অকূলের কাল।। অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী।। সুপ্রকাশ।।
'শচির গ্রামের নাম গোবর্ধনপুর। বর্ধমানে নেমে তারা কাটোয়া লাইনের ট্রেন ধরল। ভারী মজার ট্রেন। মিটার গেজ লাইন, নাম নাকি মার্টিন রেল। তিনটে কি চারটে বগি। দৌড়চ্ছে সাইকেলের বেগে। চলন্ত ট্রেন থেকেই যখন খুশি যাত্রীরা নামছে আবার খানিক দৌড়ে গিয়ে উঠে পড়ছে। দেখেশুনে মজা পেয়ে গেল চারজনে। শুরু করে দিল ট্রেনের সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা। ট্রেনে ভিড় বিশেষ নেই। মানুষের চাইতে বোঁচকাবুচকিই বেশি। ওরা উঠেছে শেষের কামরায়। দিনু আর কাকু প্রথমে চলন্ত ট্রেন থেকে লাফ দিয়ে নেমে সামনের দিকে দৌড় লাগাল। তিনটে কামরা টপকে গিয়ে উঠে পড়ল সামনের দিকের একটা কামরায়। উঠেই দেখে পিছন পিছন প্রদীপ আর অনুপমও ছুটে আসছে সামনের দিকে। শচিই কেবল সকলের ব্যাগ আগলে বসে আছে নিজেদের জায়গায়। এই করতে করতে সব কামরাই দেখা হয়ে গেল তাদের। ভর দুপুরে ট্রেন এসে দাঁড়াল 'নিগন' নাম লেখা একটা ন্যাড়া স্টেশনে। শচি বলেছিল নিগন স্টেশনে তাদের নামতে হবে। তাহলে এটাই কি সেই স্টেশন? ঠিক বুঝতে না পেরে তারা সবাই নেমে নিজেদের কামরার দিকে এগোচ্ছে, তাকিয়ে দেখে শচি পাঁচ পাঁচটা ব্যাগ কাঁধে পিঠে নিয়ে হ্যাঁচোড়প্যাঁচোড় করে নামছে।
স্টেশনে প্ল্যাটফর্ম বলতে কিছু নেই, খানিকটা উচু এবড়োখেবড়ো মরা ঘাসে ঢাকা জমি। যাত্রীদের বসার জন্য বেঞ্চ-টেঞ্চ কিচ্ছু নেই। স্টেশনের নাম লেখা একটা সাইনবোর্ড, তার খুঁটিগুলো একপাশে হেলে আছে; আর একটা এক কামরার পাকা ঘর। গাছপালা খুব কম, চারিদিকে ধু ধু করছে কাটা ধানগাছের গোড়া-ভর্তি ন্যাড়া মাঠ, মাঠের আলে অনেক ছাড়া ছাড়া দুটো একটা শ্যাওড়া আর বাবলা গাছ ধূলিধূসরিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গরুর গাড়ির লিকের একটা পথ মাঠের মাঝখান দিয়ে এঁকেবেঁকে উত্তর দিকে চলেছে। সেই লিক ধরেই চলতে শুরু করল শচি, তার পিছন ধরল বাকি সবাই। চাষের জমি পেরিয়ে লিক চলল লম্বা একটা পোড়ো মাঠের উপর দিয়ে। শচি বলেছিল তিন মাইল রাস্তা। সে রাস্তা আর শেষ হতে চায় না। একটাও গ্রাম দেখা গেল না। তবে এবার বেশ ঘন গাছপালা দেখা যাচ্ছে। তার আড়ালেই লুকিয়ে ছিল গোবর্ধনপুর গ্রাম। টিনে ছাওয়া মাটির বাড়ি শচিদের। বিরাট উঠোন জুড়ে অনেকগুলো ধানের পালই। এই সবে মাঠের ধান ঘরে ঢুকেছে। ধান ঝাড়া শুরু হয়নি এখনও। শচির মা-বাবার বয়স খুব বেশি নয়। ভাই বোনদের মধ্যে শচিই বড়ো। মাঝারি গোছের চাষি শচির বাবা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকও বটেন। বাড়ির অবস্থা সচ্ছলই বলতে হবে। খুব খিদে পেয়েছিল সকলের। বাড়ির পিছনের পুকুরে চান সেরে নিয়ে চটপট খেতে বসে গেল সবাই।
তিন দিন ছিল ওরা। শচির মা সত্যি সত্যিই দারুণ সব নিরামিষ রান্না করে কাকুকে খাওয়ালেন। শুক্তো, ঘন থকথকে আলুপোস্ত, সর্ষে দিয়ে সজনে ফুলের চচ্চড়ি, ধোকার ডালনা। ভাজাভুজি তো ছিলই। আর ছিল কাকুর ভীষণ প্রিয় তেঁতুলের চাটনি। বাকিদের জন্য পুকুর থেকে ধরা টাটকা রুই মাছ ভাজা আর কালিয়া। সন্ধেবেলায় শচির মায়ের হাতে ভাজা হলুদ মুড়ি খেয়ে কাকু তো মোহিত। চালভাজার সঙ্গে বাদাম ছোলা আর কুসুম বীজ মেশানো সেই মুড়ি জীবনে প্রথম খেল কাকু। তাদের দেশে এর চল নেই। কুসুম বীজও সেই প্রথম দেখা। আহা কী দারুণ গন্ধ!
