ছায়ার পাখি।। অভিজিৎ সেন।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

সুপ্রকাশ প্রকাশিত অভিজিৎ সেনের উপন্যাস 'ছায়ার পাখি' পড়ে মতামত জানিয়েছেন পায়েল দত্ত। আমরা তাঁর অনুমতি নিয়ে নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি।।
...............................................................
#পাঠ_অভিজ্ঞতা
♠ ছায়ার পাখি — অভিজিৎ সেন 
◾ সুপ্রকাশ, ৩৯০ টাকা 

কিছু বই শেষ হওয়ার পর পাঠককে স্তব্ধ করে রাখে। তার মস্তিষ্কের শিরা উপশিরায় সেচ দেয়, চিন্তার পালে ঢেউ ওঠে। পাঠক তখন নিজের সঙ্গে কথা বলে, তর্ক বিতর্কে মাতে। সাহিত্যিক অভিজিৎ সেন বিরচিত 'ছায়ার পাখি' উপন্যাস পাঠককে এমনই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

আখ্যানের শুরু এক আশ্চর্য বাক্য দিয়ে— ‘চিরি নদী পৃথিবীর এক প্রত্যন্তে...’। এই চিরি নদী এবং সংলগ্ন আড়বেঁকি ও ধল্লা বিলের থই থই আলিঙ্গনে গড়ে উঠেছে যে জনপদ— জলছুঁই, অর্জুনপুর অথবা সদর বৈগ্রাম— এই সুবাসিত অঞ্চল ও তার মানুষজনকে নিয়ে লেখা এই উপন্যাস যেন বাংলার যে কোনো গ্রামাঞ্চলের রূপকল্প। 

সাতের দশকের শেষার্ধে তখন প্রবল পরাক্রমশালী কংগ্রেসকে হারিয়ে বাংলার রাজনৈতিক ক্ষমতার মসনদে এসেছে বামফ্রন্ট সরকার। কিন্তু গ্রামাঞ্চলের গলি ঘুঁজিতে এখনও যথেষ্ট শক্তিশালী কংগ্রেস। এই দুই রাজনৈতিক দলের তরজায় কিছু লোক শুধুই সুবিধাবাদী পার্টির সদস্য হয়ে ক্ষমতার আশেপাশে ঘুরঘুর করে। আর আছে বাম দলগুলোর মধ্যের নিজস্ব মতান্তর, দলীয় ও উপদলীয় কোন্দল। তবু যুগে যুগে কিছু মানুষ থাকে যারা সব অন্ধকার সব নৈরাশ্যের কালো চাদর সরিয়ে বিশ্ব চরাচরে পূর্ণিমার পূর্ণ চাঁদের আলো বিকিরণ করে। ছায়া দেয়, প্রাণিত করে। সেই আলো, ছায়া বড় মরমী। এরাই হয়ত প্রকৃত ছায়ার পাখি। শ্রদ্ধেয় ভগীরথ মিশ্রের ক্লাসিক উপন্যাস 'মৃগয়া'-য় সুকুমার নামধারী এমন একজন ছায়ার পাখির সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল। আলোচ্য উপন্যাসে সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ গোপাল। গোপাল মজুমদার। ‘ব্যক্তিগত, পরিবারগত, রাজনৈতিক ইত্যাদি যাবতীয় সমস্যা ও সম্পর্কগুলোর বিচার যে খুব আলাদা করতে চায় না। তাই নিজের সম্পর্কেও মোহমুক্ত।’ “...কোথাও পৌঁছনোটাই আসল নয়, পৌঁছনোর জন্য ক্রমান্বয়ে চলাটা এবং নির্ভুল রাস্তার খোঁজ করাটাই আসল। এই পদ্ধতিটাই আসলে মানুষের জীবন...”। সুবিধাবাদী বামপন্থী পার্টিকর্মীদের ভিড়ে এই-ই সাচ্চা কমিউনিস্ট গোপালের উপলব্ধি।

