা। সুনন্দ জানিয়েছেন— গতরাতে বাড়ি ফিরে বংশীকাকার চিরকুট পেয়ে আবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্টেশনবাজারের খ্যাপা সাহার দোকান থেকে কিনে আনা মিষ্টির প্যাকেটগুলো আছে ওই ব্যাগে। আজ আর তাঁরা বকবক করছিলেন না— সকালের নরম হাওয়া, রোদের আভাস, সবজিখেতের পেছনে সদ্য আমন ধান কেটে-নেওয়া শূন্য মাঠান জমির বিস্তার, তারও পেছনে কয়েকটা ইটভাটার মোটা বেঁটে চিমনি, মাঝে মাঝে রাস্তার একেবারে ধার-ঘেঁষা বাড়িগুলোর সামনের আঙিনায় ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অযত্নের গাছে উজ্জ্বল হলদে থোপা গাঁদা বা তারা গাঁদার গাছ, কয়েকটা সন্ধ্যামণির ঝোপ, কোনো কোনো আঙিনায় প্লট কেটে বেশ যত্ন করে বোনা ডালিয়া-চন্দ্রমল্লিকা-ইনকা-সাদা আর গোলাপি রঙের কৃষ্ণকলি, পিটুনিয়া ফোটানোর চেষ্টা দেখতে দেখতে তাঁরা এগোচ্ছিলেন। রাস্তার পাশে কোনো বাড়ির পাঁচিলের মাথা ছাড়িয়ে ঝুঁকে আছে টগর আর শিউলি গাছের মাথা— বাইরের ঘাসে ঝরা-শিউলির চির-চলিষ্ণুতা। এইসব দেখতে দে...

হামারটিয়া।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।।

Image
সুপ্রকাশ প্রকাশিত শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের উপন্যাস 'হামারটিয়া' পড়ে মতামত জানিয়েছেন সায়ন সরকার। আমরা তাঁর অনুমতি নিয়ে নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি।  ............................................. হামারটিয়া  শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য  সুপ্রকাশ মুদ্রিত মূল্য ₹৩৫০ গল্পে পরে আসা যাবে, আগে বুঝতে হবে হামারটিয়া মানে কি?? আর সেই মানের মধ্যেও রয়েছে একটা অদ্ভুত ডুয়ালিটি.....যে ডুয়ালিটি বা দ্বিধা মনখারাপের মত ছড়িয়ে রয়েছে এই উপন্যাসের পাতায় পাতায়....যা গ্রাস করেছে এই গল্পের ঘটনাক্রম, চরিত্র এমনকি পাঠক হিসেবে আমাকেও। প্রাচীন গ্রিক থেকে আসা এই শব্দ হামারটিয়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বোঝায় কোন একটি চরিত্র যখন একটি মারাত্মক ভুল করে বসে অথবা সেই ভুলটি রয়েছে তার চরিত্রের মধ্যেই এবং যে ভুলের জন্য সেই চরিত্রের অবসম্ভাবী পতন হচ্ছে..... এই মানেটাকে ধরে এগোলে পুরো দোষটাই চরিত্রের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু কখনো কখনো হামারটিয়া মানে একটু অন্যভাবেও বোঝানো হয়। সেখানে শুধুমাত্র একটি ভুল বা একটি "এরর অফ জাজমেন্ট" এর জন্যেই গল্পের মুখ্য প্রোটাগনিস্টের পতন হচ্ছে.... সেই বিশেষ ভুলটি নট...

টাঁড় পাহাড়ের পদাবলি।। মিহির সেনগুপ্ত।। সুপ্রকাশ।।

Image
'টাঁড় সেই স্থান, যেখানে শুধু ঝাঁটি, ঝাড়, জঙ্গল, খাঁ-খাঁ ভূমি, পাথর এবং অসম্ভব দরিদ্র 'ডিংলাপারা' মানুষজন। তারা ওই মালভূমির খাঁজে-খাঁজে টিলার গোড়ালিতে কিছু চাষ-আবাদ করে, অথবা আশপাশ অঞ্চলের খনিতে কয়লা, অভ্র, ম্যাঙ্গানিজ এইসব আকর তোলে। যারা এসব কাজে দড় নয়, অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া এবং গভীর অরণ্যবাসী গোষ্ঠী, তারা জংলি লতা, গাছের আঁশ এই সব দিয়ে দড়ি বোনে, বনের কাঠ চুরি করে হাই রোডের ধারে সাজিয়ে বসে বিক্রি করার জন্য। সাতঘাটের জল খেয়ে, সাতসতেরো হ্যাপা সেরে এ-রকম এক স্থানে আমার স্থিতি। এখানে ভূমির চরিত্র বড় বিশৃঙ্খলার। এ-ভূমি টাঁড় তো, ও ভূমি বহিয়ার। টাঁড়ে ভূমি বড় রুক্ষ, তথাপি বৃক্ষ সব বনস্পতি। নাবালের ভূমিতে জন্মকর্ম, ডাঙর হওয়া। সেখানে শস্য-শাবক, গাছপালা, বৃক্ষ লক্-লহমায় বাড়ে। তারা শ্যামলিমায় শ্যামল, কান্তিতে কান্ত। টাঁড়ে তা নয়। এখানের বৃক্ষ-বনস্পতির চরিত্র ভিন্ন। তাদের শরীরে কান্তভাব কম। কিন্তু তারাও কি ছায়া দেয় না? দেয়, তবে তফাত আছে। এই তফাতটি প্রকৃতি এবং মানুষের এক নতুন অধ্যায় খুলে দেয় চোখের সামনে। রুক্ষ কঠোর আদিম এই সৌন্দর্য। বিশাল-বিস্তার এই ভূখণ্ডের বেশিটাই টাঁড়। কোথাও নাবাল, বহিয়ার...

দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা ।। অনন্ত জানা ।। সুপ্রকাশ।।

Image
দেওয়ালে লেখা থেকে কাগজের পোস্টার— এই গঞ্জের এমনতর কাজের সব কিছুই এতকাল ধরে যতীশ আর শিবেশই করে এসেছে। কিন্তু সে-সবই বিনা পয়সায় বেগারস্বরূপ। এমন কী পাড়ার কাকিমা, বৌদিরা তাঁদের ইস্কুলে-পড়া বাচ্চাদের ওয়ার্ক এডুকেশনের খাতা, সদরে বিটি পড়া ভাইপো-ভাইঝিদের লেসন প্ল্যানের খাতা, প্র্যাকটিস-টিচিংয়ের পোস্টার— সেসবও বিনি মাগনায় করিয়ে নিয়েছেন। মিষ্টিকথার দাম বা অ্যামেচারের হদ্দমুদ্দ যাকে বলে। বিনিময়ে প্রাপ্য শুধু হাসি। প্রথম প্রথম দেয়াল লেখার মুন্সিয়ানা দেখে নেতারা পিঠ চাপড়াতেন, প্রশংসাও করতেন। ইদানীং সেটুকু করাকেও তাঁরা বাহুল্য বলে মনে করেন। এই দুজনের স্থায়ী কোনো পেশা না-থাকায় দুবেলা বাড়ির বাইরে দু-কাপ চায়ের পয়সা জোটাতে দুই শিল্পী (যাদের বাপ-জ্যাঠা-কাকারা, এমন-কী আড়ালে-আবডালে সহযোগী কর্মীরাও শিল্পীর বদলে ঝুলপি বা কুলপি বলে থাকেন) একেবারে জেরবার। তবে যতীশ আর শিবেশের ক্ষেত্রে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর উদাহরণ নিতান্তই খাপ খায় না। কেননা তাদের দুজনের কারোর ঘরেই খাবারই নেই! যতীশের বাপের মৃত্যুর পর তাদের বিঘে দশেক জমির প্রায় সবটাই দাদারা বাঁটোয়ারা করে নিয়ে নেবার পর তার ভাগে নিচু ডোবা জমি বর্তেছে বিঘা-দুয়ে...

দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা।। অনন্ত জানা ।। সুপ্রকাশ।।

Image
সেটা বিগত শতকের নব্বই-এর দশকের মাঝামাঝি সময়। রাঢ় বাংলার একটা মাঝারি মাপের স্টেশনে আরও একগাদা মানুষের সঙ্গে কাঁচা-পাকা চুলওয়ালা একজন মানুষকে নামিয়ে দিয়ে দূরপাল্লার এক্সপ্রেস ট্রেনের ভারি ভারি চব্বিশ বগি তার প্রলম্বিত সর্পিল গা টেনে টেনে চলে গেল উত্তরবঙ্গের দিকে। আপাতদৃষ্টিতে মানুষটির কোনো বৈশিষ্ট্য নেই— রোগাশোকা, মধ্য-বয়সী, গড় বাঙালির মতোই লম্বত্ব, গাত্রবর্ণ ঈষৎ বাদামি, সাধারণ প্যান্ট। প্যান্টের সঙ্গে হ্যান্ডলুমের পাঞ্জাবি পরনে— কাঁধ থেকে ঝুলছে সুপরিচিত নিত্যযাত্রীদের মতো একটা কালোরঙের সস্তার ছোটো কিট-ব্যাগ। তবু কেন যেন ভদ্রলোককে এখানকার স্থানীয় মানুষ বলে মনে হয় না। মুখে-চোখে, শরীরী ভাষায় কোথায় যেন গাঙ্গেয়-কোমলতা ছেয়ে আছে। ভদ্রলোকের চোখে ছিল আধা-অপরিচিতের উদ্ভ্রান্তি। বর্ধমান পেরোবার পর এদিককার অনেক স্টেশনের প্ল্যাটফর্মই একটু নিচু, কিন্তু তুলনায় চওড়া এবং এই অঞ্চলের জনবিরল বসতিগুলোর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা চাষের মাঠগুলোর মতোই একটু হা-হা ধরনের, ফাঁকাটে। প্ল্যাটফর্মের ওপর দোকানপাট নেই বললেই চলে। যে জনতা ট্রেন থেকে নেমেছিল তারা দ্রুত-পায়ে নিষ্ক্রান্ত হওয়ায় প্ল্যাটফর্মটি অচিরেই জনশূন্যতার নৈঃশব্দ...