প্রথমের সেই শেষ নয়। আরও এক নিষিদ্ধ জিনিসের প্রথম স্বাদ পেল তারা। দ্বিতীয় দিন সন্ধেবেলা শচি বলল, চল আজ তোদের এমন একটা জিনিস দেখাব ভুলতে পারবি না জীবনে।
কী দেখাবে শচি! সবাই কৌতূহলে টইটম্বুর। মেয়েঘটিত কিছু না-কি! হাজার প্রশ্নেও কোনো ক্লু দিচ্ছে না সে। কাকুর একটু ভয় হচ্ছে— কী না কী দেখাতে গিয়ে ঝামেলায় ফেলে দেবে না তো! গ্রামের অন্ধকার রাস্তা দিয়ে শচির পিছন পিছন চলেছে তারা। বেশ কিছুটা এসে একটা খড়ো চালের মাটির ঘরের দরজার কাছে এসে শচি হাঁক দিল,— ধনাদা আছো নাকি?
একটা রোগা আধবুড়ো লোক দরজার বাইরে একটা কুপি হাতে এসে দাঁড়াল। শচিকে দেখেই বেশ খুশি খুশি গলায় বলল,— আরে সচেখুড়ো, কবে এলে?
শচি বলল,— জিনিস আছে তো? এই দেখ কাদের নিয়ে এসেছি। সবাই আমার কলেজের বন্ধু।
খুব ব্যস্ত হয়ে উঠল লোকটি।— এস এস— বলেই কুপিটা ঘরের মেঝেতে নামিয়ে ঘরের কোণ থেকে একটা তালাই নিয়ে পেতে দিল। বলল,— আসেন আসেন, বসুন সবাই।
শচি বলল,— ভালো জিনিস বের করো দেখি একটা।
লোকটি একটা বেঁটে বোতল ঘরের কোণ থেকেই বের করে এনে তালাইয়ের একপাশে রাখল। সঙ্গে শালপাতায় এক দলা নুন।
কাকু ভীষণ অবাক। প্রায়ান্ধকার ঘরের বাতাসে একটা কড়া গন্ধ ঘুরপাক খাচ্ছে। জিনিসটা কী হতে পারে আন্দাজ করতে পারছে সবাই। কিন্তু নুন কেন?
শচি বলল, নুন দিয়েই এটা খেতে হয়। এক চুমুক দিয়ে একটুখানি নুন জিভে ঠেকালেই মাথা পরিষ্কার। মেজাজ ফুরফুরে। ধনাদা একবার দেখিয়ে দাও তো তোমার চোলাইয়ের মহিমা।
ধনাদা বোতল থেকে একটুখানি তরল তার আঙুলে ঢেলেই আঙুলটা কুপির শিখায় ধরল। সঙ্গে সঙ্গেই দপ করে আগুনের শিখা জ্বলে উঠল ধনাদার আঙুলে।'
অকূলের কাল
অর্দ্ধেন্দুশেখর গোস্বামী
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত
মুদ্রিত মূল্য : ৪০০ টাকা
সুপ্রকাশ
Comments
Post a Comment