বৃক্ষমানুষের ছায়া।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

সুপ্রকাশ প্রকাশিত দুর্লভ সূত্রধরের উপন্যাস 'বৃক্ষমানুষের ছায়া' পড়ে গুডরিডসে লিখেছেন অমিয়রঞ্জন সেন। আমরা নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি।
......................................................................
কোনও কোনও উপন্যাস পড়া শেষ হলে মনে হয়, একটি গল্প শেষ হলো। আবার কিছু উপন্যাস শেষ হয় না; বরং পাঠকের ভিতরে গিয়ে শুরু হয়। বৃক্ষমানুষের ছায়া আমার কাছে দ্বিতীয় ধরনের উপন্যাস। বইটি শেষ করার পরে বারবার মনে হয়েছে, এর কেন্দ্রে আসলে কোনও একক চরিত্র নেই। গৌর, সুনন্দ, বিষাণ, হকিম আলি ফকির, টুনা, সুজি-- এরা প্রত্যেকেই যেন একটি বৃহত্তর প্রশ্নের অংশ। সেই প্রশ্নটি হলো-- একটি সমাজ ভেঙে গেলে তাকে কি আবার জোড়া লাগানো যায়?

উপন্যাসের শুরুতে গৌর ও সুনন্দ অবসরপ্রাপ্ত দুই মানুষ। তাঁদের জীবনে অভাব নেই, কিন্তু উদ্দেশ্য নেই। অন্যদিকে বিষাণের জীবনে উদ্দেশ্যও আছে, যন্ত্রণাও আছে; কিন্তু সমাজ তাকে একঘরে করেছে। এই দুই ভিন্ন জগতের সংযোগ ঘটায় হকিম আলি ফকির। আশ্চর্যের বিষয়, তিনি কোনও গুরু নন, কোনও ধর্মপ্রচারক নন, কোনও বিপ্লবী নেতাও নন। তিনি মানুষকে কোনও মতবাদ শেখান না; বরং তাদের একসঙ্গে বসতে শেখান। এই সংযমই চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

ফকিরের মুখে আমরা শুনি-- "গাছ যেমন নিজের জন্য বাঁচে না, অপরের জন্য ফুল দেয়, ফল দেয়; কিছু দিতে না পারলে ছায়া দেয়।" এই একটি বাক্যই যেন গোটা উপন্যাসের নৈতিক ভিত্তি। লেখক মানুষের আদর্শ হিসেবে বীর, সাধু বা নায়ককে নয়, একটি বৃক্ষকে বেছে নিয়েছেন। এই নির্বাচন আকস্মিক নয়। বৃক্ষের কাজ দাঁড়িয়ে থাকা নয়, বেঁচে থাকা; আর বেঁচে থাকার অর্থ অন্যের জীবনেও অংশ নেওয়া। উপন্যাসের নাম তাই কেবল কাব্যিক নয়, গভীরভাবে দার্শনিক।

এই উপন্যাসের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর তার ইতিহাসবোধ। তেভাগা আন্দোলনের প্রসঙ্গ এখানে নস্টালজিয়া হয়ে আসেনি। লক্ষ্মীমণি ঘোষ, রাধাবিনোদ, কৃষক আন্দোলনের স্মৃতি কিংবা সোমনাথ হোরের তেভাগার ডায়েরি-- এসবের উল্লেখ লেখক করেছেন বর্তমানকে বোঝার জন্য। যেন বলতে চেয়েছেন, ইতিহাস কেবল অতীতের বিষয় নয়; সমাজের ভেতরে যে পারস্পরিক আস্থা একদিন তৈরি হয়েছিল, তার স্মৃতি আজও মানুষের মধ্যে সুপ্ত হয়ে আছে। সেই স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলাই ফকিরের কাজ। তিনি কোনও রাজনৈতিক পুনরাবৃত্তি চান না; তিনি মানুষের সম্পর্কের পুনর্গঠন চান।

এই কারণেই উপন্যাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশগুলোর একটি আমার কাছে সেই রহস্যময় পোস্টারগুলি। কোথা থেকে যেন রাতারাতি দেওয়ালে লেখা উঠছে--

"আপনি যা পান, তা আসলে আপনারই। আর আপনি যা পান না, তা-ও আসলে আপনারই।"

অথবা—

"প্রতি ঘাসে ঘাসে বিদ্যুৎ আসে জাগে সাড়া অব্যক্ত।"

আবার শেষে—

"আজ মাঠঘাট জনপদ গ্রাম বিপুল জ্যোৎস্নাময় / মরে মরে আজ জয় করেছি মরণের সব ভয়।"

এই পোস্টারগুলির লেখক কে, তা উপন্যাস জানায় না। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, লেখক ইচ্ছা করেই জানাননি। কারণ এগুলি কোনও চরিত্রের বক্তব্য নয়; এগুলি যেন সমাজের অবচেতনের ভাষা। যে সমাজ দীর্ঘদিন ধরে কেবল বিভাজনের ভাষা শুনেছে, তার দেওয়ালে হঠাৎ কবিতার ভাষা ফিরে আসে। এই পোস্টারগুলি আসলে রাজনৈতিক পোস্টার নয়, সাংস্কৃতিক পুনর্দখলের প্রতীক। যে সমাজে স্লোগান মানুষের কণ্ঠ কেড়ে নেয়, সেখানে কবিতা এসে মানুষের কণ্ঠ ফিরিয়ে দেয়। বাংলা উপন্যাসে এই মোটিফ আমার কাছে সত্যিই অভিনব লেগেছে।

