হামারটিয়া।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

সুপ্রকাশ প্রকাশিত শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের উপন্যাস 'হামারটিয়া' পড়ে মতামত জানিয়েছেন পথিক মিত্র। আমরা তাঁর অনুমতি নিয়ে নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি।
............................................
বই : হামারটিয়া 
লেখক : শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য  
প্রকাশনা : সুপ্রকাশ প্রকাশনা 
মুদ্রিত মূল্য : ৩৫০/-

এই কলামটি আমি বিগত পাঁচ ছয় বছর ধরে লিখি। তখন আমি বইপাড়ার সাথে নেহাত একজন পাঠক হিসেবে যুক্ত। কাজেই বই পড়ে ভালো, খারাপ যা লাগতো, নির্দ্বিধায় লিখে দিতাম। এরপর যখন নিজের দু একটা বই এলো, একজন লেখক বন্ধু বললেন খারাপ কে খারাপ বলতে নেই। তারপর থেকেই যাকে স্পর্ধা বিদায় নিলো, বিনয় এলো।

আজকেও এর ব্যতিক্রম হতো না যদি শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের হামারটিয়া বইটা না পড়তাম। আজকাল থ্রিলারের রমরমা বাজার। পাঠক এবং প্রকাশকের এক দাবি থ্রিলার দাও, যাতে একশন থাকবে, টুইস্ট থাকবে একাধিক, শিহরণ থাকবে, আরো বেশি টুইস্ট থাকবে! সাম্প্রতিক কালে আমার কিছু গল্পের অডিও রূপান্তরের ক্ষেত্রে দেখেছি বারবার শ্রোতা জানাচ্ছেন আরও থ্রিল চাই, আরো রহস্য চাই, আরো টানটান সারপ্রাইজ চাই!!

না চাইতেই পারেন পাঠক তবে আমরা যে সাহিত্য আর না সাহিত্যের পার্থক্য ভুলে যাচ্ছি এটা বেশ বুঝতে পারছি। ৫০০০ শব্দের পাঁচটা টুইস্ট সমৃদ্ধ একটা গোয়েন্দা গপ্প আপনি পড়তেই পারেন কিন্তু সেটা উৎকৃষ্ট সাহিত্য কি? আমাকে একজন বলেছিলেন নবারুণ বা মার্কেজ না পড়লে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে শুনি? তিনি লেখালেখি করেন তবে সাহিত্য পড়েন না! যে কোন গল্প যে সাহিত্য হয়না, আর আপনি উত্তেজনায় কেঁপে উঠলেই যে সেটা সাহিত্য হয়না এটা থ্রিলার প্রেমী বাঙালির বোঝা উচিত!!

শাক্যজীতের শেষ মৃত পাখি পড়েই ছিটকে গেছিলাম, তারপর একানড়ে!! শেষ মৃতপাখির ক্ষেত্রেও অনেক সো কল্ড গল্প লিখিয়ে বলেছিলেন হাঙ্গরী জেনারেশন নিয়ে জ্ঞান শুনতে থ্রিলার পড়বো? খুব রাগ হয়েছিল!! কিন্তু ওই ট্র্যাশ কে ট্র্যাশ বলা যায়না এটাই নিয়ম!! কিন্তু ভালো সাহিত্য কে নিশ্চয়ই ভালো বলা যায়? হামারটিয়া আমাকে জিতে নিয়েছে শাক্যজিত বাবু! বহুদিন দিন বাদে এক দিনে ( ছয় ঘণ্টার ফ্লাইট ছিল) আমি একটা বই শেষ করলাম। কি তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ, আবেগের কি সূক্ষ্ম ব্যবহার!! হ্যাঁ আমিও শেষ টুইস্ট বহু আগে আন্দাজ করতে পেরেছিলাম, কিন্তু তাতেও গোটা যাত্রাপথের উত্তেজনা এক বিন্দু কমেনি। আমি পাঠক হিসেবে নাক উঁচু বরাবর!! তাই যদি দেখি লেখক আমাকে কিছু ইনফো দিয়ে চমকাতে পারছেন না আমি তাকে জজ করি!! এখানেও শাক্যজিত জিতে গেছেন!!

আমি পুনেতে বাংলা নাটক করার চেষ্টা করি। তিন চারটে নাটক লিখেছিও বটে। বাংলার বই বাজারে অনেক জনপ্রিয় লেখক ব্রেখট এর নাম ও জানেন এটাও দেখেছি আর তাতে তাদের এক বিন্দু আফসোস ও নেই সেটাও দেখেছি!! আরে পাবলিক তো খাচ্ছে। সেখানেই একটা থ্রিলারের সাথে গ্রিক ট্র্যাজেডির এমন এক মিশ্রণ মুগ্ধ করেছে আমায়। বিশ্বাস করুন এই গল্পে আর পাঁচটা শিহরিত টুইস্ট আনতে পারেন উনি কিন্তু সেসব না করে উনি যে দার্শনিক পথ অবলম্বন করে ইন্টেলেকচুয়ালি একটা ক্রাইম কে এনালাইসিস সেটা ঈর্ষণীয়!! স্কেপগোটের উৎপত্তি আমার সাথে থাকবে বহুদিন আর সেটার সাথে গল্পের প্লটের মিলন যেন একটা কবিতার মত!! একই ভাবে মুগ্ধ করেছে বইটার নামকরণ—  "হামারটিয়া" !! গুগল বলছে এর অর্থ
"fatal flaw in a character or an error in judgment that ultimately leads to the protagonist's downfall"

মানেটা প্রথমেই দেখেছিলাম আর তাই পুরো গল্পেই ভাবছিলাম এই নামের সার্থকতা!! কিন্তু নির্মম উপলব্ধি হিসেবে নেমে এলো বইয়ের শেষ অধ্যায়ে!! শাক্যজিৎ বিষাদ উদযাপনের জাদুকর!! অথচ শব্দ বন্ধনী বা ভাষা খুব সহজ , সরল অনেকটা মধ্যবিত্তের রোজনামচার মত। অথচ সেই ছাপোষা মধ্যবিত্ত গল্পটাই শেষে একটা গ্রিক ট্র্যাজেডিতে রূপান্তরিত করছেন লেলক। সেটা এক কথায় অনবদ্য, জাদুবাস্তব তুল্য!!

কি একখানা লাইন দিয়ে গেলেন স্যার, এত রাতের ঘুম কেড়ে নেবে দেখছি!!
" ...Justice is a Mean Position..."

বর্তমান রাজনীতিতে অন্তত এইসব আদর্শের বা ফিলোসোফির কোনো জায়গা নেই!! লোক ভায়োলেন্স কে উদযাপন করে, আই ফর আন আই কে সাহসের নাম দেয়!! তবু মাঝেমাঝে ভেড়ার পালের মধ্য একটা দুসাহসী ব্যতিক্রম হিসেবেই আপনি থেকে যান !!

যদি পাঠক হিসেবে আপনি প্রতি পাতায় টুইস্ট আর শিহরণ খোঁজেন,গ্রিক ট্র্যাজেডি সম্বন্ধে কিছু না জানেন বা জানতে না চান তাহলে এই বইটা পড়ে মুখ ভেটকে আপনি আঁতেল বলে গাল দেবেন এটা নিশ্চিত!! তবে যদি একটু স্বাদ বদলে ভালো সাহিত্য পড়তে চান এই বইটা অবশ্যই অমোঘ আনন্দ দেবে!!

Comments

Popular posts from this blog

নৈশ অপেরা।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।

অনন্যবর্তী।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।