নৈশ অপেরা।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।
সুপ্রকাশ প্রকাশিত শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের উপন্যাস 'নৈশ অপেরা' পড়ে মতামত জানিয়েছেন শুভপ্রিয়া। আমরা তাঁর অনুমতি নিয়ে নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি।
...............................................
"বদ্ধ জলার ধাঁধাঁয়,
অথবা ঘন কুয়াশার জটিলতায়,
দৃশ্যের পর দৃশ্যের পুননির্মাণ ঘটে।
যবনিকা পড়ে না তার ওপর;
শুধু নখ - দাঁত, ক্ষত - আঘাতের জীবন থেকে যায়,
বহমান কাল ধরে চলা নৈশ অপেরায়।।"
-- মিরাই
অনেকদিন লিখতে বসা হয়নি। সাধ হলেও সময় কুলোয় নি। কিন্তু আজ এটা লিখতে বসতে হতো --- এই জবানবন্দী পাঠকের লিসারলি বিলাসিতা নয়, শব্দাঘাত জর্জরিত এক অমোঘ আদেশ।।
গোয়েন্দা বা রহস্যকাহিনির পোকা আমি সেই ছোটোবেলা থেকেই। ফেলুদা দিয়ে শুরু সেই যাত্রা কালে কালে ব্যোমকেশ, কিরীটি, কাকাবাবু, পারিজাত বক্সী এবং অবশ্যই দ্য ফেমাস বেকার স্ট্রীট ঘুরিয়ে নিয়ে গেছে হাল আমলের শবর, মিতিন মাসি, দীপকাকু পর্যন্ত। এই গল্পগুলো পড়ার পেছনের মূল কারণই ছিলো দ্য আনডিনায়েবল অ্যাড্রিনালিন রাশ --- কে অপরাধী, কীভাবে অপরাধ হলো, অপরাধীর অ্যালটেরিয়ার মোটিভ কি, অপরাধীর মনস্তত্ত্ব, এবং সবশেষে সেই বিখ্যাত রহস্য সমাধানের সমাবেশ --- একটা বিশাল জিগস্ পাজল সলভের মতো। মাথা খাটানোর রসদ, অপরাধীকে সঠিকভাবে শনাক্ত করার আনন্দ এই সবই ছিলো রহস্যকাহিনী পড়ার পিছনের মূল কারণ।
সেই ভালোলাগার পেছন ধাওয়া করতে করতেই শাক্যজিৎবাবুর লেখার হঠাৎ আবিষ্কার -- "শেষ মৃত পাখি" হচ্ছে ট্রিগার পয়েণ্ট, "একানড়ে" দিয়ে যাত্রা শুরু এই সমস্ত এর আগে একবার বিস্তারিত বলে দিয়েছি। "শেষ মৃত পাখি" বা "বীরেশ্বর সামন্তর হত্যারহস্য" যখন শেষ করলাম, লেখকের গল্প বলার সেই ইসেন্ট্রিক ভঙ্গিমা আর অদ্ভুত কাব্যিক বাঙ্ময় ভাষা এক অপার মুগ্ধতার সঞ্চার করেছিলো। সেই মুগ্ধতার ফলস্বরূপ সমস্ত দায়কে একদিনের জন্য সাইডলাইন করে নিয়ে এসেছিলাম "নৈশ অপেরা".... কি ধরনের কনসিক্যুয়েন্স বা পরিণাম সেই পাঠের শেষে আমার জন্য অপেক্ষা করবে তার বিন্দুমাত্র আভাস না পেয়েই।
শুরুতেই রহস্যকাহিনী পড়ার যে কারণগুলো বলেছিলাম, শাক্যজিৎবাবুর লেখা পড়তে শুরু করলে সেই কারণে প্রথমেই হোঁচট খেতে হয়, কারণ সেই লেখায় রহস্যের সমানুপাতিক সমীকরণে উঠে আসে সমসাময়িক পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, সমাজ, দর্শন, রাজনীতি, আর্দশ, জীবনচেতনা। সে "শেষ মৃত পাখি" হোক বা "বীরেশ্বর সামন্তর হত্যারহস্য" -- দুই ক্ষেত্রেই যতটা প্রয়োজনীয় ছিলো রহস্য উন্মোচন, ততটাই গভীর ছিলো সেই উপন্যাসের কেন্দ্রে থাকা জীবনদর্শন, ব্যক্তি শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের আত্মোপলব্ধির কমেন্ট্রি, তাই "শেষ মৃত পাখি" র শেষে তনয়া রহস্য উন্মোচন পরবর্তীতেও সাবলীল, সত্যের কাছে পৌঁছানোর দায় হয়ত তাকে একলা করেছিলো কিন্তু নিঃস্ব করেনি।
