Posts

Showing posts with the label ঐতিহাসিক উপন্যাস

মরুনির্ঝর।। সূর্যনাথ ভট্টাচার্য।।

Image
'মরুনির্ঝরের পরমায়ু বোধহয় এত শীঘ্র শেষ হবার নয়। তাই নির্ঝরিণীর মৃত্যু হয়নি। জলমগ্ন হতেই দুটি পুরুষ হস্ত নির্ঝরিণীর অচেতন দেহ সরযূর তট থেকে তুলে নিয়ে এসেছিল। সংজ্ঞা ফিরে এলে নির্ঝরিণী দেখল তার দেবতাকে। তার মুখপানে চেয়ে তিনি প্রচ্ছন্ন তিরস্কারে বলছেন, মরতে গিয়েছিলি নির্ঝর? আমাকে সর্বস্বান্ত করে? মরুধর! নির্ঝরিণী বুঝতে পারেনি সুরসাগর নিজেকে উজাড় করে তাকে সব দিয়েছেন। তারই মাঝে আছে এই মানুষটির অলৌকিক সৃষ্টির সুররঞ্জিত উত্তরাধিকার। তার তো এখনই মরা চলবে না। কিন্তু সে সুর— নির্ঝরিণীর একান্ত প্রিয় হৃদয়ের ধন, সে ধনে যে তার আর অধিকার নেই। উচ্ছ্বসিত কান্নায় ভেঙে পড়ে নির্ঝরিণী। অবরুদ্ধ স্বরে বলে, কিন্তু বেঁচে থেকেই বা কী লাভ? আমি যে ধৃতিকে কথা দিয়েছি। মরুনির্ঝর আর আমি গাইতে পারব না। মরুধর কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল, সে প্রতিজ্ঞা সন্তানকে পিতার থেকে আলাদা করতে পারে না নির্ঝরিণী। মরুনির্ঝর আমার সন্তান। যখন চরাচর ঘুমোবে, আমাকে তুই শোনাবি। শুধু আমাকে। নির্ঝরিণী বাঁচল। কিন্তু মরুনির্ঝর? সে আর কেউ শুনতে পেল না। গভীর রাতেই সবার অলক্ষ্যে স্রষ্টা ও সৃষ্টিধরী নগর ত্যাগ করে কোথায় চলে গেল। লোকাল...

ময়ূর সিংহাসন। শাহীন আখতার

Image
"আব্বাহুজুর বরাবরই আমার দুরের মানুষ। আম্মিজানের কথা ভাবলে একটা দৃশ্যই চোখের সামনে ভেসে ওঠে—তিনি মাথায় পশমি কাম্বাদার পরিয়ে আমাকে শীতের রোদ্দুরে ছেড়ে দিচ্ছেন। জায়গাটা কোথায় মনে নেই। এরপর তো বিদ্রোহী শাহজাদা খুররমের সঙ্গে তিনিই ফেরার হলেন। সঙ্গে আর সব পুত্র কন্যারা, এক আমি ছাড়া। আমার দুধদাঁত পড়ে নতুন দাঁত ওঠা সমস্তই নূরজাহান বেগমের খাসমহলে। তাঁকেই আম্মি ডাকতাম। আসল আম্মি যখন বাদশাবেগমের মুকুট পরে হাতির হাওদায় দুলতে দুলতে আগ্রা আসেন, ততদিনে আমি এগারো বছরের নওল কিশোর। আমাদের জন্য বরাদ্দ আলাদা মহল। ভাইয়ে ভাইয়ে পাশাপাশি পালঙ্কে ঘুমালেও আমরা কেউ কারও দোসর ছিলাম না। আমরা যদিও একই বাবা-মার সন্তান, তবু যেন কুকুর, বিড়াল, শিয়ালের মতো স্বতন্ত্র প্রাণী। আব্বাহুজুরের নজরেও তাই। আমরা যার যার মতো দেয়ালবন্দী হয়ে পড়ি, আম্মির ইন্তেকালের পরেই কি? উঁচু আর পুরু দেয়ালের গায়ে অনিঃশেষ থাবা মারছি, আঁচড় কাটছি—মনে হয় আমার এ রকম পাগলা দশায় বাংলার নিবাস। বাংলার রাজধানী তখন জাহাঙ্গীরনগর। হুমায়ূন বাদশার আমলে ছিল গৌড়। ঘন ঘন মড়কের উপদ্রবে ত্যক্ত হয়ে গৌড় থেকে তাণ্ডায় রাজধানী সরি...

ময়ূর সিংহাসন। শাহীন আখতার

Image
"ঘুম ভেঙে দুঃখ হচ্ছিল, জিন্দা থাকতে কেন দারা শিকোর সঙ্গে আমার মিলন হলো না? একে অন্যকে এমন মধুর ভাষায় সম্ভাষণ? এ তো খোয়াব, ভাইয়ে ভাইয়ে স্পর্শাতীত মোলাকাত। কতকাল আগে আমি দারা শিকোর চেহারা দেখেছি। মরার আগে অর্ধপলিত কেশ-দাড়িতে তিনি কেমন হয়েছিলেন দেখতে? চামড়ায় বয়সের দাগ ছিল বা হাসিতে দমের ঘাটতি? মানুষ মরে গেলে ইহলোকের কেউ থাকে না, পরলোকের বাসিন্দা হয়ে যায়। আজ যদি আনমনে আমি তাঁর কণ্ঠ শুনি, সে দাউদ নবীর মতো মধুর হলেও মনে হবে আমার ভাইয়ের নয়, এ কোনো গায়েবি আওয়াজ। রাত ভোর হতে কত দেরি? আমি জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাই। রাজমহল পাহাড়ের গায়ে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ন্ত মেঘ, মরা জ্যোৎস্নায় কেমন ভয়াল দেখায়। বাগানের বৃক্ষরাজিও ভূতুড়ে, যেন মৃদু বাতাসে ফিসফিসিয়ে কথা কইছে। সবখানে চাপা স্বর—জিন নয়তো ইনসানের। আমি কি এখনও খোয়াব দেখছি? একবার মনে হলো পাঙ্খাবরদার বা খানসামাকে ডেকে জিজ্ঞেস করি, রাতের প্রহর কত, প্রসাদের প্রহরীরা কি ঠিকঠাক পাহারা দিচ্ছে? মির্জা জানি বেগ কেল্লায় আছেন না তাঁর নিজস্ব হাবিলিতে ফিরে গেছেন? পশ্চিমাকাশের জ্বলজ্বলে তারাটির মতো আমিও যে আজ রাতে একা। আমার...