লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর: এক বিষাদান্ত পরম্পরা ।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।
সুপ্রকাশ প্রকাশিত অনন্ত জানার বই লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর : এক বিষাদান্ত পরম্পরা পড়ে লিখেছেন মহুয়া বৈদ্য। আমরা তাঁর অনুমতি নিয়ে নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি।
..................
এক একটি বই কালেভদ্রে হাতে আসে যেটি পড়ার পর মনে হয়, হ্যাঁ পরিপূর্ণ কিছু পড়ে উঠলাম, যে পড়ার মাঝে ফাঁকফোকর প্রায় কিছুই নেই। বইটির নাম, “লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর : এক বিষাদান্ত পরম্পরা”। লেখক অনন্ত জানা। পারিবারিক জীবনালেখ্যর সাথে লেটার-প্রেসের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং ইতিহাস মিশেমিশে একটি নিটোল পাঠের আয়োজন এই বইটিতে। সুপ্রকাশ একটি অসামান্য বই প্রকাশ করেছেন।
এই যে প্রতিনিয়ত এত বই আমাদের হাতে উঠে আসছে, সেই বই যাঁরা তৈরি করছেন, তাদের জীবনের অনালোকিত এবং প্রায় অনালোচিত অধ্যায় এই বইয়ের বিষয়বস্তু। বইটির মূল বৈশিষ্ট্য হল বিষয়বস্তুর সাথে জীবনস্মৃতির উপাখ্যানের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন। একজন কম্পোজিটরের জীবন, পরিবার, প্রেস…এই সমস্ত যাপনের সাথে অনায়াসে মিশে গেছে প্রেসের ইতিহাস, কম্পোজিটর জীবিকাটির ইতিহাস এবং তার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র।
বইটির লেখক প্রকৃত অর্থে ‘কাঙলীর নাতিপুতি’দের একজন। একটি একান্নবর্তী পরিবারে সম্ভবত সেজোছেলের ছেলে তিনি। তাঁর বড় এবং মেজো জ্যাঠামশাই একসময় একটি প্রেস চালাতেন। তাঁদের আদি-আবাস কুঠিডাঙায় সেটিই ছিল প্রথম প্রেস। একটি পারিবারিক বিপর্যয়ে প্রেসটি তাঁরা বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ফলে লেখকের ঠিক আগের প্রজন্মে, চারভাইয়ের মধ্য তিনভাই (লেখকের দুই জ্যাঠামশাই এবং বাবা) হয়ে উঠেছিলেন মূলত: লেটার-প্রেসের কম্পোজিটর। তাঁদের সুবিস্তৃত সংসারজীবন জুড়ে একান্তভাবে জড়িয়ে রয়েছে ছাপাখানা। “অগ্রভাষ” এ লেখক নিজেই বলেছেন, “পরিবারটিকে ছাপাখানাজীবী বলা যায়“। “কোনো না-কোনভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে” যুক্ত থাকা এই মানুষেরা ছিলেন আপোষহীন,’তনখাইয়া’স্বভাবের, দৃঢ অথচ বিনয়ী…লেখকের ভাষায়, তাঁদের ব্যক্তিত্বে ছিল “ নম্র-ঋজুতার স্নিগ্ধতা” বা “মনের বনেদিয়ানা”... “ শত দারিদ্র্য কিংবা অস্বীকৃতির আঘাতও যাকে পরাস্ত করতে পারেনি।”
এই কথাটুকু দিয়ে এই লেখা শুরু করছি, কারণ লেখক পাতায় পাতায় এই বক্তব্যের সদর্থক বর্ণনা করেছেন।