"নৈশ অপেরা" এই সমস্ত ধারণাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এরপর যা লিখতে যাচ্ছি তা হয়ত অসুস্থ মস্তিষ্কের বিকারের মত শোনাবে কিন্তু তাহলেও সেই বিকার সত্যি, তার থেকে রেহাই পাওয়া দায়। তনয়ার মতো আমারও বারে বারে বলতে ইচ্ছে করছে, এই উপন্যাস পড়া বা শেষ করাটা কি খুব দরকার ছিলো?? কতশত বই তো হামেশাই বেরোচ্ছে, কটাই কিনছি বা পড়ছি?? নাহয় এটাও এমনই না পড়া থাকতো, ক্ষতি তো ছিলো না কিছু। কিন্তু অবিনাশ যাদবের মত, বারবারা ব্রাউনের মত শাক্যজিৎবাবু জোর করে টেনে নিয়ে এসেছে গঞ্জের মেঠো রাস্তায়, ডেগাডেগির ধারে, একানড়ের দুনিয়ায় --- হয়ত আমি জানতে চায়নি, শুনতে চায়নি, তাও অমোঘ আকর্ষনে ছুটে গেছি বারবার। ঠিক তনয়া যেমন ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিলো, তেমনই বিগত একমাস ধরে আমিও কখনো ধরেছি আবার ছেড়েছি, যেন নিয়তির কোনো অদৃশ্য সুতো --- যতবার সে আমায় টেনে বের করতে গেছে ততবেশী আমি আটকা পড়ে গেছি, পড়তে চায়নি, তবুও হাতে তুলে নিয়েছি বইখানা। তারপর ছাইচাপা গঞ্জ জীবন্ত হয়ে উঠে এসেছে, মনে করিয়ে দিয়েছে জলার ধারে ঘুরতে থাকা ফুটফুটে শিশুর মায়া, স্যাংচুয়ারির খসে পড়া দেওয়ালে আটকে পড়া কিশোরী ট্র্যাজেডি, জোহার - হালের ভেঙে পড়া করুন ইতিহাস আর ডেগাডেগির ধারে ভুলতে বসা এক ভুতুড়ে টাউনের গল্প --- ঘৃনা, বিশ্বাসঘাতকতা, উন্মাদনা, ঈর্ষা, প্রেম, নিষ্পাপত্ব, রাগ, অহমিকা, অন্যায় এই সমস্ত রসে জারিত হয়েছে যার ছত্র ছত্র। যতবার সেই পথে হেঁটেছি, টের পেয়েছি আমার মধ্যে লুকিয়ে রাখা সেই গঞ্জ, সেই জোহার হালে, সেই বেথেল মিশন, সেই ডেগাডেগি, সেই স্যাংচুয়ারি ভীষনভাবে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তনয়ার মতোই হঠাৎ দেখতে পাচ্ছি সেই হারিয়ে যাওয়া লালচুলো কিশোরী অ্যাগনেসকে, বা ছোট্ট ক্রিসকে, বা মানবশিশু আর্থারকে যাদের গল্প ভূলে গেছে গোটা একটা টাউন, কেবল সেই ভূলে যাওয়া অতীত আঁকড়ে পড়ে আছে কজন পরাবাস্তব ছায়াশরীর, যাদের অস্তিত্বের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বয়ে চলে এই ভূলে যাওয়া অতীত। বাস্তব আর গল্পের সুক্ষ পরদাটা হঠাৎই ঝাপসা হয়ে উঠেছে যেন। তনয়ার মতোই রহস্যের উন্মোচন আর আনন্দ দিচ্ছে না, তনয়ার মতোই এই রহস্য উন্মোচন পাঠককে নিঃস্ব, রিক্ত করে -- এক অদ্ভুত শূন্যতা গ্রাস করে যেন চেতনার সমস্ত স্তরকে!! যে আনন্দের কারণে আমার রহস্যকাহিনী পড়া শুরু, "নৈশ অপেরা"র রহস্য উন্মোচনের শেষে সেই আনন্দের লেশমাত্র পেলাম কই?? কেন একটা অব্যক্ত কষ্ট দলা পাকিয়ে গলার কাছে আটকে আছে?? যদিও এই উপন্যাসের সাথে দূরদূরান্ত পর্যন্ত আমার ব্যক্তিজীবনের কোনো সম্বন্ধ নেই তবুও কেন মনে হচ্ছে বড় ব্যক্তিগত এই অনুভূতি???
