দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা ।। অনন্ত জানা ।। সুপ্রকাশ
"বাংলা পোস্টারের আরেকটি বড়ো ভাণ্ডার অবশ্যই প্রার্থীর নাম ও প্রতীক চিহ্ন দিয়ে হাজারে হাজারে ছাপানো বিভিন্ন স্তরের ভোটের পোস্টার।
এই সূত্রেই এসে পড়ে বাংলার রাজনৈতিক পোস্টারের কথা।
রাজনৈতিক কর্মীরা তাঁদের দৈনন্দিন দাবিসম্বলিত বা কর্মসূচি ঘোষণার পোস্টার সাধারণভাবে কাগজের ওপর হাতে লিখে তৈরি করতেন। বামপন্থীদের সংগ্রহে অমন পোস্টার লিখিয়ে, রাস্তার শিল্পী শিবেশ-যতীশ বা আলংকারিক ক্ষেত্রে সুমনরা সর্বত্রই ছিলেন। পোস্টার লেখায় বাজেট ছিল কম, উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা ছিল বেশি। উপকরণের বাহুল্যে উদ্যোগে তখনও আলস্য-বিষ প্রবেশ করেনি।
পোস্টার লিখিয়ে কর্মীদের হাতেখড়ি হতো পুরোনো খবরের কাগজের ওপর লিখে। সাধারণভাবে রবিন ব্লু, কালো আর লাল রঙ এসব পোস্টারে ব্যবহার করা হতো, কিন্তু রঙের অভাবে একরঙে, তেমন তেমন পরিস্থিতিতে তাড়াহুড়ো করে রাতারাতি পোস্টার লিখে ফেলতে হতো। তাতে নিশ্চতভাবেই পারিপাট্যের বিলক্ষণ অভাব ঘটতো, কিন্তু বোঝাপড়াটা এই ছিল যে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মোটামুটি পাঠ করা যায় এমন পোস্টার লিখে দেয়ালস্থ করতে পারলেই হলো অর্থাৎ এসব ক্ষেত্রে, শিল্প নয়, উপযোগিতা দিকটিই ছিল একমাত্র বিবেচ্য। যদি সঠিকভাবে বিবেচনা করা যায় তবে একথা স্বীকার করতেই হবে যে, পুরোনো খবরের কাগজে লেখা দীন-হীনভাবে খারাপ হস্তাক্ষরে লেখা পোস্টারের একটা আলাদা জোর ছিল। দারিদ্র্যপীড়িত মহত্ত্বের, বিপ্লবীয়ানার একটা গোপন বার্তা বহন করতো খবরের কাগজের ওপরে লেখা পোস্টারগুলো! সবসময় দল বা সংগঠনগুলি সাদা কাগজের খরচা সত্যি সত্যিই জোগাতেও পারতেন না। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে পোস্টারই হোক বা দেয়াল লেখা— সর্বত্র কালো বা রক্ত-লাল (দিশি আলতা দিয়ে) রঙ একটা সময় একশ্রেণীর লিখিয়ের কাছে ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছিল।
সুমনের মনে আছে, বর্ধমান থেকে বাবা কলকাতায় বদলি হবার পর উত্তর কলকাতার পুরোনো গলির ভাড়া বাড়ির পাড়ায় খবরের কাগজে লেখা পোস্টারই বেশি দেখতেন। পাড়ারই নাড়ুদা আর নিমুদা মাঝে মাঝেই নাড়ুদাদের বাড়ির সামনের প্রশস্ত চাতালে বসে পুরোনো খবরের কাগজের ওপর গোছা গোছা পোস্টার লিখে চলত। তুলি জুটতো না, কাঠির ডগায় জ্যেঠিমার পুরোনো শাড়ির নরম ন্যাকড়া জড়িয়ে সুতো দিয়ে বেঁধে সরু মোটা তুলি তৈরি করে তাই দিয়ে ঝড়ের গতিতে পোস্টার লেখা চলতে থাকে।
প্রথম থেকেই হাফ প্যান্টের সুমন চাতালের সামনে দাঁড়িয়ে বহু সময় কাজ দেখতো। শেষ পর্যন্ত নাড়ুদাদের প্রশ্রয়ে দুটো-চারটে কাগজ আর কয়েক তুলি রঙের শ্রাদ্ধ করে দিন-কয়েকের মধ্যেই সুমন শিখে নিয়েছিলেন পোস্টার লেখার কায়দা। কিন্তু তখন তাঁর হাতের লেখা ছিল কাঁচা ও কদর্য। কিন্তু তাতে খুব একটা অসুবিধা হয়নি। নিজের হাতে লেখা পোস্টার পাড়ার ঘোষবাড়ির দেয়ালে দেখে সেদিনের বালকের মনে যে-আনন্দ হয়েছিল তা আজও ভুলতে পারেননি সুমন। নিমুদা বুঝিয়েছিল যে, হাতের লেখার সঙ্গে পোস্টার লেখার তেমন কোনো সম্বন্ধ নেই। পোস্টারের হরফগুলো আসলে অক্ষরের ছবি। সেকথা বোধগম্য হতে হতে নাড়ুদা, নিমুদা তাদের গুরু বিমলকাকার কাছ থেকে পোস্টারের লেখাগুলোর অর্থ, উদ্দেশ্য-বিধেয় সবই বুঝতে পেরেছিল বালকটি।"
.
.
.
আসছে...
.
দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা
অনন্ত জানা
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
সুপ্রকাশ
Comments
Post a Comment