Posts

Showing posts with the label স্মৃতিগদ্য

ঝিঙাফুলের কলি।। মিহির সেনগুপ্ত।।

Image
'বাঁশরির অ্যাংলো-খারোয়ার অসামান্য রূপে যে আমি মুগ্ধ ছিলাম সেকথা আমি গোপন করিনি। যে-কোনো পুরুষের মতোই তার অসহ্যতার কথা আমি অকপটে বলছি। প্রায় বৎসরাধিককাল তার সঙ্গে মেলামেশা করেও যে আমি কীভাবে তার দৈহিক আকর্ষণ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিলাম, সেকথা আজকের এই শেষ বয়সে এসেও অবাক হয়েই ভাবি। তবে এর পিছনে যে শুধু আমার সংযমী কৃতিত্ব তা আদৌ ভাবার কারণ নেই। আমি ছিলাম একজন বিবাহিত পুরুষ। সে তখনও কুমারী। সেই বয়সটা আমাদের দু-জনকেই বিধ্বস্ত করতে পারত। কিন্তু আমরা পরস্পর পরস্পরের প্রতি আকৃষ্ট হলেও পরস্পরকে রক্ষা করেছিলাম অমিত প্রচেষ্টায়। এটা কারুর একক কৃতিত্ব ছিল না। অথবা আমরা কেউ কি জানি এই শরীর বিষয়ক কৃচ্ছ্রতা কোনো কৃতিত্ব না সাহসেব অভাব? উভয়ে উভয়ের প্রতি যে আসক্ত, তা কারুর কাছেই গোপন নেই। এ নিয়ে কোনো মিথ্যেচারও নেই। এমনকী আমার স্ত্রীও আমাদের পারস্পরিক মানসিক সম্পৃক্তি বিষয়ে অনবহিত তখন ছিলেন না। বিষয়টি নিয়ে যদি কোনো রোম্যান্টিক গল্প উপন্যাস ফেঁদে বসতাম, সত্যমিথ্যে মিলিয়ে দিব্যি একটি হয় রগরগে, অথবা প্লেটনিক প্রেমের কাহিনি বিন্যাস করা যেত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, লিখতে বসেছি স্ম...

ঝিঙাফুলের কলি।। মিহির সেনগুপ্ত।।

Image
'ঝুমুর গানের সঙ্গে সাঁওতালি বা অন্য কোনো কোলীয় গোষ্ঠীর লোকায়ত সংগীতের বিশেষ কোনো যোগ নেই। ‘ঝুমুর মূলত দ্রাবিড় ভাষাভাষী গোষ্ঠীর প্রেমসংগীত, নৃত্য এই সংগীতের অনুষঙ্গ' কোনো কোনো গবেষকের এই অনুসিদ্ধান্তটি যে তাৎপর্যপূর্ণ তা ব্যক্তিগত ভাবে আমার অভিজ্ঞতায় আমি জেনেছি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঝুমুরকে নৃত্যের অনুষঙ্গ হিসাবেই পেয়েছি। মুন্ডারি 'পারহা প্রধানেরা' যখন জোরজবরদস্তি রাজা বা জমিদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন, তখন বহিরাগত হিন্দু ব্রাহ্মণ পুরোহিতদের নিকট থেকে ক্ষত্রিয়জাতির অন্তর্ভুক্তি আদায় করে নিতেন। ঝাড়খন্ডি আদিবাসী এবং কুর্মি সমাজে এরূপ উচ্চকোটির জাতিত্ব ক্রয় করার প্রভাব নিম্নকোটিতেও ক্রমে বিস্তার লাভ করে। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগে ঝাড়খণ্ডের উপর দিয়ে চৈতন্যদেবের পুরী যাত্রার সময় সেখানকার উচ্চকোটি এবং নিম্নকোটির উপর তাঁর প্রভাব বিস্তৃতি পেয়েছিল। ফলে ঝাড়খন্ডের রাজা-জমিদারেরা রাধাকৃষ্ণের প্রেম এবং বৈষ্ণব কবিদের কীর্তন-পদাবলির দ্বারা আকৃষ্ট হয় এবং এই অঞ্চলে কীর্তনের সুরের একটা সংমিশ্রণ ঝুমুর ইত্যাদি লোকসংগীতের উপর পড়ে। সম্ভবত এই সময় থেকেই আঞ্চলিক প্রচলিত প্রেম-স...