রাজেশ্বরী নাম্নী একটি বিধবা যুবতী— গর্ভে বীজ বুনে যার প্রেমিক তাকে পরিত্যাগ করেছে, অনাগত শিশুর পিতার সন্ধানে ঘর ছেড়ে পথে নেমেছে সে— এই যুবতীর সঙ্গে এক আশ্চর্য বন্ধনে বাঁধা পড়ে যায় জলছুঁই গ্রামের সাগর— দোতারাবাদক সাগর, রাজেশ্বরীর ‘সাধু’। রাজেশ্বরীর গর্ভস্থ শিশুকে পৃথিবীর আলো দেখাতে চায় সাগর, সাথে থাকে তন্তুবায় ও নিঃসন্তান গায়ক দম্পতি যুগী ও যোগান। সারিন্দা হাতে সঙ্গত করে বাদক রব্বানি। এঁরা সকলে মিলে— এবং অবশ্যই নেপথ্যে গোপাল— রাজেশ্বরী ও তার আগতপ্রায় সন্তানকে আগলে রাখে পরম মমতায়। সাগর ও রব্বানি জীবনের নানা প্রশ্নত্তোর, বিবিধ জটিল রহস্য ও তার মীমাংসার সন্ধান করে দোতারা আর সারিন্দার তারের নিহিত স্পর্শে। প্রতারক বিমলের মুখোশ উন্মোচন স্বচক্ষে দেখবে বলেই হয়ত রাজেশ্বরী এতদিন গভীর বিশ্বাসে স্থিত ছিল। বিমলের প্রতারণা ও সাগরের ভালোবাসা— রাজেশ্বরীর উভয় উপলব্ধি বড় মায়াবী আখরে আঁকা। সাগরের প্রতি মুহূর্তের যন্ত্রণা মরমী পাঠককে ছুঁয়ে যায় অবিরত। 

তিনটি চরিত্র বিশেষ ভাবে স্পর্শ করে পাঠককে। নীতিহীন, চরম স্বার্থপর, মাতাল সুরেশ্বরের স্ত্রী ও বিমলের মা কৌশল্যার উপস্থিতি কাহিনীতে অধিক পরিসর জুড়ে না থাকলেও তার চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক অভিঘাত সাংঘাতিক। বন্যার জল বাড়ার সময়ে তার পুকুরে স্নান করতে নামার দৃশ্য, ফিরে এসে সুরেশ্বরের তাকে একা ফেলে চলে যাওয়া দেখা ও তারপর জলমগ্ন গৃহে একাকী মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার মধ্যে নিজের অপমানিত ব্যর্থ জীবনের প্রতি যে তীব্র বিদ্বেষ সে রেখে যায় পাঠক তাতে স্তম্ভিত হয়ে যায়। কৌশল্যা পাঠককে রীতিমতো অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। রাজেশ্বরীর হতভাগ্য পিতা গোপীনাথ ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কারণে খুন হওয়া নরেন মালোর পিতা বস্তু মালো যেন সমস্ত অসহায় পিতার প্রতিরূপ। সুযোগসন্ধানী সম্বন্ধীর নজর এড়িয়ে মেয়েকে দেখার জন্য লুকিয়ে গোপালের কাছে আসা গোপীনাথ ও ছেলের শ্রাদ্ধের দিন অভ্যাগতদের কীভাবে আপ্যায়ন করা উচিত বুঝে উঠতে না পারা বস্তু মালো কোথাও গিয়ে যেন এক হয়ে যায়।

কমিউনিস্ট গোপাল তার সারা জীবনের আদর্শের সঙ্গে দলীয় রাজনীতির অমিলের কারণে মানসিক অস্থিরতায় ভোগে। একই কারণে বিচ্ছেদ ঘটে প্রথম জীবনের দুই অভিন্ন হৃদয় বন্ধু ভবানীশংকর ও শিশিরের সঙ্গে। বন্যার সময় সরাসরি ত্রাণ কার্যে উপনীত হয়ে জন্ডিস রোগে আক্রান্ত গোপাল উপলব্ধি করে অনেক কিছু হৃত ও বিক্রীত হয়ে গেলেও তাদের নিখাদ বন্ধুত্বটুকু অমলিন থেকে গেছে আজও। রাজনৈতিক যাপনে যে পাহাড় সমান উচ্চতা ও হিরন্ময় সমারোহে পৌঁছনোর কথা ছিল বামপন্থী মানুষগুলোর, তার কতখানি তারা অতিক্রম করতে পেরেছে সেই বিচার করবে কাল, তবে সমস্ত তার্কিক ভিন্নতা সরিয়ে রেখে সেই উচ্চতা ও সমারোহ যেন প্রাপ্ত হয়েছে তিনজন প্রৌঢ় মানুষের একে অপরের হাত থেকে হাতে ব্যপ্ত হওয়া কমরেডশিপের ভরসায়।

'ছায়ার পাখি' দ্ব্যর্থহীন ভাবে রাজনৈতিক উপন্যাস। 'ছায়ার পাখি' লেখকের মরমী জীবনবোধে দীপ্য এক গভীর মানবিক উপন্যাসও। রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের ক্রান্তিকাল নিয়ে রচিত এই আখ্যান পাঠককে যেন এক দর্পণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় যা আজও— এমনকী যুগে যুগে সমান প্রাসঙ্গিক।

Comments

Popular posts from this blog

নৈশ অপেরা।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

অনন্যবর্তী।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।