Posts

অকূলের কাল।। অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী।। সুপ্রকাশ।।

Image
'ভরা শরীর নিয়েই নতুন সংসারে বেশ মগ্ন হয়েছে দোলন। ক্ষিতি অবাক হয়ে দেখে, সামান্য জামাকাপড় আর রান্নার তেল নুন মশলা পুরনো কৌটায় ভরে সাজিয়ে রাখছে সে। রঙচটা কৌটোগুলোতে সব রঙিন কাগজ সাঁটিয়ে চকচকে রূপ দিয়েছে। কাগজ, আঠা— সব সে নাদুকে বরাত দিয়ে আনিয়েছে। দিদির বাড়িতে কিছুদিন থেকে সে রুটি করতে শিখেছে। সে-বাড়িতে প্রতিদিনই রাতে খাওয়ার জন্য দিস্তেখানেক রুটি আর প্রায় এক গামলা গার্হস্থ সংস্করণের তরকা তৈরি হয়। গোটা মুগ আর আলুসেদ্ধ সামান্য গাওয়া ঘি দিয়ে ছকে নেওয়া সেই তরকাও সে অবিকল দিদির মতোই তৈরি করতে শিখে গেছে। রোজই সে মনার সাহায্য নিয়ে কুড়ি-বাইশ খানা রুটি তৈরি করছে। বেশ খিদে বেড়েছে দোলনের। ক্ষিতিকেও কোনো কোনোদিন হারিয়ে দিচ্ছে রুটি খাওয়ায়। তরকা শেষ হলো তো দুধ-গুড় দিয়ে শুরু হলো। গ্রামের বাড়িতে থেকে চুলে জটা পড়লে কী হবে, দুধ খাওয়াটা সে ভালোই অভ্যেস করে ফেলেছে। এই দুধও গ্রামের বাড়ির মতোই খাঁটি দুধ। দিদির বাড়ি থেকে আসে। ভাড়া বাড়িতে গরুও পোষেন তিনি। জামাইবাবুই তদারকি করেন। খাঁটি দুধ ছাড়া রাতে ঘুম আসে না তাঁর। স্বাধীন সংসার একটা পুরো মাসও ভোগ করতে পারল না দোলন। ব্যথা উঠে গেল এক বিকেলে। খবর পেয়ে দিদি এলেন...

অকূলের কাল।। অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী।। সুপ্রকাশ।।

Image
'লোকটির নাম ভগবান দাস। ক্ষিতির মনে হলো স্বয়ং ভগবানই বুঝি চলে এসেছেন তাকে সাহায্য করতে। দইজুড়িতে নেমে ক্ষিতিকে সাইকেলের রডে বসিয়ে হাওয়ার বেগে সাইকেল চালাল ভগবান। তবুও ঘাটে নামতে না নামতেই পশ্চিম আকাশে টুপ করে ডুবে গেল সূর্য। ক্ষিতিকে নামিয়ে দিয়ে ভগবান বলল,— নদী পেরিয়ে যেদিকে শ্মশান দেখতে পাবেন, সেদিকেই সজা হাঁটবেন। এদিক উদিক হেলবেননি মোটে। তাইলেই লালগড় পেয়ে যাবেন। তখনও যেটুকু আলো ছিল তাতে চারদিকে পড়ে থাকা ভাঙ্গা হাঁড়ি, পোড়া কাঠ ইত্যাদি দেখে শ্মশান চিনতে অসুবিধে হলো না ক্ষিতির। শ্মশানের গায়ে লেগে থাকা মোটা আলে পা দিতেই ঝুপ করে দিনের শেষ আলোটুকুও নিভে গেল। সেদিন সম্ভবত অমাবস্যা। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। আন্দাজে পা চালাল ক্ষিতি। আল তো সরলরেখায় চলে না, হামেশাই ডাইনে বাঁয়ে ঘুরে যায়। মাঝে মাঝেই পিছলে যাচ্ছে তার পা। একটু পরে অন্ধকার খানিক সয়ে গেল চোখে। তারাদের ক্ষীণ আলোয় ভরসা করে আল ছেড়ে ধেনোমাঠে নেমে সরলরেখায় চলতে শুরু করল সে। আর তখনই তার সামনে থেকে ছায়ার মতো কিছু সরে গেল, একটু দূরেই সমস্বরে শিয়াল ডেকে উঠল। ডাকাবুকো ক্ষিতির বুকও দুরুদুরু, ধানগাছের গোড়ায় হোঁচট খায় সে। কাঁধের ব্যাগ ক্রমশ ভারী হতে...