এর আগে কোনো রহস্যকাহিনী কি এইভাবে কোনোদিন তছনছ করে দিয়ে গেছে ভাবনাগুলোকে?? লন্ডভণ্ড করেছে ভেতরটা?? এমনভাবে কাঁদিয়েছে কখনো??? মনে পড়ে না। সঠিকভাবে ভাবলেও উত্তর 'না' ই হবে।
এটা ঠিক এ কাহিনী নতুন কোনো ট্র্যাজেডির গল্প বলে না, যে ট্র্যাজেডি এ সমাজের, এ মানব যাপনের সঙ্গে একান্তভাবে জড়িয়ে গেছে, সেই গল্পটুকুই লেখক তুলে ধরেছে, but the crude reality with which he throws that story before us, that's what makes this book a 'haunting tragedy, a wretched pain that cuts you deep and makes you bleed। "নৈশ অপেরা" ঠিক এইভাবে বাকি সব রহস্যকাহিনীর থেকে আলাদা।
ছোটোবেলায় পড়েছিলাম 'Pen is mightier than Sword'। শব্দের আঘাতের চেয়ে বড় ক্ষত এই দুনিয়ায় বোধহয় আর কিছু নেই। এই উপন্যাসের থেকে এই প্রবাদ বচনের সার্থকতার এমন নজিরবিহীন উদাহরন বোধহয় আর হবে না। এতোদিন শাক্যজিৎবাবুর অনায়াস কাব্যিক ভাষার কলমে মুগ্ধ হয়েছি। এই প্রথমবার সেই গদ্যছন্দের আড়ালে থাকা আততায়ী শব্দের আঘাতে ক্ষত - বিক্ষত হয়েছি বারংবার। তনয়ার মতো হয়ত বুঝতে পেরেছি এক নিদারুণ আঘাত হানবে এই ন্যারেটিভের সমাপ্তি, সে শব্দের শানিত তীক্ষ্ণতা দারুণ যন্ত্রনাদায়ক, সে শব্দ গরলের তীব্র প্রভাবে নীল হয়ে পড়ে চেতনা, থামতে চেয়েও থামতে পারিনি। বিশেষ করে শেষ পঞ্চাশ পাতা... নিশব্দ রক্তক্ষরণ যেন --- এতো নির্মম, এতো নিষ্ঠুর!! চোখের কোন জ্বালা করে উঠেছে অজান্তেই, শব্দগুলো থেকে থেকে ঝাপসা হয়ে এসেছে সময়ে অসময়ে। এতটা নিষ্ঠুর কি না হলেই না হতো না??
বোধকরি লেখক নিজেও হয়ত বুঝতে পারেননি কোন নিষ্ঠুর অ্যাখান তিনি বুনে ফেলেছেন; বারবারা, অ্যাগনেস, ডেভিড, মার্গারেট, ডলোরেস, এডওর্য়াড, অবিনাশ, অ্যারন, মনীষা, রেভারেন্ড গরম্যান, অ্যালিস, ক্রিস, আলফ্রেড, মুন্না, পবনকুমাররা যেন অমোঘ নিয়তির মতো সৃষ্টি করেছে নিজেদের গ্রন্থীপথ, স্রষ্টা যেন তাতে রঙ ভরেছেন কেবল; চরিত্ররা যা লিখিয়েছে, লেখক সেই ট্র্যাজেডিকে রের্কড করেছেন কেবল। তনয়ার রহস্য উদঘাটনের আক্ষেপ, কিছু ভুলে যাওয়া ছায়াকে কবর থেকে তুলে আনার মাশুল, একাকি এক নির্মম সত্যের টেস্টিমনি বেয়ার করার বর্তমান, রহস্য শেষে এক দলা পাকানো নিঃস্বতায় ডুবে যাওয়া, এ কি তনয়ার একার পরিণতি?? লেখকের যিনি এ অ্যাখানের স্রষ্টা, বা সেই সমস্ত পাঠকের যারা এই ন্যারেটিভের নীরব দর্শক, তনয়ার এই নিঃস্বতা কি সেইসব অনুভূতির একান্ত ব্যক্তিগত কনফেশন নয়??