একটি পরিবার…তার সুখ-দুঃখ, ওঠা-পড়া, আনন্দ- বেদনা… সবকিছুই লেটার-প্রেসের উত্থান-পতনের সাথে ঢেউয়ের দোলায় দুলে দুলে চলেছে। এরই মধ্যে, বাড়ির ছোটোরা কুটিদি আর পুটিদির নেতৃত্বে “অতি-অনুচ্চ অথচ সুরেলা কন্ঠে পাঠ-কথকতা” থেকে আত্মস্থ করছে ‘বুড়ো আংলা’,পথের পাঁচালি’,’পাগলা দাশু’,’রামের সুমতি’,’ভোম্বল সর্দার’,’বাংলার ডাকাত’, ’ঠানদিদির থলে’,’চাঁদের পাহাড়’ ইত্যাদি ক্লাসিক বইপত্র। মেজো জ্যাঠামশাইয়ের নিয়মিত অভিভাবকসুলভ তত্ত্বাবধানে তারা “ প্রতিদিন একটু করে বাংলা” লিখছে…তাদের মাথায় ঘুরছে, মেজো জ্যাঠামশাইয়ের কথা, ”এই ধরো, মাঠঘাট, ইস্কুলের মাঠে গরু চরছে, আমাদের এই কুঠিডাঙার বাজার-হাট,এই আকাশ-বাতাস, রাস্তাঘাট, এই যে এত মানুষজন… বুঝলে কীনা সবকিছু নিয়েই লেখা যায়।”
এই সামান্য অংশটুকু পাঠ করেই বোঝা যায়, যে তাঁদের যাপন ছিল উঁচু তারে বাঁধা…রোজকার রেশন-চালের ভাত-ডাল-আলুভাজার গেরস্থজীবন এই সুরকে কিছুতেই ব্যহত হতে দিত না। এই যে বললাম, উঁচু তারে বাঁধা, একটি উদ্ধৃতি থেকে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে। লেখকের আপোষহীন বড় জ্যাঠামশাই, বিদ্যালয় কতৃপক্ষের সাথে নীতিগত বিতণ্ডা তৈরি হলে
মাঝে মাঝেই শিক্ষকতার চাকরি থেকে ইস্তফা দিতেন। সেই “ ‘রেজিগনেশন লেটারগুলি’তে ‘রেফারেন্স এবং ক্রশ-রেফারেন্স’ হিসেবে কী কী থাকতো তার একটি নমুনা পড়া যাক – “কার্লাইলের 'পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট', চার্লস ল্যাম্বের 'সুপার অ্যানুউটেড ম্যান', জর্জ ওয়াশিংটনের 'ফেয়ারওয়েল অ্যাড্রেস', বার্ট্রান্ড রাসেলের 'দি কনকোয়েস্ট অব হ্যাপিনেস' বা 'দি ট্রাইয়াম্ফ অব স্টুপিডিটি' কিংবা 'ভগবৎ গীতা' থেকে 'অ্যান্টিডুরিং' “ ইত্যাদি এমন আরো অনেক কিছু। এবং এই কারণেই তারা নিশ্চিন্ত থাকতেন এই ভেবে, “ আমরা হলাম গিয়ে কাঙালের নাতিপুতি,আমরা ঠিক চালিয়ে নেব, কোথাও আটকাবে না।” তাদের এই গর্বিত বিশ্বাসের কারণ যথাযথ ছিল।
এই যে দুরন্ত বিশ্বাস, এর জোরেই তাঁরা একটি জীবন নম্র- ঋজুতায় পার করে দিলেন। প্যারিচাঁদ মিত্রের ঈষৎ শিথিল মন্তব্য, “সাবঅর্ডিনেট সিচ্যুয়েশন অব এ কম্পোজিটর ইন দি প্রিন্টিং অফিস “ বা “ নিচুপদ”... এই বক্তব্যকে তুড়ে উড়িয়ে দিয়ে এই এই পরিবারটি কম্পোজিটর পদটিকে “ অতি মূল্যবান আভিজাত্যের চিহ্ন বলে মনে করতেন”।
বইটির সবচেয়ে উল্লেখ্যোগ্য বিষয় হল, লেখক আশ্চর্য দক্ষতার সাথে তাঁদের পারিবারিক ইতিহাস ও উত্থান-পতনের সাথে কম্পোজিটরদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উত্থান-পতনের ইতিহাসের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। এত সুন্দর যুগলবন্দী সাধারণত দেখা যায় না। প্রথম বাঙালি মুদ্রাকর গঙ্গাকিশোর ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে কাঙাল-হরিনাথের সময়কাল, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সংস্কৃত যন্ত্র প্রেস, দ্বারকানাথ ঠাকুরের ইন্ডিয়া গেজেট প্রেস, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ‘ক্যালকাটা’জ আউটস্ট্যান্ডিং