অকূলের কাল।। অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী।। সুপ্রকাশ।।

Image
'শ্রুতিলিখন শেষ হতেই জুনিয়ার মেয়েটি সেই ছয় পৃষ্ঠার রচনাটিকে মনসুর সাহেবের দিকে ঘুরিয়ে রাখল। তিনি সেটিকে মন দিয়ে পড়তে লাগলেন আর সেই সঙ্গে চলল ইতিউতি সংশোধন। Affidavit শিরোনামের নীচে বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা রয়ে গেছে। এবার সেটা পূর্ণ করতে হবে। মনসুর সাহেব ক্ষিতিকে সামনে ডাকলেন। বললেন, শোন— এই যে মেয়েটিকে দেখছিস আমার সঙ্গে কাজ করছে, এ বাঙালি নয়। বাড়ি সেই সুদূর পাঞ্জাবে। নাম কিরণ মোহে। তোর দোলনের মতো এও বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছিল বছর সাতেক আগে। তবে বিয়ে হাসিল করার জন্যে নয়, একেবারে উলটো কারণে। পাঞ্জাবের সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি থেকে গ্র্যাজুয়েসন করার পর আইন পড়তে চেয়েছিল। বাড়ির লোক রাজি নয়। মনসুর সাহেব তার জুনিয়ারের জীবনী বলে চলেছেন। কেন বলছেন কে জানে! ক্ষিতি মেয়েটিকে এই প্রথম ভালো করে দেখছে। বেশ লম্বা, তীক্ষ্ণ নাক, পাতলা ওষ্ঠাধর, চোখ দুটি কেবল বাঙালি মেয়েদের মতো, কালো তারায় কোমল চাহনি। মনসুর সাহেব তারই গল্প সাতকাহন করে শোনাচ্ছেন বলেই বোধহয় একটু লজ্জায় পড়েছে। কারণ ধীরে ধীরে তার ফরসা গালে লালের আভা দেখতে পাচ্ছে ক্ষিতি। মনসুর সাহেব বলছেন,— তারা কিরণের বিয়ের আয়োজনে ব্যস্ত। সেই ব্যস্ততার মধ্যে এক ...

অকূলের কাল।। অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী।। সুপ্রকাশ।।

Image
'সকাল আটটায় বেরিয়ে পড়ছে ক্ষিতি। কাঁধে ঝোলানো একটা ছোট ব্যাগের মধ্যে একটা ডাইরি, অর্ডারের বিল বই আর পেন। একটা বাস ধরে খিদিরপুরের মোড়ে নেমেই হাঁটা শুরু করে ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে। দৃষ্টি রাস্তার ডাইনে বাঁয়ে দুদিকেই— ওষুধের দোকানের সন্ধানে। মুখচোরা ক্ষিতির মনে অস্বস্তি বিজবিজ করছে। ওষুধের অর্ডার চাইতে গেলে কীভাবে, কী কথা বলে শুরু করবে! ঠিক করতে না পেরে মরিয়া ক্ষিতি, অর্ডার না পেলে চাকরিটাই বড়জোর যাবে— ধরে নিয়ে নিজের স্বভাবমতোই প্রতিটি দোকানে ঢুকে শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। ভিড় না থাকলে খদ্দের ভেবে দোকানিই এগিয়ে এসে কথা বলে। মনে মনে বারবার আওড়ানো কথাগুলোই কোনোরকমে উগরে দেয় ক্ষিতি— জি এম মেডিক্যাল স্টোর্স থেকে আসছি। আমরা অ্যালবার্ট, ইন্ডন আর ই মার্কের ওষুধ রাখি। অর্ডার দিলে হোলসেল দরে দোকানে পৌঁছে দিই। দোকানি চোখ দিয়ে তাকে মেপে নেয়। দু-একজন ভদ্রতা করে বলে,— নতুন দেখচি আপনাকে, আসবেন মাঝে মাঝে, অর্ডার থাকলে রেখে দেব। মনে জোর আনার চেষ্টা করে ক্ষিতি। গোবিন্দ সাহাও বলেছিল, প্রথম মাসটায় হয়তো অর্ডারই পাবেন না। নিয়মিত যেতে হবে তবুও। পরিচিত হতে একটু সময় লাগবে। তবুও দু-চারটে দোকান ঘোরার পরে নিজেকে ...

