Posts

শেকল ভাঙার গান।। অলোক সান্যাল।। সুপ্রকাশ।।

Image
লোকটার নাম পুরন্দর। রনথম্বোরের জঙ্গল ঘেঁষা ছোটো-বড়ো গ্রামের প্রায় সকলে পুরন্দরকে চেনে। নিতান্তই ভালো মনের মানুষ। ঠাণ্ডা মাথার। শুধু জঙ্গলের আইন ভাঙলে সেই পরিচিত সবসময় হাসি লেগে থাকা মুখটা লহমায় বদলে যায়। তখন তার মেজাজ থেকে নিস্তার নেই। পুরন্দর এই জঙ্গলের রেঞ্জার নয়। বিরাট কোনো ফরেস্ট অফিসারও নয়। সে সাধারণ এক পাহারাদার। ফরেস্ট গার্ড। পুরন্দরের বাবাও তাই-ই ছিলেন। বাঘের হানায় প্রাণ খুইয়েছিলেন। পুরন্দর তখন সদ্য আঠারোয় পার করেছে। ফরেস্ট অফিসের বদান্যতায় বাবার চাকরিটা জুটে গিয়েছিল। ভাগ্যিস গিয়েছিল! সেই ছোট্ট বেলা থেকে রনথম্বোরের জঙ্গলই তার একমাত্র পৃথিবী। মাঝবয়েসে পৌঁছেও সেই ঠিকানার বদল হয়নি। হবেও না। বাঘের পাঞ্জা বাবাকে কেড়ে নিলেও, পুরন্দরের সঙ্গে তাদের কোনো শ্রেণী শত্রুতা নেই। বরং উলটো। রনথম্বোরের বাঘেদের সঙ্গে পুরন্দরের সখ্যতা দেখে চেনাজানা লোকজন প্রথম প্রথম অবাকই হত। এখন সবাই বুঝে গেছে, এই জঙ্গল এবং জঙ্গলের প্রাণীদের তার মতো করে কেউ চেনে না। এমনকি বন দপ্তরের কর্তাব্যক্তিরাও তার কথায় আলাদা গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। টি৪০-কে আলাদা করে 'নূর' নামটা সে-ই দিয়েছিল। যেমন তার মাকে দিয়েছিল 'চ...

শেকল ভাঙার গান।। অলোক সান্যাল।। সুপ্রকাশ।।

Image
রোজকার মতোই দুপুরে একটা বড়োসড়ো গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছে টি৩৭। একটু দূরের ঘাসজমি টপকে জলাশয়। ঝোপের আড়ালে থাকলেও ঘাসের ফাঁকফোঁকর গলে সেদিকে নজর রাখতে অসুবিধা হচ্ছে না। জলাশয়ের দিকে নজর বিছিয়ে শুয়ে আছে সে। জলের ওপর থেকে তিরতিরে ঠান্ডা বাতাস ভেসে আসছে। মন্দ লাগছে না। জলার কাছে জন্মানো রসালো পাতার লোভে হরিণের পাল মাঝেমধ্যেই এসে উপস্থিত হয়। জায়গাটা বেছে নেওয়ার এটাই কারণ। কিছুক্ষণ পর তার অনুমান অভ্রান্ত প্রমাণ করে একটা ছোটো দল হাজির হল। হরিণের পালটা দৃষ্টি সীমানায় ধরা দেওয়ার আগেই টি৩৭ যাবতীয় আলিস্যি ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল। এবার সে স্থির এবং নিষ্পলক চোখে চেয়ে রইল জলাশয়ের দিকে। বাঘিনীরা এমন আভাস আগে থেকে পেয়ে গেলেও তার ছানারা বুঝতে পারে না। নূর এখন ছোটো। তিন মাসের। আরও একটু বড়ো হলে এমন হাজারো না-ফোটা শব্দগুলো সে-ও নিশ্চয়ই টের পাবে। নূর এতক্ষণ তার ভাই-বোনের সঙ্গে খুনসুটিতে মত্ত ছিল। মাঝেমধ্যে মায়ের নরম পেটে গড়িয়ে পড়ছিল তিনজনায়। খানিক গলা ভিজিয়ে নিয়ে আবার ঝাঁপাই জুড়ছিল। মাকে হঠাৎ উঠে দাঁড়াতে দেখে অবাক হল তারা। নূর 'কুঁই কুঁই' স্বরে মাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, শিকারের গন্ধ পেতে টি৩৭...