প্রিন্টার’, ডক্টর উইলিয়াম হান্টারের হিন্দুস্তানী প্রিন্টিং প্রেস ইত্যাদি মুদ্রণ সংস্থা থেকে ক্রমে ক্রমে বর্ধিত হয়ে কিভাবে আজকের কলেজস্ট্রীট বইপাড়ার জন্ম হল, তার ধারাবাহিক ইতিহাস ঝরঝরে গদ্যে তথ্যসহ বর্ণনা করে গেছেন। এই ইতিহাসে সংযুক্ত হয়েছে কম্পোজিটরদের অমানুষিক পরিশ্রমের নিরিখে তাদের নামমাত্র বেতন-বঞ্চনার কথা, অস্বাস্থ্যকর ঘুপচি প্রায়ান্ধকার ঘরে একটানা ঘন্টার পর ঘন্টা ‘“অক্ষর সংযোজন, কপি-প্রস্তুত কিংবা প্রুফ-কারেকশন” কথা। এসব কথায় মন ভারী হয়ে গেলে মনে পড়েছে প্রবীণতম কম্পোজিটর সুবলবাবুর ‘হস্ত-প্রক্ষলনের’ কথা, ছোকরা ইঙ্কম্যান অনিল দাসের সেই অসামান্য উক্তির কথা,”চলুন দাদাসকল বাবুসকল কাকাসকল – মধ্যাহ্নকালীন পিণ্ডপাতের আগে আমরা হস্ত-প্রক্ষালনে যাই।” আসলে তখন হাজার অসুবিধার মধ্য থেকেও আনন্দ নিঙড়ে নিতে জানতেন প্রেসে কর্মরত মানুষেরা, কারণ তাঁরা তো “ আনন্দেই অক্ষরশিল্পী হতে” চেয়েছেন। লেখকের জ্যাঠামশাইদের অভিজ্ঞতার ভান্ডারে এমন অসংখ্য সরস ঘটনার ঘনঘটা। বিশেষত, “ ছাপাখানার ভূত” বিষয়ক লেখাগুলি অত্যন্ত স্বাদু।
কয়েকটির উল্লেখ না করলেই নয়,
“যেমন: নবপ্রভাত মুদ্রণালয়ে 'ক্ষ্ম' অক্ষরটির অভাবে 'লক্ষ্মণ' হয়েছিলেন 'লক্ষমণ' প্রায় একমাস পরে 'ক্ষ' কিনে আনার পরে 'লক্ষ্মণ' তাঁর পিতৃদত্ত নাম ফিরে পান।”
আবার, “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বানিয়েছিল বরীব্দ্রনাথ কুঠার!/...'দুই জনপ্রিয়' হয়ে ওঠে 'দুই জন প্রিয়',/ 'সত্যের মতো বদমাশ'কে বানিয়ে দেয় 'সত্যের মাতা বদমাশ'...” ইত্যাদি।
এ বিষয়ে সেরা গল্প লিপিমালা প্রেসের পঞ্চাদার। তিনি কলকাতার উদীয়মান লেখকের পান্ডুলিপিতে গোটা গোটা অক্ষরে লিখে দিয়েছিলেন, “ উচিত বানান উচিৎ লেখা উচিত নয়, উচিত বানান উচিত লেখা উচিত, কেননা উচিত বানান উচিত।” লেখক লিখেছেন, “এই বয়ানের পর আমরা কেউ কখনও উচিত বানান ভুল করিনি।”
এই সমস্ত সরস ঘটনার সাথে যোগ্য সঙ্গত করেছে কম্পোজিটরদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইতিহাস। বিশেষত, জাতীয় ইতিহাসের এমন তথ্যাদি ব্যক্তিগতভাবে আমারে প্রচুর সমৃদ্ধ করেছে। প্রেস বিষয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রগুলি সম্পর্কে সামান্য ধারণা থাকলেও, জাতীয় ক্ষেত্র নিয়ে প্রেসের ইতিহাস এই প্রথম পড়লাম। উত্তর কর্ণাটকে গদাগ অঞ্চলের প্রেস বিষয়ক ইতিহাস কথা পড়ে বিস্মিত হয়েছি। কন্নড় ভাষার কম্পোজিটর ফকীরসা শিবান্নাসা ভান্দাগের আত্মজীবনী ‘ইয়ারু নানু? জীবনা কথানা’এই ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। তাঁর জীবনের উত্থান- পতনের কাহিনী যেকোনো গল্প- উপন্যাসকে হার মানায়। বইয়ের এই অংশটি আমাকে শুধু মুগ্ধই করেছে তা নয়, প্রকৃত অর্থে ঋদ্ধ করেছে।