অকূলের কাল।। অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী।। সুপ্রকাশ।।

Image
'দেশ যুদ্ধে জড়ালে কী হয়, তার বিন্দুবিসর্গ না জানত ক্ষিতি, না জানত দোলন। তাদের দু-তিন মাস ছাড়া ছাড়া চিড়িয়াখানায় দ্বিপ্রাহরিক ভ্রমণ অব্যাহত ছিল। পরবর্তী সেই দিনটা ছিল ছয় কি সাত তারিখ। বেরোবার সময় সব স্বাভাবিক। মামাবাড়ি যাচ্ছি বলে বেরিয়ে তিন-চার ঘণ্টা ক্ষিতির সঙ্গে চিড়িয়াখানায় কাটিয়ে সন্ধে নাগাদ মামাবাড়ি পৌঁছবে, কেউ কিচ্ছু টের পাবে না। ক্ষিতি হেদোর বাস স্টপে অপেক্ষা করছিল, দোলনকে দেখতে পেয়েই একটা অপেক্ষমাণ ট্যাক্সি ডেকে উঠে পড়েছিল দুজনে। বিপদ হলো ফিরে আসার সময়। ডিসেম্বরের বেলা ছোট হয়ে গেছে তাদের অজান্তেই। চিড়িয়াখানা থেকে বেরোতেই অবাক হয়ে দেখে রাস্তাঘাট ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঢাকা। অন্যদিন চিড়িয়াখানা থেকে বেরোলেই তাদের গা ঘেঁষে ট্যাক্সি হর্ন দেয়, আজ কোথাও কোনো ট্যাক্সি নেই। দোলন বাসে চাপতে পারে না, তাও ক্ষিতি মরিয়া হয়ে বাসের জন্য এদিক ওদিক ছুটল খানিক। এখান থেকে সরাসরি উত্তর কলকাতা যাওয়ার বাস খুবই কম। অনেকক্ষণ চেষ্টা করেও এমন একটা বাসের দেখা মিলল না যেটাতে ক্ষিতি দোলনকে নিয়ে উঠে পড়তে পারে। অন্ধকারে ক্ষিতির তেমন অসুবিধে নেই। বিদ্যুৎহীন গ্রামের ছেলে সে, তারার আলোয় পথ চলতে অভ্যস্ত। কিন্তু দোলন ব...