ঝিঙাফুলের কলি।। মিহির সেনগুপ্ত।।

Image
'বাঁশরি গান শুরু করার আগে কিছু প্রাসঙ্গিক বক্তব্য নিবেদন করে এবং তা পরিষ্কার মানবাংলাতেই। অত্যন্ত বিনম্রতার সঙ্গে সে বলে 'পারিবারিক পরম্পরায় আমি ধর্মমতে ইসাই। কিন্তু সেটাই আমার একমাত্র বা প্রধান পরিচয় নয়। আমার সাংস্কৃতিক পরিচয়ে আমি ঝাড়খন্ডি। রক্ত, ভাষা এবং গোষ্ঠীগতভাবে আমি মুন্ডারি গোষ্ঠীর মানুষ। সম্ভবত সে কারণেই পৃথাদিদি আমাকে শুরুটা মুন্ডারি ভাষার একটি গান দিয়ে করতে বলেছেন। অবশ্যই তা আমি করব। তবে যে এলাকাটিতে আজকে আমাদের আসর, সেখানে মুন্ডারি ভাষাভাষী স্ত্রী-পুরুষ খুব কমই উপস্থিত বলে আমার বিশ্বাস। এখানে বেশির ভাগ ঝাড়খন্ডবাসীই কুর্মি-মাহাত। আদিবাসী মুন্ডা, কোল, সাঁওতাল এবং অন্যান্য ছোটোবড়ো গোষ্ঠীর মানুষেরা সামান্য রকমফেরে কোলীয় বা মুন্ডারি ভাষাই শিশুদের মধ্যে ব্যবহার করেন। মাহাতরা যদিও আদিবাসীদের অতি ঘনিষ্ঠ এবং সাঁগা ভাই, তথাপি তাদের সমাজ এখন ভাষাগতভাবে সম্পূর্ণ পৃথকভাবেই বিকশিত। এটা ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়মেই ঘটেছে। মনে হয়, আমাদের জাতি বা গোষ্ঠীগুলির যদি সম্মিলিতভাবে ভাষাকেন্দ্রিক একটি জাতি হিসেবে বিকাশ আমরা চাই, তবে একমাত্র কুর্মালি ভাষাটিই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।...

ঝিঙাফুলের কলি।। মিহির সেনগুপ্ত।।

Image
'শাহনওয়াজ গাড়িসহ এসে গিয়েছিল। বলল, “আর দেরি নয়। এবার যেতে হবে।' শাহনওয়াজের সারথ্যে সোনেরিয়া টাঁড়ের উদ্দেশে রওনা হলাম। সময়টা বর্ষা শেষ এবং শরতের শুরু। স্থানটা ছোটোনাগপুর মালভূমির একটা আঁচল বিশেষ। যাঁরা অভিজ্ঞ, জানেন, মালভূমির বর্ষা এবং শরৎ— এই দুটো ঋতুই কতটা নয়ন তথা মন ভোলানো। কিন্তু সেই শোভা উপভোগ করতে পারে কিছু বহিরাগতরা। সেই উপভোগের রকমারি গল্প ধরা আছে সেকালের তথাকথিত প্রবাসী বাঙালি লেখক-সাহিত্যিকদের গল্প-উপন্যাসে অথবা কলকাতায় জাপানি বোমাতঙ্কী ড্যাঞ্চিবাবুদের স্মৃতি-আলেখ্যে। এ স্থানের লোকসাহিত্যে বা সাংস্কৃতিক চর্চায় তার উপস্থিতি প্রায় নেই। কারণ, এখানে বর্তমান অরণ্য-নিশূন্যতা, ঝাঁটি ঝাড়-জঙ্গল এবং কেলেকুষ্টি, হাড়-বেরোনো ডিংলা-পারা অধিকাংশ মানুষই আবহমানকাল আছে দারিদ্র্যসীমার সীমান্তে। কদাচিৎ অস্তিত্বে থাকা দু-চারটা আকাশস্পর্শী মহিরুহের শীর্ষ শোভা চোখ তুলে, মন খুলে দেখার সুযোগ তাদের কদাপি হয় না। পরেশনাথ পাহাড়ের সুউচ্চ অরণ্যবেষ্টনীতে ঠিক বৃষ্টি আরম্ভ হওয়ার আগের মুহূর্তে যখন পুষ্কর বা দক্ষিণাবর্ত মেঘগুলো পেঁজা তুলোর মতো ঝুলে দোল খায় বা তাদের মেঘিনীদের সঙ্গে রঙ্গক...