বিলেতের ছাপাখানার ইতিহাসও খুবই সুপাঠ্য ও তথ্যসমৃদ্ধ। “ লন্ডন সোসাইটি অফ কম্পোজিটর-এর বিস্তৃত ইতিহাস নিয়ে লেখকের জ্যাঠামশাই রীতিমতো প্রাজ্ঞ মানুষ ছিলেন! এমনকি তিনি “ সঙস অব দি প্রেস অ্যান্ড আদার পোয়েমস” বা “ কম্পোজিটর ক্রনিকলস’'-এর অনুকরণে একটি পত্রিকা বার করতেও চেয়েছিলেন! ইসিডোর সিরিল ক্যাননের গবেষণা-গ্রন্থ থেকে লেখক প্রভূত তথ্যাদি বইটিতে রেখেছেন। তৎকালীন বিলাতী কম্পোজিটরদের “ এমবুর্জোয়াজিমেন্ট” হয়ে ওঠার বাসনা কিভাবে লেবার অ্যারিস্টোক্র্যাসির উত্থান ও পতনের কারণ হয়ে উঠেছিল, সে বিষয়ে আলোচনাটি ভালো লেগেছে। ভালো লেগেছে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের জীবনেতিহাসকে পাথেয় করে একজন মুদ্রকের “দাগি কম্পোজিটর” হয়ে ওঠার কাহিনী।
ছাপাখানার সাথে এই যে আত্মীয়তা, তা এতই কঠিন নিগড়ে বেঁধে থাকার যে তা ক্রমে ক্রমে যেন জিনের মধ্য দিয়ে বংশপরম্পরায় সঞ্চারিত হয়ে যায়। লেখক বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন তাঁর ছোটদির কথা। “প্রেস নিয়ে জেনেটিক রোগে আমাদের প্রজন্মে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ছিল ছোড়দি।” পারিবারিক বিপর্যয়ের কারণে যখন প্রেসটি বিক্রি হয়ে যায়, তখন এই ছোড়দি অনেক ছোটো। নিজেদের প্রেস নিয়ে বাবার দু:খ ‘অপনোদনের’ জন্য, তিনি নিজেদের একটি প্রেসের স্বপ্নের পিছনে সারাজীবন ছুটে গেছেন (যা কিছুতেই আর সাকার হয় নি)। তিনি রবিবারও ছুটি নেন নি। “ ‘ঝঞ্ঝা-ঝড়- মৃত্যু- দুর্বিপাক’ যাই হোক না কেন ছোড়টির প্রেস কামাই নেই!” বাবার স্বপ্নকে স্থির দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা এই মেয়েটির নাম ধীরা। তিনি নিজে সাংসারিক জীবনে প্রবেশ করেননি, কুঠিডাঙায় মহিলা-কম্পোজিটরদের কাজের পরিবেশের উন্নয়ন এবং সমকাজে সমমজুরির দাবিতে তিনি সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। প্রতিবাদী চরিত্র হিসেবে কুঠিডাঙার অতি পরিচিত মুখ ছিলেন তিনি। এইভাবে প্রেস-জীবনের সাথে ধীরা নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন একান্তভাবে। এমনকী তিনি স্ক্রিন- প্রিন্টিং এর মতো ডেক্সটপ-প্রিন্টিং-এ নিজেকে আপডেটও করে নিয়েছিলেন। এই অসম্ভব ঋজু ও প্রতিবাদী মানুষটির হৃদয়ে লিপিমালা প্রেসের পঞ্চাদার প্রতি ফল্গুধারার মতো বয়ে চলা অস্ফুট প্রেমের কথা এত সুন্দরভাবে লেখক বর্ণনা করেছেন… আমি মুগ্ধ হয়ে গেছি! ঠিক যেন সিনেমার মতো চোখের সামনে ফুটে উঠেছে তাদের নরম প্রেম। দুটি একাকী হৃদয়, যারা পারিপার্শ্বিক অবস্থার চাপে কিছুতেই আর একত্র হতে পারেন নি, তাদের ছোট্ট ছোট্ট কথপোকথন বুঝিয়ে দেয়, তারা পরস্পর, ভালোবাসায় শ্রদ্ধায় আসলে অন্তরে অন্তরে একসাথে জুড়েই ছিলেন।
