পলাশবাড়ি।। শুভদীপ চক্রবর্ত্তী।। সুপ্রকাশ
"দীপনদের পাড়াটাতেও বসবাস মূলত বাঙালি আর বিহারিদের। হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মানুষই গা ঘেঁষাঘেঁষি করে টিকে আছে এখানে। টিকে আছে কথাটাই ঠিক, কারণ তাদের এই থাকাটা সঠিক অর্থে বেঁচে থাকা বলে দীপন মনে করে না। তার উপর দিন দিন যত ঘিঞ্জি হচ্ছে এলাকাটা, ততই ছোট আর নোংরা হয়ে যাচ্ছে মনে হয় এখানকার মানুষদের মনগুলো। সারাদিন ঝগড়া আর খিস্তি। মিউনিসিপ্যালিটির কলে জল নেওয়ার জন্য বালতি বসানো নিয়ে ঝামেলা সকালে-বিকালে। কে কাকে ধারের টাকা নিয়ে ফেরত দিচ্ছে না, সেই নিয়ে মুখ খারাপ করা লাগাতার। দিনে-দুপুরেই বাংলা মদ গিলে এসে কে যেন বউ পেটাচ্ছে ঘরে। পাশের খাল থেকে সারা গায়ে পাঁক মেখে উঠে এসে গোটা রাস্তায় সেই দুর্গন্ধ ছড়াতে ছড়াতে মাঠের দিকে নেমে যাচ্ছে একটা বুড়ো শুয়োর। কিছুটা এগোলেই একটা পুকুর। রোজকার ব্যবহারের যোগ্য আর নেই সেটা একদমই। কালো তেলচিটে সর পড়ে গেছে যেন পুকুরের জলের উপরটায়। আর কচুরিপানা ঢেকে ফেলেছে সেই পুকুরের অর্ধেকটারও বেশি। একটা ডাকপাখি সেই কচুরিপানার ফাঁক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ল্যাগব্যাগে পায়ে পিছন দুলিয়ে দুলিয়ে। সবে বড়দিন কেটেছে। তাও এই পাড়াটায় ঢুকলেই আকাশের আলো যেন কমে আসে কেমন। কেমন যেন পিচুটি পড়েছে মনে হয় শীর্ণ বয়স্ক মহিলার চোখের কোলে।
দীপনদের বাড়িটা এই পাড়ার একদম শেষে। জালানদের জুটমিল থেকে দীপনের বাবাকে যখন সময়ের আগেই সরিয়ে দেওয়া হল, তখনই কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত কোয়ার্টারও ছাড়তে হয়েছিল তাদের। চাকরি তো গিয়েছিলই, সেইসঙ্গে প্রাপ্য পেনশনের টাকাটুকু আজ অবধি ঠিকমতো পেয়ে উঠল না স্বপন বারিক। তার রাজনৈতিক পরিচয়ই এর জন্য মুখ্যত দায়ী। অবশ্য দীপনের বাবা এই ক্ষেত্রে একা নয়; আরও অনেকেরই প্রাপ্য টাকা-পয়সা মিটিয়ে দিতে চূড়ান্ত গড়িমসি করছে মিল কর্তৃপক্ষ এখনও। ফলে বর্তমান কর্মচারীদের সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদেরকেও নিয়মিত দেখা যাচ্ছে কারখানার গেট মিটিংয়ে বা ধর্মঘটে সামিল হতে।
পাড়ার একদম শেষ মাথায় হলেও গোটা পাড়ার মধ্যে এইটুকু জায়গাই একটু ভদ্রস্থ মনে হয় দীপনের। ঝগড়া-ঝাঁটি, ঝামেলার শব্দ এসে পৌঁছায় না অতটা। বাড়িটার পিছন দিকে ঝাঁকড়া কয়েকটা গাছ। ডুমুর, নিম, শিমুল আর বট। বট গাছের পাশটায় নিচু পাঁচিল ঘেরা এলাকায় এখানকার বাচ্চাদের জন্য একটা অবৈতনিক প্রাথমিক স্কুল। স্কুলটার নাম কলোনিপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়। নামে একদমই কোনও বাহার নেই। যেন ভীষণ তাড়াহুড়ো করে দিতে হবে, তাই দিয়ে দেওয়া যে কোনও একটা নাম। বাড়িতে থাকলে সকালবেলায় স্কুলের বাচ্চাদের গলায় জাতীয় সংগীত শুনে অথবা স্কুলের ঘন্টার শব্দে ঘুম ভাঙে দীপনের। রংচটা, নোংরা, তেলচিটে জামা-কাপড় পরা বাচ্চা ছেলেমেয়ের দল সব। কিছুটা সময় অন্তত বেয়াদপ ছেলেমেয়েগুলো স্কুলের স্যার-ম্যাডামদের চোখের সামনে থাকবে, আর সেই সুযোগে হাতের কাজ সামলে নেবে বাড়ির মহিলারা— মূলত সেই কারণেই বাচ্চাগুলোকে স্কুলে পাঠিয়ে দেয় তাদের বাবা-মায়েরা। তবু যখন এই বাচ্চাগুলো গালাগালি খিস্তি সবকিছু ভুলে মাস্টারমশাই বা দিদিমণিদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে নামতা বলে কিংবা রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ে জোরে জোরে, ভালো লাগে দীপনের। মনে মনে চায় এই প্রচন্ড অন্ধকারের মধ্যেও এই আলোটুকু ধরে রাখুক তারা তাদের ছোট ছোট মনের ভিতরে। যদিও এই ভালোর দৌড় খুব বেশি দূর নয়, সেটাও জানে দীপন। আর এই স্কুলটার কথা মনে পড়লেই সঙ্গে সঙ্গে আর একজনের কথা মনে পড়ে দীপনের, যার সামনে আর কোনোদিন দাঁড়াতে পারবে কিনা জানে না সে।"
.
আসছে...
.
পলাশবাড়ি
শুভদীপ চক্রবর্ত্তী
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্ত্তী
অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত
মুদ্রিত মূল্য : ২৫০ টাকা
সুপ্রকাশ প্রকাশিতব্য
Comments
Post a Comment