Posts

কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্টের 'রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল'।। অনুবাদ ও টীকা : অর্ণব রায়।। সুপ্রকাশ।।

Image
হুগলী নদীর জল কেটে যত জলযান যাতায়াত করে তার মধ্যে আমার সবচেয়ে সুন্দর মনে হয় ইলিশ মাছ ধরার নৌকাগুলিকে। এই একহারা চেহারার নৌকাগুলি, যদিও লম্বায় অনেক বড়, দুদিকে সরু হয়ে যাওয়ার কারণে দেখে মনে হয় তাদের পূর্ণ দৈর্ঘ্যের এক তৃতীয়াংশ জায়গাই দখল করে আছে মাত্র। এই নৌকাগুলি মোটামুটি জনাপাঁচেক লোক বহন করতে পারে। আর মাছ ধরার মরশুমে এর সঙ্গে একটা ৬ ফিট চওড়া আর মোটামুটি ৩০০ ফিট লম্বা জাল আটকানো থাকে। এই জালের নীচের লম্বা দিকটায় হালকা হালকা ওজন আটকানো থাকে। আর ওপরের দিকটা ধরে থাকে বাঁশের কাঠামো। আর যখনই মাছ ধরার সময় আসে, বাঁশের কাঠামো সমেত জাল নেমে গিয়ে জলের ভেতরে একখানা প্রাচীর তৈরি করে দেয়। স্রোতের সঙ্গে দ্রুত সাঁতার কেটে আসা ইলিশ মাছগুলির ডানা এই জালের প্রাচীরে আটকে যায় আর তারা পালাতে পারে না। মাঝে মাঝে দেখা যায় এই বিশালাকার জালগুলো নদীর অর্ধেকটা জুড়ে টাঙানো আছে। এমনভাবে টাঙানো আছে যে দরকার পড়লে কাঠামোসুদ্ধু জালকে এতটাই গভীরতায় নামিয়ে দেওয়া যাবে যে বড় নৌকা বা স্টিমার ওপর দিয়ে গেলেও কোনো ক্ষতি হবে না। এই সময় জালসুদ্ধু নৌকাটিই স্রোতের সাথে সাথে ভেসে চলে। স্রোতের বিরুদ্ধে যাওয়ার কোনোরকম প্রচেষ্টাই জা...

কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্টের 'রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল'।। অনুবাদ ও টীকা : অর্ণব রায়।। সুপ্রকাশ

Image
এই মুহূর্তে আমাদের নদীঘাটে একখানা স্টিমার দাঁড়িয়ে আছে। আধুনিক পক্ষীরাজ। নাম ‘মির্জাপুর’। আজকাল ভারতের নদীগুলিতে যত নৌকো ইত্যাদি জলযান চলছে, তাদের মধ্যে বৃহত্তম। এই স্টিমারই আমাকে মফস্বল যাত্রায় সুখসাগরে মাত্র ছয় ঘন্টায় আরামে নিয়ে এসেছে। নয়ত বজরায় চেপে গদাইলস্করি চালে এই পথ পাড়ি দিতে কমসে কম দুদিন লাগত। স্টিমারের উঁচু চেহারা নদীর আর যত জলযান আছে সবার মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। গোটা নদীর প্রস্থ জুড়ে অসংখ্য দেশী নৌকা। তাদের চেহারা জবরজং, গতি ধীর আর কিছুতেই বাগে আনা যায় না। আমাদের স্টিমারের উঁচু মাথা তার মধ্যে সগর্বে অনেক ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এত নৌকার ভীড়ে ক্যাপ্টেনের খুবই দক্ষতা, যত্ন আর ধৈর্য্য না থাকলে অন্তত ডজনখানেকের সলিল সমাধি না ঘটিয়ে কোনও জলযানের পক্ষে এক পা-ও এগোনো সম্ভব নয়। এই বিরাট উঁচু স্টিমারের ওপর বসে আমি দুপাশের তীরের গ্রামের দৃশ্য যেভাবে উপভোগ করেছি, এতদিন এদেশের গ্রামকে সেভাবে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। বাংলার এই প্রান্তে এসে চারপাশে চাষাবাদ তবু কিছু দেখতে পাচ্ছি। একটু দেরির দিকে হলেও বৃষ্টি যে অত্যধিক হয়েছে, তারও প্রমান পাওয়া যাচ্ছে। ত্রিবেণী বা বাঁশবেড়িয়ার কাছে নদী দ...

কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্টের 'রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল'।। অনুবাদ ও টীকা : অর্ণব রায়।। সুপ্রকাশ।।

Image
নীল উৎপাদনের মরশুম যখন আসে, গোটা ফ্যাক্টরিটা আর তার সব মানুষজন যেন নতুন প্রাণ পেয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে। যদি কারখানা ছোটো হয়, সেখানে অল্প পরিমাণ নীল উৎপাদন হয়, যেমন ধরা যাক কোনো কারখানায় যদি এক মরশুমে ২৫০ মণ বা ১৭ কুইন্টাল নীল উৎপাদন হয় তাহলে এই কাজটুকু করার জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিক আশেপাশের এলাকা থেকেই পাওয়া যায়। চাষীদের বিশেষ করে এই মরশুমের জন্য কাজে নেওয়া হয়। কিন্তু, যদি ফ্যাক্টরি বড়ো হয়, যেমন মূলনাথে, সেক্ষেত্রে অন্তত শ’খানেকের বেশি লোক পাশের জেলা থেকে ভাড়া করে আনতে হয়। বেশ কিছু আসে মেদিনীপুর জেলা থেকে। কিন্তু বেশিরভাগ শ্রমিকই হলো মানভূম বা সিংভূম জেলার জঙ্গুলে আদিবাসী। বাঁকুড়ার আশেপাশের অঞ্চলে তাদের জঙ্গল মেহার-ও বলা হয়। সাধারণভাবে এদের ভূনা বা ভূনওয়া কুলি বলা হয়।   এই গরিব মানুষগুলো সম্ভবত একশো কুড়ি মাইল দূর থেকে আসে, সামান্য মাইনেতে একটা কাজ পাবার জন্য। সে কাজের মেয়াদও আবার খুবই অল্প কয়েকটা দিন। এই লোকগুলি বাড়ি থেকে রওনা হওয়ার আগে অগ্রিম হিসেবে গোটা তিনেক টাকা পায় যাতে করে তাদের অবর্তমানে তাদের পরিবারগুলি খেয়ে পরে বেঁচে থাকে। এদের মিতব্যায়িতা এমনই যে যখন এরা মরশুম শেষে ফিরে যায়,...

জনবিলাসের বারোমাস্যা।। সমরেন্দ্র মণ্ডল।। সুপ্রকাশ।।

Image
বিলাস পা বাড়াল বোর্ডিং হাউসের দিকে। এই ছোট্ট ঘিলুর বয়সেই তার ভিতর দ্বন্দ্ব শুরু হল। বোর্ডিং হাউসের দিকে যেতে যেতেই তার মনে হল, সে তো বিলাস। বিলাস সরকার। কোথা থেকে যে একটা জন এসে ওর ঘাড়ে বসল! সে মায়ের কাছে ভূতের গল্প শুনেছে অনেক। তার মনে হল জন একটা ভূত। তার ঘাড়ে চেপে বসেছে। জন নামটাকে সে মেনে নিতে পারছে না। কিন্তু সবাই ওকে জন বলে ডাকছে। আর জন ঘাড়ে চেপে বসতেই তার ভিতর কেমন রাগ রাগ অনুভূতি দেখা গেল। বিলাস ছিল নম্র, মৃদুভাষী। তার ভিতর ক্রোধ নামক রিপু কোনওদিন সেভাবে বাসা বাঁধেনি। কখনও সখনও অল্প স্বল্প রেগেছে ঠিকই, কিন্তু সে সাময়িক। কিন্তু এখন যেন ক্রোধ ওর ভিতর চোরাস্রোতের মতো ধীরে ধীরে প্রবাহিত হচ্ছে। সে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল পিতৃদেব অফিসঘরের সামনে বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। পাশে সেই সাদা ফাদার। বিলাস প্রশ্ন করল সতীশকে, উনি কে? —কে? —ওই যে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। সাদা ফাদার। হাসল সতীশ। বলল, উনি ফাদার অ্যান্টনি। আমরা বলি ফাদার আন্তন। উনি এখানে সবচেয়ে বড়ো। বড়ো ফাদার। বিলাস কী বুঝল কে জানে। বলল, ও। সতীশ বলল, তোমার জিনিসপত্র রেখে, তোমাকে নিয়ে ঘুরব। তোমার মা কিছু খাবার দিয়েছেন? ...

