অকূলের কাল।। অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী।। সুপ্রকাশ।।

'সকাল আটটায় বেরিয়ে পড়ছে ক্ষিতি। কাঁধে ঝোলানো একটা ছোট ব্যাগের মধ্যে একটা ডাইরি, অর্ডারের বিল বই আর পেন। একটা বাস ধরে খিদিরপুরের মোড়ে নেমেই হাঁটা শুরু করে ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে। দৃষ্টি রাস্তার ডাইনে বাঁয়ে দুদিকেই— ওষুধের দোকানের সন্ধানে। মুখচোরা ক্ষিতির মনে অস্বস্তি বিজবিজ করছে। ওষুধের অর্ডার চাইতে গেলে কীভাবে, কী কথা বলে শুরু করবে! ঠিক করতে না পেরে মরিয়া ক্ষিতি, অর্ডার না পেলে চাকরিটাই বড়জোর যাবে— ধরে নিয়ে নিজের স্বভাবমতোই প্রতিটি দোকানে ঢুকে শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। ভিড় না থাকলে খদ্দের ভেবে দোকানিই এগিয়ে এসে কথা বলে। মনে মনে বারবার আওড়ানো কথাগুলোই কোনোরকমে উগরে দেয় ক্ষিতি— জি এম মেডিক্যাল স্টোর্স থেকে আসছি। আমরা অ্যালবার্ট, ইন্ডন আর ই মার্কের ওষুধ রাখি। অর্ডার দিলে হোলসেল দরে দোকানে পৌঁছে দিই।

দোকানি চোখ দিয়ে তাকে মেপে নেয়। দু-একজন ভদ্রতা করে বলে,— নতুন দেখচি আপনাকে, আসবেন মাঝে মাঝে, অর্ডার থাকলে রেখে দেব।

মনে জোর আনার চেষ্টা করে ক্ষিতি। গোবিন্দ সাহাও বলেছিল, প্রথম মাসটায় হয়তো অর্ডারই পাবেন না। নিয়মিত যেতে হবে তবুও। পরিচিত হতে একটু সময় লাগবে। তবুও দু-চারটে দোকান ঘোরার পরে নিজেকে কেমন ফালতু ফালতু মনে হলো। দোকানের খদ্দেররাও তার দিকে কেমন করুণার চোখে তাকাচ্ছে। নিজের ওজন বাড়াতেও কিছু একটা করা দরকার। মনে হতেই দোকানে ঢোকার আগে সে ব্যাগ থেকে ডাইরি আর পেন বের করে হাতে নিয়ে গম্ভীর মুখে ডাইরি খুলে দোকানের নাম ঠিকানা লেখে। তাতে ভবিষ্যতে কাজে লাগার মতো একটা তালিকা তৈরি হবে, আবার কিছু একটা কাজ করছে বলে নিজের থতমত ভাবটা কাটিয়ে উঠতে পারবে।

মোমিনপুর পর্যন্ত আসতেই ক্ষিতি বুঝতে পারল, তার পরিকল্পনায় আশাতীত ফল মিলছে। অর্ডার একটাও না পেলে কী হবে, দশ-বারোটা দোকানের নাম উঠেছে তালিকায়— এর পরের দোকানটার নাম কী হতে পারে তা নিয়ে মানসাঙ্ক করতে থাকলে হাঁটায় উৎসাহ পাচ্ছে। শুধু তাই নয়, দোকানের নাম তালিকায় তুলে সে যখন ম্যানেজার বা মালিকের কাছে গিয়ে 'নমস্কার' বলে নিজের কথা শুরু করছে তখন নিজেকেও খানিক ওজনদার বলে মনে হচ্ছে।

মোমিনপুরের মোড় পেরিয়েই ডানদিকে একটা ওষুধের দোকান চোখে পড়ল ক্ষিতির। অদ্ভুত নাম—  বেদগর্ভ ঔষধালয়। নামটা খুব মনে ধরল। দোকানে অবশ্য খদ্দের নেই একটাও। দোকানের মালিকই হবেন বোধহয় ধবধবে ফরসা, ধুতি পাঞ্জাবি পরা বেশ অভিজাত চেহারা ভদ্রলোকের— কাউন্টারের সামনে রাখা একটা চেয়ারে বসতে বললেন ক্ষিতিকে। এতগুলো দোকান ঘোরার পর এই প্রথম একটু মনোযোগ পেল সে। খানিক আশান্বিতও। শেষ পর্যন্ত জুটল না কিছুই, ক্ষিতির ঠিকুজি-কুষ্ঠি জেনে তাকে গুচ্ছের উপদেশ দিয়ে অবশেষে মিষ্টি করে জানিয়ে দিলেন, এদিকে এলেই সে যেন একবার চুঁ মেরে যায় তাঁর দোকানে। তাদের কোম্পানির ওষুধ নাকি বিশেষ বিক্রি হয় না তাঁর দোকানে। সামান্য যা হয়, তিনি চেষ্টা করবেন তাকে অর্ডার দিতে। বিশেষ হতাশ হলো না ক্ষিতি— বরং 'বেদগর্ভ' নামটা তাঁর মাথায় থেকে গেল।

কপাল চওড়া হলে অভাবনীয় ঘটনাও ঘটে। চুলের ঢাল সামনের দিকে নেমে এসে কপালটা তার ঢেকে রাখে, নইলে যে-কেউ খালি চোখেই ক্ষিতির চওড়া কপাল দেখতে পেত। ক্ষিতির অবশ্য সেটা চোখে দেখার দরকার পড়ে না, মাঝে মাঝেই এমন সব ঘটনা ঘটে যে সেটা টের পেতে অসুবিধে হয় না। তেমনটাই হলো তার চাকরির প্রথম দিনে।'


অকূলের কাল
অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী

প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত

মুদ্রিত মূল্য : ৪০০ টাকা

সুপ্রকাশ
      

Comments

Popular posts from this blog

নৈশ অপেরা।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

অনন্যবর্তী।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।