নৈশ অপেরা।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।।

Image
 সুপ্রকাশ প্রকাশিত শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের উপন্যাস 'নৈশ অপেরা' পড়ে মতামত জানিয়েছেন শ্রী। আমরা তাঁর অনুমতি নিয়ে নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি। ............................................... বই : নৈশ অপেরা ধরণ : রহস্য উপন্যাস  লেখক : শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য  প্রকাশক : সুপ্রকাশ  প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী  মুদ্রিত মূল্য : ৫৪০ টাকা  পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৪১০ পাঠ অনুভূতি : শ্রী  "স্মৃতি যা আ--ত--তা-য়ী-র আনুগত্যে এবং বিশ্বাস-ঘা--তকের মসৃণতায় নিজেকে প্রশ্নময় রাখে, তাকে হ---ত্যা করা পাপ | আপনারা মনে রাখুন, মনে রাখুন, এবং মনে রাখুন |"  এই মনে রাখা, স্মৃতির অবিশ্রান্ত কোলাহলের বিস্মৃত আদিম গহ্বর থেকে উঠে আসা এক বেদনা বিজড়িত আখ্যান যাকে হয়তো পুরোপুরি রহস্য গল্প বলে দাগিয়ে দেওয়া যায়না | কারণ রহস্য তার আকর হলেও বিষাদ তার  ভাব, তার ছন্দ, স্মৃতির বিবর্ণতায় তার পূর্ণতার প্রকাশ |  এর আগে লেখকের "শেষ মৃত পাখি" পড়েছি | পড়েছি "একানড়ে" | এবং তাতে যা বুঝেছি, হয় এই লেখার ধরণ আপনার প্রচন্ড ভালো লাগবে অথবা একেবারে অসহ্য | এর মাঝামাঝি কিছু হতে পারেনা |  উপন্যাসে...

হামারটিয়া।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।।

Image
সুপ্রকাশ প্রকাশিত শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের উপন্যাস 'হামারটিয়া' পড়ে মতামত জানিয়েছেন অভিনব দাশগুপ্ত। আমরা তাঁর অনুমতি নিয়ে নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি। ............................................ শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যর "হামারটিয়া" শুধুই একটি গোয়েন্দা কাহিনী, না লেখকের চোখে বর্ষাকালে রাস্তার জমা জলে ভেসে ওঠা একটা পলেস্তারা খসা, জীর্ণ বিদীর্ণ শহরের প্রতিচ্ছবি, তা বলা মুশকিল। এ শহরে একটা তীব্র কলোনিয়াল হ্যাংওভার আছে, এ গল্পের পাড়াগুলি ২০২৪-এর, কিন্তু খুব পুরানো। এ গল্পের গোয়েন্দা লেখকের ভাষায় কলকাতার শেষ ইহুদি। তার একটা মাইক্রফটও আছে, তিনি মহিলা, সম্ভবত অ্যাংলো ইন্ডিয়ান। ১৯৯৮ সালে সমাধান হয়ে গেছে, এরকম একটা মার্ডার কেস আচমকা ২০২৪-এ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। তাই এ গল্পে নয়ের দশকও আছে এবং আছে সে সময়ের পপ-কালচার। কিন্তু সর্বোপরি আছে সত্য উদঘাটন এবং ন্যায়বিচারের অভিমুখ, চরিত্র এবং যৌক্তিকতা নিয়ে তুমুল তর্ক। এসবকিছুর কেন্দ্রে আছে একটি চমৎকার রহস্যকাহিনী। কিন্তু হামারটিয়া, ঐ যা বললাম, শুধুই একটি গোয়েন্দাগল্প না। হামারটিয়া একটা বদলাতে নারাজ শহরের ইন্সিকিওর সমাজের যাপনের আখ্যান।...

হামারটিয়া।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।।

Image
সুপ্রকাশ প্রকাশিত শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের উপন্যাস 'হামারটিয়া' পড়ে মতামত জানিয়েছেন সুপ্রতীক চক্রবর্তী। আমরা তাঁর অনুমতি নিয়ে নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি। ............................................ আমি নিজেকে বাংলা সাহিত্যের একজন মনোজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ পাঠক হিসেবেই মনে করি, এবং আমি প্রবল খুঁতখুঁতে। আমার পরিচিত লোকজনও এব্যাপারে একমত হবেন। আমার সেই জোরের জায়গা থেকেই আজ একটা ভবিষ্যদ্বাণী করে যাই - বাংলা ডিটেকটিভ গল্পের আধুনিক আকালে শাক্যজিত ভট্টাচার্য-র এই বইটি একটি উজ্জ্বল আবিষ্কার হয়ে থাকবে।( সম্প্রতি পিয়া সরকারও আমায় মুগ্ধ করেছিলেন তাঁর দর্শনা বোস সিরিজ দিয়ে।) আগ্রহী হয়ে থাকব ইজি এবং জাভেদের যুগলবন্দীও যেন আবার আসে, তনয়ার মতোই। শাক্যর অন্য বইয়ের মতোই বিষন্ন ও টানটান লেখনী এই গোটা উপন্যাসের গায়ে ছড়িয়ে আছে। এইরকম বই শেষ করে খানিক একা থাকা উচিৎ, নইলে শরীর খারাপ করে। একানড়ে শেষ করে আমি কয়েকদিন পর্যন্ত মুহ্যমান ছিলাম।  এটিও কাছাকাছি প্রায়।  শুধু একটাই অনুযোগ, শাক্য একটু লেখাকে সময় দিক। আরেকটু বড় লেখা ওর কাছে আশা করি। হামারটিয়া শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য  মুদ্রিত মূল্য : ৩৫০ টাকা ...

