রান্নাঘরের গল্প।। মহুয়া বৈদ্য।। সুপ্রকাশ।।
"মেজোনানার ছয় ছেলের সঙ্গে এক মেয়েও ছিল। তার ডাকনাম ছিল বাম্পো। এই বাম্পোপিসির সঙ্গে আমার মায়ের খুব গলায়-গলায় ভাব ছিল। বাপের বাড়ি এলেই, সে 'ও আরতিদি' বলে মায়ের সঙ্গে এক ঝুড়ি গল্প নিয়ে বসে যেত। এই বাম্পোপিসির ছেলে দীপু ছিল আমার বয়সি। তার মুসলমানি মেজোনানার বাড়িতেই হলো। ঘরোয়া অনুষ্ঠান। কিন্তু কাজিসাহেবদের বাড়িতে চার ভাইয়ের পরিবার মিলে প্রায় আশি-নব্বইজনের রান্না। সেদিন দেখলাম, কাজিসাহেবদের পারিবারিক বাসন রাখার ঘর থেকে বেরোল এই অ্যাতো বড়ো-বড়ো পিতলের নকশাকাটা হাঁড়ি, তিন-চারটে। এই অ্যাত্তো বড়ো কড়াই, গামলা, খুন্তি, ঝাঁঝরি— সব পিতলের। আমার মনে হলো যেন আলিবাবার রান্নাঘর থেকে জিনিসপত্র কী করে এখানে চলে এসেছে। অমন সুন্দর নকশাদার হাঁড়িকুড়ি আমি আর কোথাও দেখিনি। উঠোনের মাঝখানে একটা বিশাল শামিয়ানা টাঙিয়ে রাঁধাবাড়ার জোগাড় চলতে লাগল। এই প্রথম আমি বিরিয়ানি নামক খাবারের নাম শুনলাম। অবাক হয়ে আরও দেখলাম, আজ সদ্য তৈরি উনুনে কড়াই বসিয়ে তাতে খুন্তি নাড়ছেন স্বয়ং মেজোনানা। সেদিন হেঁশেল থেকে তিনি মেয়েদের ছুটি দিয়ে দিলেন। ছয় ছেলেকে নিয়ে কী তরিবত করেই না তিনি রেঁধে ফেললেন অসামান্য বিরিয়ানি, স্বাদে-গন্ধে গোটা বাড়িকে একাই তিনি মাতিয়ে দিলেন। বিরিয়ানির গন্ধে গোটা বাড়ি ভুরভুর করতে লাগল।
মেজোনানার রান্নাঘরের তুলনায় ছোটোনানার রান্নাঘর ছিল অনেক গোছানো। তাঁদের কোনোদিনই খোলা আকাশের তলায় রান্না করতে দেখিনি। বরাবরই কয়লা বা গুলের তোলা উনুন কিংবা পিতলের কেরোসিন স্টোভ। এই রান্নাঘরে একবার একটা মজার ব্যাপার হয়েছিল। ছোটোনানির শরীর খারাপ থাকায় একবার সকালবেলায় বম্মা এলেন ওঁদের জলখাবারে রুটি করতে। রুটি আর আলুভাজি করে সবার জন্য গুছিয়ে রেখে তিনি নিজে একটা রুটি, আলুভাজি দিয়ে খেয়েও ফেললেন। এরপর ববিদাদা এসে সেই রুটি খেতে গিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করল, রুটি এমন বিদঘুটে খেতে কেন! ববিদাদা সেই রুটি নিয়ে অসুস্থ মায়ের কাছে গেল সন্দেহভঞ্জন করতে। তিনি তো রুটি খেয়ে সোজা উঠে বসলেন! যাহোক করে বম্মার কাছে এসে বললেন, 'কোন কৌটো থেকে ময়দা নিয়েছ?' বম্মা কৌটোটি দেখিয়ে বললেন, 'ওই কৌটোয় ময়দা ফুরিয়ে গেছিল, তাই এই কৌটো থেকে আড়াইশো ময়দা নিয়েছি।' কৌটো দেখে ছোটোনানি বললেন, 'কী সব্বোনাশ! এ তো খাবার সোডা! রান্নাঘরের কৌটোকাউটি ধোব বলে এক কেজি এনে রেখেছিলাম!' তখন সবাই, 'ওরে ফ্যাল ফ্যাল, রুটি ফ্যাল... কে কে খেয়েছিস? ক-গাল খেয়েছিস? আমাদের কী সব্বোনাশ হলো গো!'— এসব কথা বলতে বলতে কর্তব্য অনুযায়ী কাজে লেগে পড়ল। এর মধ্যে ডুকরে কেঁদে উঠলেন বম্মা। বুক চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলে চললেন, 'ওরে আমি এবার মরে যাব! ওরে আমার কী হবে রে... আমায় তোরা কেউ হসপিটালে নিয়ে চল রে!' সবাই তখন তাঁকে ব্যস্ত করে তুলেছে, 'তোমার জিভের কী দশা! তোমার চোখের কী দশা! তুমি সোডা মাখলে জল দিয়ে তবু বুঝতে কেন পারলে না!' আর তিনি ততই ডুকরে-ডুকরে কেঁদে ওঠেন। শেষ পর্যন্ত ছোটোনানা সবাইকে সরিয়ে বম্মাকে নিয়ে ছুটলেন হাসপাতালে। সেখানে তিনি টানা দুই দিন স্যালাইন টেনে ফিট হয়ে বাড়ি ফিরলেন।"
.
.
.
রান্নাঘরের গল্প
মহুয়া বৈদ্য
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত
মুদ্রিত মূল্য : ২০০ টাকা
সুপ্রকাশ প্রকাশিতব্য
কলকাতা বইমেলায় স্টল : ৫০৩
Comments
Post a Comment