অকূলের কাল।। অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী।। সুপ্রকাশ।।

Image
'সকাল নটায় রাজগিরে গিয়ে যখন নামল সবাই, তখন সকলেরই পেট চুঁইছুঁই করছে। অনুপম আর অভীক শলাপরামর্শ করে ঠিক করল, নটা যখন বেজেই গেছে জলখাবারে পয়সা খরচ করার দরকার নেই। একেবারে পেট ভরে ভাত খেয়ে নেওয়াই ভালো। স্টেশনের বাইরেই সার সার খাবার হোটেল। ওরা দুজনে ঘুরে ঘুরে একটা পছন্দ করল। নিরামিষ থালি, ডাল-ভাত-ভাজি-সবজি যত খুশি খাও, মিল পিছু বারো আনা। কিন্তু দশটার আগে খাবার পাওয়া যাবে না। তা-ই সই। চল্লিশ জন খদ্দের পেয়ে মহা উৎসাহে রাঁধুনির সঙ্গে হোটেলওয়ালা নিজেও রান্নায় হাত লাগাল। রান্না তো হলো, খাওয়ার জায়গায় কোনোমতে পনের জন বসতে পারবে। সবাই আগে বসতে চায়, ঠেলাঠেলি করে বসেও গিয়েছিল। কিন্তু অনুপম তাদের মধ্য থেকে প্রদীপ আর দিনুকে তুলে এনে তাদের বদলে অসিত আর আগুয়ানকে বসিয়ে দিল। যারা জায়গা পেল না হতাশ হয়ে ফের গাঁজায় বুঁদ হয়ে গেল। তারপরেই বিপত্তির শুরু। একে তো সারা রাত উপোষ, তার উপর গাঁজার মহিমা, পনের জনের খাওয়া শেষই হতে চায় না। হোটেলওয়ালার মাথায় হাত, চল্লিশ জনের চাউল পনের জনেই সাবাড় করে দিল। সে হাত জোড় করে অনুপমকে বলল, মাফ করো ভাইলোগ, হামি আপনকো আউর খিলানে নেহি সকতে।  কাকু এতক্ষণে বুঝল অনুপমের বুদ্ধি আর দূ...

অকূলের কাল।। অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী।। সুপ্রকাশ।।

Image
'তিনতলার বারান্দায় রেলিঙয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ক্ষিতি। বাঁ দিকের ছাদের দিকে তাকাতেই মন খারাপের হাওয়াটা ডিগবাজি খেয়ে ভ্যানিস! সেখানে তিনটি কিশোরী, যেন প্রস্ফুটিত তিনটি পদ্ম, দুটি কৃষ্ণা, একটি গৌরী। তিনজনেরই পিঠ-ছাপানো খোলা চুল। তারা যেন ক্ষিতিকেই দেখছে। দুই কৃষ্ণা হাসছে, কুন্দ ফুলের মতো তাদের দাঁত ঝকঝক করছে। গৌরী যেন ঈষৎ গম্ভীর, ঠোঁট চেপে আছে, হাসবে না কিছুতেই। দুই কৃষ্ণার একজন, মাথায় একটু খাটো, ক্ষিতির দিকে তাকিয়ে আঙুল দিয়ে আকাশের গায়ে কিছু একটা লিখল। কিছুই বুঝল না ক্ষিতি। সে নিজের বুকে আঙুল ঠেকাল। বলতে চাইল, আমাকে কিছু বলছো? দুই কৃষ্ণা দুদিক থেকে গৌরীকে চেপে ধরে হেসে গড়িয়ে পড়ল। বোকার মতো তাকিয়ে রইল ক্ষিতি। একটু পরে বেঁটে কৃষ্ণা ক্ষিতির দিকে হাত তুলল, তার হাতে ঝাঁটা! নিভে গেল ক্ষিতি— তার মুখে ঝাঁটা মারবে বলল কি? বারান্দা থেকে ঘরে, নিজের বিছানায় শুয়ে পড়ল সে। আলো যেটুকু বুকের মধ্যে জ্বলব জ্বলব করছিল, ঝাঁটার ঘায়ে ফুস করে নিভে গেল। শুয়ে শুয়ে তেতো স্বরে আওড়াল,— নহে নহে লীলাপদ্ম, রাইকিশোরী এসেছিল সম্মার্জনী হাতে। তিন দিন পরে আবার ক্ষিতি এসে দাঁড়াল বারান্দায়। আড়চোখে তাকাল সেই ছাদের দিকে। ...