এর আগে যতগুলো উপন্যাস এইভাবে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে ভেতরটা, "নৈশ অপেরা"সেই তালিকার শীর্ষে থাকবে। শেষ করার পর থেকে কেমন এক অস্থির অস্বস্তি স্থির হতে দিচ্ছে না কোনোমতে। বুকের ওপর কে যেন একটা বিশ মনি ওজনের পাথর চাপিয়ে দিয়েছে মনে হয়। হয়ত অত্যুক্তি শোনাচ্ছে, মনে হতে পারে আমি বাড়াবাড়ি করছি, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে সত্যি এই উপন্যাসের শেষ আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছে, এতটায় যে স্বাভাবিক কাজে ভুল হচ্ছে, চিন্তার স্তর বিক্ষিপ্ত হচ্ছে অবিরাম, লোকের সান্নিধ্য বিরক্তিকর লাগছে আর না চাইতেও নোনাজলের ধারা গাল ভেজাচ্ছে অযাচিতভাবে।
হয়ত এমনভাবে শেষ না হলেও হতো, হয়ত এমন রক্তক্ষরণ না হলেও পারতো, হয়ত এতটা আঘাত না পেলেও হতো, কিন্তু নিয়তির ওপরে যে কেউ বড়ো নয়, আর এই গল্পের চরিত্ররা স্বতন্ত্র নিয়তির মতো নির্ধারন করেছে নিজেদের পরিণতি। সমাপ্তির পরের এই যন্ত্রনা তাই বড় কষ্টের। অপেক্ষা কবে সময়ের পলি ঢেকে দেবে ক্ষতচিহ্ন!! তারপরেও স্মৃতির অতলে বেঁচে থাকবে গঞ্জ আর জোহার হালের সেই ধূসর বেলা, ডেগাডেগির ধারের সেই নামহীন জঙ্গল আর কুয়াশা ঘেরা জলার অসময়ের মায়া।
শেষে শুধু একটা অবসারভেশনের কথা বলবো -- কয়েকদিন আগে একটিবইয়ের গ্রুপেই "নৈশ অপেরার" একটি পাঠ প্রতিক্রিয়া দেখেছিলাম যেখানে সেই জনৈক পাঠক/পাঠিকা লিখেছিলেন 'হয় আপনার শাক্যজিৎবাবুর লেখা ভালো লাগবে, না হলে একদমই ভালো লাগবে না, এর মাঝামাঝি আর অন্য কোনো পথ নেই' -- পড়ার পর মনে হয়েছিলো কি ভীষন খাঁটি মূল্যায়ন! এর থেকে অ্যাপ্ট কোনো সংজ্ঞা বোধহয় হয়না শাক্যজিৎবাবুর লেখার। হামারটিয়া পড়া এখন কেবল সময়ের অপেক্ষা। তবে"নৈশ অপেরা" এ পর্যন্ত পড়া অন্যতম প্রিয় - অপ্রিয় এক পাঠ হয়ে থাকবে নিঃসন্দেহে, কিন্তু ভবিষ্যতে গঞ্জের এই চৌকাঠ দ্বিতীয়বার পেরোতে পারবো কি না জানি না -- ব্যক্তি হিসেবে কতটা সংবেদনশীল বা স্পর্শকাতর জানি না, কিন্তু যে ভারী পাথর বুকে চেপে বসেছে তার থেকে খুব সহজে রেহাই হয়ত নেই।
নৈশ অপেরা
শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য
সুপ্রকাশ
মুদ্রিত মূল্য : ৫৪০ টাকা
Comments
Post a Comment