গানের ব্যবহারও এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলা সাহিত্যে গান বহু উপন্যাসেই আছে; কিন্তু এখানে গান কাহিনির অলংকার নয়, কাহিনির যুক্তি। "মানুষ যদি হতেই চাও রে, গাছ হও গো আগে", "সামাল সামাল সামাল মাঝি ভাই", কিংবা "চিনে রাখো গাঁয়ে তোমার কে কে নূতন মাতব্বর"--এই গানগুলি চরিত্রদের জীবনদর্শনের সম্প্রসারণ। কখনও মনে হয়েছে, গদ্যে যা বলা যায় না, লেখক তা গানেই বলেছেন।

সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে, উপন্যাসটি কোথাও হতাশাবাদী নয়, অথচ আশাবাদও সস্তা নয়। সমাজে বিভাজন আছে, ভয় আছে, রাজনৈতিক দখলদারি আছে, সম্পর্ক ভাঙার পরিকল্পনা আছে --এসব লেখক স্পষ্ট দেখিয়েছেন। কিন্তু তার প্রতিষেধক হিসেবে তিনি কোনও মহৎ নেতা বা বিপ্লবের কথা বলেননি। তিনি দেখিয়েছেন--একসঙ্গে বসে চা খাওয়া, গান গাওয়া, ঝুড়ি বোনা শেখানো, স্বাস্থ্যশিবির করা, গ্রামের মেয়েদের কাজ শেখানো--এই আপাত ছোট কাজগুলিই সমাজকে পুনর্গঠন করতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই উপন্যাসটির গভীর মানবিকতা।

আমার কাছে উপন্যাসটির শেষ অংশ বিশেষভাবে স্মরণীয়। সুনন্দ যখন বলেন, "ধরা যাক... সবই ফিকশন", তখন মনে হয় লেখক যেন নিজেই পাঠকের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করছেন--এই চরিত্ররা সত্যিই কি কেবল কল্পিত? নাকি আমাদের সমাজে এখনও কোথাও কোথাও এমন মানুষ বেঁচে আছেন? উপন্যাসটি এই প্রশ্নের উত্তর দেয় না। উত্তর দেওয়ার দায় পাঠকের ওপর ছেড়ে দেয়।

আজকের বাংলা উপন্যাসে আমরা প্রায়ই ব্যক্তি-সংকটের গল্প পড়ি। বৃক্ষমানুষের ছায়া ব্যক্তি থেকে সমাজে ফিরে যায়, কিন্তু প্রচারের ভাষায় নয়; গভীর মানবিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। এই বই আমাকে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে, একটি সমাজকে শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখে মতবাদ নয়, মানুষের পারস্পরিক শুশ্রূষা। সেই কারণেই বইটির শেষ অধ্যায়ের নাম--"শুশ্রূষার সকাল আর আরোগ্যের বিকাল"--শুধু একটি অধ্যায়ের নাম নয়, গোটা উপন্যাসেরই রূপক।

এই কারণেই উপন্যাসটিকে কেবল তেভাগার ইতিহাস, গ্রামীণ সমাজ বা সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতার উপন্যাস বলে চিহ্নিত করা যায় না। লেখক ইতিহাসকে ব্যবহার করেছেন বর্তমানকে বোঝার জন্য, আর বর্তমানকে ব্যবহার করেছেন ভবিষ্যতের নৈতিক প্রশ্ন নির্মাণের জন্য। লক্ষ্মীমণি ঘোষের তেভাগার লড়াই থেকে শুরু করে বিষাণের একঘরে হয়ে যাওয়া, হকিম আলি ফকিরের গান, টুনা-সুজির নীরব প্রেম, গৌর-সুনন্দর অবসরের আত্মঅন্বেষণ, দেওয়ালে ভেসে ওঠা সেই রহস্যময় কবিতার পোস্টার--সব মিলিয়ে এই উপন্যাস ক্রমশ একটি জাতির কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি, ক্ষয়, প্রতিরোধ এবং পুনর্গঠনের ইতিহাস হয়ে ওঠে। এখানে ইতিহাস কেবল ঘটনাপঞ্জি নয়; মানুষের সম্পর্কের বিবর্তন, সমাজের নৈতিক স্বাস্থ্য, সাংস্কৃতিক স্মৃতি এবং সহাবস্থানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই প্রকৃত ইতিহাস। সেই কারণেই উপন্যাসের শেষে হকিম আলি ফকির আর শুধু একটি চরিত্র থাকেন না; তিনি এক নৈতিক উত্তরাধিকার, আর তাঁর বৃক্ষ-উপমা একটি সভ্যতার স্বপ্নে পরিণত হয়। উপন্যাসটি শেষ হয়, কিন্তু তার প্রশ্নগুলি শেষ হয় না; সেগুলি পাঠকের জীবনেই নতুন করে লেখা হতে থাকে।

বৃক্ষমানুষের ছায়া
দুর্লভ সূত্রধর 
সুপ্রকাশ
মুদ্রিত মূল্য : ৩৬০ টাকা

Comments

Popular posts from this blog

নৈশ অপেরা।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

অনন্যবর্তী।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।