বৃক্ষমানুষের ছায়া।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।।

Image
"সমস্ত আঙিনায় নৈঃশব্দ্য নেমে এসেছে। হেমন্তের সন্ধে। ধোঁয়া ধোঁয়া অন্ধকার। টালিখোলার দিক থেকে মাঝে মাঝে মাটি কাটা মেশিনের দূরশ্রুত ঘটাং ঘটাং। আঙিনার মানুষগুলোর শ্বাসও যেন শোনা যাচ্ছে। যেন দীর্ঘকাল পরে অনাস্বাদিত প্রশান্তির খোঁজ পেয়েছে তারা। ফকির কথা থামালেন। বিষাণের বউ-মেয়ে মুড়ি-চা এনে দিল, আজ মুড়ির সঙ্গে লাল মুলোর কুচি। গৌর লক্ষ করলেন— আজও সুজি নামের ছেলেটি বসেনি, ঠিক বাড়ির আঙিনার ভেতরেও আসেনি। সেদিনের জায়গাটাতেই সেদিনের ভঙ্গিতেই দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা ভারি কাঁচুমাচু। তার চোখ টুনাকে ততদূর অনুসরণ করছে যতদূর দেখলে অন্যদের থেকে নিজের দৃষ্টি, নিজের লক্ষস্থলের গতিপথকে আড়াল করা যায়। টুনা কিন্তু মোটেও তাকে দেখছে না। কিন্তু, তার চোখ-দুটো হাসছে যেন। গৌর সুনন্দর দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। সুনন্দ হেসে বললেন— 'দেখেছি, দেখেছি। বিয়ে-থা করা হয়ে ওঠেনি বলে ভেবো না একেবারে কাঠখোট্টা বনে গেছি। নতুন একটা গল্পের জন্ম হচ্ছে।' মুড়ি খেতে খেতে সকলেই পাশাপাশি মানুষটার সঙ্গে অনুচ্চ স্বরে কথা বলছে। আজ কয়েক জন মেয়ে-বউকেও দেখা যাচ্ছে। গৌর আর সুনন্দ এইসব কথার মধ্যে মানুষগুলোর সুখ-দুঃখের, দৈনন্দিনের খবর পেলেন। কারো...

বৃক্ষমানুষের ছায়া।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।।

Image
"সদ্য-গড়ে-ওঠা মন্দিরটার সামনে দিয়ে এগিয়ে গিয়ে তাঁরা টালিখোলাটা বেড় দিয়ে অনেকটা পথ পেরোলেন। ভাটার পেছনদিকে মজুরদের ঘর। ঘরগুলো খুব নিচু, মনে হয় প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে সেখানে ঢুকতে হয়। প্রত্যেকটা ঘরে একটামাত্র বেড়ার দরজা, জানালার বালাই নেই। এই সন্ধে-হয়ে-আসা কপিশ বিকেলেও স্ত্রী-পুরুষ মজুরেরা কাঠের ছাঁচে মাটির দলা ঠুসে কাঁচা টালি বানিয়ে চলেছে। কয়েক জন সেগুলোকে মাটিতে সার দিয়ে রাখছে। রুক্ষ-চুলের অনেকগুলো বাচ্চা ধুলোখেলায় মেতে আছে। তাদের দেহাতি শব্দের আনন্দোল্লাস ছড়িয়ে পড়ছে ঈষৎ ভারি হয়ে-আসা শেষ-বিকেলের বাতাসে। ভাটার একেবারে পুব-প্রান্তে মাটির স্তূপে তখনও একটা বড়ো মাটি-কাটা বেঁকো-মেশিন ঘটাং ঘটাং শব্দে মাটি সরাচ্ছে। ভাটার পেছনে পাড়া-ঘরের এলাকায় ঢুকে আঁকাবাঁকা খান-দুয়েক রাস্তা পেরিয়ে লোকটিকে অনুসরণ করে অনেক লোকের কৌতূহলী চোখে বিদ্ধ হতে হতে তাঁরা ভেঙে-পড়া বেড়া-দেওয়া একটা পরিচ্ছন্ন আঙিনায় প্রবেশ করলেন। গৌর অনুমান করলেন— এই সেই অগ্নিদগ্ধ গোয়াল ঘর, এখানেই পুড়ে গিয়েছিল বিষাণের বকনা বাছুরটা। গোয়াল ঘরের ডান পাশে আড়াআড়ি খান-দুয়েক ঘর, বসতঘর হবে— তার ফুটো টালির চালও প্লাস্টিক শিট দিয়ে পুলটিস দেওয়া। বসতঘ...