ঝিঙাফুলের কলি।। মিহির সেনগুপ্ত।।

Image
'কৈকেয়ী এরপর পাতা নাচের ছুট্‌কো কিছু গান করে। পাতা নাচ আর পাঁতা নাচ দুটো আলাদা ব্যাপার। পাঁতা নাচ আদিম মানুষের বৃষ্টি প্রার্থনা এবং শস্যোৎপাদন ক্রিয়ার ঐন্দ্রজালিক, বিশেষত যৌন ক্রিয়া অনুকৃতির অনুষ্ঠান। ধরিত্রীর উর্বরতা কামনাও এই অনুষ্ঠানের অন্যতম অঙ্গ। পাতা নাচ শুধু করম নাচের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এ বিষয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতণ্ডা আছে, তা থাকুক, কৈকেয়ী গাইছে,- “আমার বঁধু হাল বাহে কিয়া লাটার আড়ে ডাহিনে বায়ে লাল গরু দেখে হিয়া ফাটে ননদী লো আমি যাব নিজেই বাইসাম্ দিতে।' (বাইসাম বাসি আমানি পান্তা ভাত ) এবং “আমার বঁধু হাল বাহে কেঁদ কানালীর ধারে গরা গায়ে খরা লাগে বড় দয়া লাগে। মুখের ঘাম ছুঁয়ে পড়ে দেখে নয়ন ঝুড়ে ননদী লো হামি যাব নিজেই বাইসাম্ দিতে।' ঝাড়খন্ডি কিষাণ ভোর ভোর লাঙল কাঁধে মাঠে যায়। কেয়া ঝোপের ধারে সে লাঙল চষে। ক্রমে বেলা বাড়ে, প্রখর হয় রোদ্দুর। কিষান বউয়ের মনও ততই স্বামীর জন্য চঞ্চল হয়। ননদকে বলে, স্বামীর বাইসাম সে নিজেই নিয়ে যাবে। এ ভাষা আমাদের প্রতিবেশীর মুখের বুলি। বিস্তারিত ব্যাখ্যা প্রয়োজন হয় না। কিন্তু বাইসামের দেরি দেখে তো স্বামী নিশ্চয় রাগে ফুঁস...

ঝিঙাফুলের কলি।। মিহির সেনগুপ্ত।।

Image
'বাইরে প্রবল বৃষ্টি চলছে। ইস্কুলবাড়ির সামনে একটি সুবিস্তীর্ণ খেলার মাঠ। স্থানটির নাম পাঠান- টোলি। মোগল আমলে নাকি পাঠান-পল্টনের ছাউনি ছিল জায়গাটা। তোপচাঁচি, বাসপুরা, তাঁতরি, করমাচাড়, মানটাড় এইসব গাঁও-বসতিগুলো পোক্ত হলে এখানে দুর্গাবাবুদের এই ইস্কুলটির পত্তন হয়। ইস্কুল এলাকার আশেপাশে দু-একটি ঝোপড়ি আছে। তারা সব রুইদাস জাতের লোক। ইস্কুলের অবস্থান দক্ষিণ-মুখী। পুব দিকের একটি ঝোপড়ি বা টালির ছাউনিওলা কুটিরের চালে ভারি সুন্দর হলুদ রঙের ফুল ফুটে রয়েছে। দুর্গাবাবুকে বলেছিলাম আজ ঝিঙাফুল্যা নাচগান বিষয়ে কথা হবে। দুর্গাবাবু মোটা বাঙালিদের নিয়ে একটা বড়ো আলোচনার সূত্রপাত করার মুখে সেটাকে থামা দিতে হলো। কারণ, আমার মনের মধ্যে একটা নতুন সাংস্কৃতিক সমাচার শোনার আগ্রহ বড়ো উতলাভাব সৃষ্টি করেছিল। দুর্গাবাবুর আলোচনাটিও অবশ্য নতুন তথা অজানা সংবাদ পরিবেশনের দিকে এগচ্ছিল, কিন্তু অতবড়ো পরিধির আলোচনার মধ্যে যেতে মন চাইছিল না। ভাবছিলাম, আগে প্রাথমিক কিছু উচ্ছ্বাসের নির্মাণ হোক, তাত্ত্বিক ব্যাপারটা পরে হবে। চা খেতে খেতে দুর্গাবাবু পুবদিকের সেই হলদে ফুলে ছাওয়া চালার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দেখুন এই বা...