দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা ।। অনন্ত জানা ।। সুপ্রকাশ

"ইউরোপীয় পোস্টার রচনার ক্ষেত্রে কত শিল্পী ও কর্মীর কত অবদান সে তো একটি বৃহত্তর ইতিহাসের অঙ্গ হিসেবে স্বতন্ত্র গ্রন্থের বিষয়। যেমন: চেক বংশোদ্ভূত আলফোনেস মারিয়া মুচা (১৮৬০-১৩৩৯)।

শিল্পশিক্ষার উদ্দেশ্যে মুচা ১৮৮৮ সাল নাগাদ ফ্রান্সের প্যারিসে আসেন। প্যারিসে শিল্পশিক্ষার্থী হয়েও তিনি সাপ্তাহিক পত্রিকায় উপন্যাসের ইলাস্ট্রেশন করার কাজ পান। এই শহর তাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, দিয়েছিল নিয়মিত অর্থোপার্জনের সুযোগ। অবিলম্বে প্রচ্ছদ অঙ্কনের কাজও পান মুচা। ১৮৯৪ সালে তাঁর শিল্পী ও পেশাদার জীবনে এক বড়ো পরিবর্তন আসে। এই সময়েই তিনি সেকালের বিখ্যাত মঞ্চাভিনেত্রী সারা বার্নহার্ড (? বার্নার্ড/? বার্নহার্ট)-এর হয়ে কাজ করতে শুরু করেন। বার্নহার্ড অভিনীত নাটকের পোস্টার যে প্রকাশন সংস্থা ছাপতেন তাঁদের আগ্রহে থিয়েটার ডি লা রেনেসাঁসে মঞ্চস্থ 'গিসমোন্ডা' নাটকের নতুন পোস্টার তৈরির ডাক পান। গ্রিক কাহিনী থেকে গৃহীত মঞ্চসফল মেলোড্রামাটি আগেই জনপ্রিয় হয়েছিল, ফলে নাটকটি ক্রিসমাসের বিরতির পরেও চলবে— এই মর্মে একটি পোস্টার তৈরির প্রয়োজন ছিল। এই আহ্বান পাওয়ার আগেই মুচা লে কস্টিউম আউ থিয়েটারে ক্লিয়োপেট্রায় সারা বার্নহার্ডের ভূমিকার অনেক ছবি এঁকেছিলেন। এখন তিনি সরাসরি সারার আহ্বানে নতুন পোস্টার তৈরি করলেন।

এই পোস্টার প্যারিসের দেয়ালে প্রকাশ্যে আসতেই এত জনপ্রিয় হলো যে সারা বার্নহার্ড চার হাজার কপি পোস্টারের অর্ডার দিলেন এবং ছ-বছরের জন্য তাঁর সঙ্গে চুক্তি করলেন। এই একটি পোস্টারের সুবাদে প্যারিস শহরে মুচা সহসা বিখ্যাত হয়ে গেলেন। পরবর্তীকালে মুচা সারা বার্নহার্ডের সমস্ত নাটকের জন্য স্মরণীয় সব পোস্টার তৈরি করেছিলেন।

সারাজীবনে মুচা পোস্টারের সঙ্গে ইলাস্ট্রেশন, আনুষ্ঠানিক চিত্র, ভবনের অঙ্গসজ্জাসহ বহু কাজ করেছেন। কিন্তু পোস্টার শিল্পী বলে তাঁকে আলাদা করে দেগে দেওয়ার কোনো সুযোগই নেই। সুপ্রচুর ও অসামান্য সব ছবি এঁকেছেন নান্দনিক প্রেরণা থেকেও।

মধ্যবয়সে মাতৃভূমি প্রাগে ফিরে গিয়ে স্লাভনিক জীবন, ধ্রুপদী সাহিত্য নিয়ে প্রচুর ছবি আঁকেন। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ও প্রেরণাবহ ছবি এঁকে মুচা শিল্পের ভাববাদী উৎসের ভ্রান্তিকে কিছুটা ভিন্নমাত্রিক প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন বলে মনে হয়।

১৯৩০-এর পরে চেকোস্লাভাকিয়ার দিকে লুব্ধ দৃষ্টি দেয় নাজি জার্মানি। ঐতিহাসিক এই ক্ষণে মুচার আঁকা ছবির বিষয়বস্তুতে আসে পরিবর্তন। দি এজ অব রিজন, দি এজ অব উইজডম, দি এজ অব লাভ ইত্যাকার প্রগতিপন্থার ত্রিধারা তাঁর ছবির বিষয়ে গভীর প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। ১৯৩৯ সালের মার্চে জার্মান বাহিনী প্রাগে কুচকাওয়াজ করে। স্লাভ জাতীয়তাবাদী জ্ঞানে নাজি বাহিনী মুচাকে গ্রেপ্তার করে। কয়েকদিন তাঁকে হেফাজতে রেখে প্রচুর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারপর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হলেও এই অত্যাচারে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে এবং তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। একেও এক ধরনের হত্যাই বলা যায়।

বহু ধরনের পোস্টার আঁকা ছাড়াও ইউরোপে স্থাপত্য ও চিত্রে চলমান আর্ট নুভাউ আন্দোলনের রীতিকে পোস্টারে সার্থক ও লক্ষণীয় মাত্রায় প্রয়োগের কারণে আলফোনেস মুচার অবদান আরও বেশি। পাতা ও ফুলের মতো প্রাকৃতিক আকারের প্রবহমান রেখা ব্যবহার করে জটিল ও দৃষ্টিনন্দন নকশার ভিত্তিতে চিত্র রচনা করে মুচা এই আন্দোলনকে পরিপুষ্টি দান করেন।"

.
.
.
আসছে...
.
দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা
অনন্ত জানা 

প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী

সুপ্রকাশ
        
             

Comments

Popular posts from this blog

অনন্যবর্তী।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

অনন্যবর্তী।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

অনন্যবর্তী।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।