বইটির প্রায় শেষ অংশে যুক্ত হয়েছে, লেখকের মেজো জ্যাঠামশাইয়ের ‘যাপনপঞ্জী’ র বেশ কিছু অভিনব লেখালিখি। বইয়ের এই অংশটুকু এই বইটির হীরেমাণিক-খচিত অলংকার বলা যেতে পারে! মেজো জ্যাঠামশাইয়ের ডাকনাম ছিল ঘনা। দাগি কম্পোজিটর ঘনা তার প্রতিদিনের সহ্য আর কষ্টের কথা ঝরঝরে এবং স্বাদু গদ্যে টানা লিখে গেছেন। তাঁর সেই লেখায় ছিল ‘বিস্তৃত পান্ডিত্য ‘এবং’ সুমধুর তীক্ষ্ণতা’। অথচ, “ তার বন্ধুবান্ধব, সংবাদ-সাপ্তাহিক প্রকাশকালীন সহযোগী সাংবাদিক ও লেখকের দল কেউ কোনদিন” এই লেখার প্রশংসা করেন নি। এই খাতা হাতে পেয়ে লেখকের ছোড়দি আর বড়দা কেঁদে ফেলেছিলেন। লেখক লিখেছেন, “মানুষের এমন অসহ্য অপচয়ে আমাদের ভাই-বোনেদের গা জ্বালা করতে লাগলো”।
এই খাতার লেখা থেকে বুধোদাকে নিয়ে লেখাগুলি এবং নিজের আচরণের মূল্যমান নির্ণয় বিষয়ক লেখাগুলিকে এক কথায় বলা যায়, দারুণ লেখা।
লেখকের বড়ো ও মেজো জ্যাঠামশাইয়ের হাত ধরে লেটার-প্রেসের সাথে লেখকদের যে পারিবারিক যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার থেকে কেউই বেরিয়ে আসতে পারেন নি। লেখকের বাবা পরবর্তীকালে হোমিওপ্যাথি ডাক্তারীতে প্রভূত পশার পেলেও,‘জেনেটিক অসুবিধা‘র কারণে তিনি নিয়মিত সন্ধ্যা সাড়ে আটটার পর যেতেন সুলেখা প্রেসে আড্ডা দিতে। লেখক নিজেও এর ব্যতিক্রম নন, তিনি নিজে ‘খেয়া’’ পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন পঞ্চাদার লিপিমালা প্রেস থেকে।
কম্পিউটার এসে যাওয়ায় লেটার-প্রেসের কাজকর্ম হু হু করে পালটে যেতে থাকে। তার সাথে ক্রমে ক্রমে হারিয়ে যেতে থাকে “ প্রেস থেকে প্রেসে সকাল-সন্ধ্যায় কত কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের সমাবেশ, পত্র-পত্রিকা-বই-ঘোষণাপত্র প্রকাশ করার চেষ্টায় সংশ্লিষ্টজনেদের অন্তহীন শ্রমের, আকুতির উষ্ণ-কম্পনের দিনলিপি। হারিয়ে গেল মত ও পথের দ্বন্দ্বে সংক্ষুব্ধ সাহিত্যকর্মীদের তর্ক-বিতর্ক, বিরোধ-সহমতের স্পন্দিত ঊর্মি-তরঙ্গে উত্তাল অস্থ সময়ের কথা, হারিয়ে গেল কত মহার্ঘ সন্ধ্যা কত আবেগী মুহূর্তের বিরল লিপিমালা।”
“ডেক্সটপ আর অফসেটের বিপুল শক্তির” কাছে কম্পোজিটররা ডেক্সটপ অপরেটরের বেশে সংখ্যালঘু হয়ে আত্মরক্ষা করছেন বর্তমানে।
এই যে বিষাদান্ত এক ইতিহাস, তা যেন অক্ষয় হয়ে রইল এই বইটিতে। এমন লেখার সাথে যোগ্য সঙ্গত করেছেন সুলিপ্ত মন্ডল, তাঁর অলংকর প্রশংসার দাবি রাখে। সৌজন্য চক্রবর্তীর প্রচ্ছদটিও যথাযথ। সেইসময়ের ছাপাখানার একটুকরো ছবি ও ছাপা- অক্ষরের সাথে তিনি এক ঝলকে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, সন্দেহ নেই। এমন একটি নিটোল বই প্রকাশের জন্য সুপ্রকাশকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও সাধুবাদ জানাই। বইটি পাঠক-প্রিয় হয়ে উঠুক, এই প্রার্থনা।
লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর: এক বিষাদান্ত পরম্পরা
লেখক : অনন্ত জানা
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
অলংকরণ : সুলিপ্ত মন্ডল
মুদ্রিত মূল্য : ২৯০ টাকা
সুপ্রকাশ
Comments
Post a Comment