জনবিলাসের বারোমাস্যা।। সমরেন্দ্র মণ্ডল।। সুপ্রকাশ।।

Image
বিলাস চলেছে আবাসিক বিদ্যালয়ে। মিশনারি বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয় সম্পর্কে তার পূর্ব ধারণা নেই। না থাকাটাই স্বাভাবিক। তার হাফপ্যান্টের বয়সে এবং যে কিনা প্রকৃতির ভিতর লিপ্ত ছিল, তার পক্ষে শহুরে বিদ্যালয় সম্পর্কে না জানাটাই স্বাভবিক। পিতৃদেবের মুখনিঃসৃত সংবাদে মাতৃদেবী যে ধারণা অর্জন করেছিলেন এবং উপদেশের ছলে তিনি বিলাসকে যা বলেছিলেন, তা থেকে তার বোধ তৈরি হয়েছে সাদা চামড়ার আলখাল্লা পরিহিত মিশনারিরা এই বিদ্যালয়ের পরিচালক। সেখানে অনেক বালক বাস করে। বিরাট বিরাট অট্টালিকা। বিদ্যালয় এবং আবাসন একটি প্রাচীর ঘেরা জায়গায় অবস্থিত। কঠোর নিয়মের নিগড়ে তাদের বাস করতে হয়। সবই চলে নিয়মমতে। সে চলেছে ট্রেনে চেপে। এর আগে বহরমপুর যাওয়ার জন্য সে ট্রেনে চেপেছিল, কিন্তু সেই স্মৃতি অনেকটা ধূসর হয়ে গিয়েছে। এবারের স্মৃতিটা হবে নতুন। ফলে সে কিছুটা উত্তেজিত। আরেকটা কারণেও সে কৌতূহলী, সেবার ট্রেন গিয়েছিল উত্তরমুখী, এবার দক্ষিণমুখী। ট্রেনের একটা খোপে তারা উঠল। সে ছুটে গিয়ে জানলার ধারে বসল। পিঠে হেলান দেওয়া কাঠের বেঞ্চি, ফাঁক ফাঁক করা। পিতৃদেব বললেন, দাঁড়া, কাপড়টা পেতে দিই। সে উঠে দাঁড়াল। পিতৃদেব ঝোলা থেকে মায়ের একটি ছিন্ন শ...

কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্টের 'রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল'।। অনুবাদ ও টীকা : অর্ণব রায়।। সুপ্রকাশ

Image
শহরের ইউরোপীয় অংশ ছাড়িয়ে আর উত্তরদিকে নদীবন্দরের মুখে জড়ো হওয়া অসংখ্য মালবাহী দেশীয় নৌকার ভিড় পার করলে প্রথম যে জিনিসটা চোখে পড়বে সেটা একটা ভাঙাচোরা দেখতে চতুষ্কোণ চত্বর, নদীর দিকে খোলা মুখ, বাকি দিকগুলোয় প্রাচীর দেওয়া। এই প্রাচীরের গায়ে বিরাট মাঠ। আর এই মাঠেই এক কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ী কিছু সাফাই আধিকারিককে সঙ্গে করে কলকাতা শহরের মৃত চতুষ্পদদের নিয়ে তার সুচারু কাজকারবার চালিয়ে থাকে। আর ওই প্রাচীরের ওপর সারাক্ষণ গোটা পঞ্চাশেক ক্ষুধার্ত শকুন হাঁ করে বসে থাকে। আর নীচে, আবর্জনা আর হাড়ের স্তূপের মধ্যে ঘুরে বেড়ায় একই রকম ক্ষুধার্ত জঘন্য দেখতে কিছু রাস্তার কুকুর। তাদের সাথে ওই ময়লা ঘেঁটে পাওয়া পুরস্কার নিয়ে কাড়াকাড়ি করে গোটা কুড়ি দৈত্যাকার সারস।     এই বাড়িটাকে   শ্মশানঘাট বলে। হিন্দুরা এই জায়গাটা ঘিরে দিয়ে অন্য জায়গার থেকে আলাদা করে রাখে তাদের মৃতদের দাহ করার জন্য। যখন আমি ‘হিন্দুরা’ বলছি, তখন বুঝতে হবে আমি বলতে চাইছি, যাদের মৃতদেহ দাহ করার ক্ষমতা আছে, তারা। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে, হিন্দু সমাজের অর্ধেকের বেশি মানুষ এই ক্ষমতা রাখে না। আর তোমরা ভালো করেই জানো, দু একটি ব্...

কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্টের 'রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল'।। অনুবাদ ও টীকা : অর্ণব রায়।। সুপ্রকাশ।।

Image
যাত্রা শুরুর কথা বলতে গেলে আমাদের চলে যেতে হবে ঘাটে, যেখানে সমস্ত নৌকাগুলো এসে জড়ো হয়। আর কোন ঘাটে নৌকার সমাগম সবচেয়ে বেশি হয়, তা খুঁজতে গেলে আমাদের প্রথমেই যে ঘাটের কথা মনে আসবে সেটা হল বাবুঘাট। ঘাট বলতে কিছুই না, কয়েক ধাপ সিঁড়ি জলের দিকে নেমে গেছে। তার ওপরে একটা অনেকগুলো থামওয়ালা চাতালের মতো ঢাকা দেওয়া এলাকা। যে দেশীয় ভদ্রলোক এটি তৈরি করেছেন, থামের গায়ে তার নাম খোদাই করা। পাশেই একটা বিশাল অশ্বত্থ গাছ অনেকটা এলাকা জুড়ে ছাতা ধরে আছে। পুণ্যবতী হিন্দু মহিলাদের গঙ্গাস্নান সেরে উঠে আসার সময় হাতের তামার লোটা করে জল এনে এই অশ্বত্থ গাছের গোড়ায় দিতে দেখা যায়। তামার লোটা সবসময় তাদের হাতে থাকে।  . . কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্টের 'রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল' অনুবাদ ও টীকা : অর্ণব রায় . প্রচ্ছদ : অজন্তা হাজরা মুদ্রিত মূল্য : ৫৫০ টাকা সুপ্রকাশ