দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা ।। অনন্ত জানা ।। সুপ্রকাশ

"প্রখ্যাত শিল্পীদের অনেকেই সিনেমা পোস্টার আঁকছেন দেখলে প্রাথমিকভাবে আশ্চর্য হতে হয়। যেমন মুর্তজা বশীর (১৯৩২-২০২০)। কিংবদন্তি ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহের পুত্র বশীর ছিলেন একাধারে দেশে ও বিদেশে প্রশিক্ষিত শিল্পী, কবি, ঔপন্যাসিক, ছোটোগল্পকার, চিত্রনাট্যকার, প্রবন্ধকার, সহকারী চিত্র পরিচালক, গবেষক, শিক্ষক, মুদ্রাসংগ্রাহক, মুদ্রণবিদ, কার্টুনিস্ট। আপাত-বিমূর্ত ও প্রমূর্ত (যাকে বলা হয়েছে 'বিমূর্ত বাস্তবতা') ধারায় মানুষের 'বিক্ষত-বেদনার প্রস্তরীভূত চেহারা' বাইরের মসৃণতার অন্তর্দেশে নিরন্তর বিস্ফোরণ ও ক্ষতের মুদ্রণ! দেয়ালের ভাঙনের মধ্যে প্রদাহকীর্ণ 'অস্তিত্ববাদী একাকীত্ব' নিয়ে চিত্রচর্চা করলেও বশীরকে জন-অনুপ্রেরিত প্রকাশ্য ময়দানের শিল্পী বলতে হয়। প্রথমে ভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়ে বশীর পোস্টার, ফেস্টুন, কার্টুন এঁকেছেন (বক্ষ্যমাণ রচনায় প্রকাশিত দ্বিতীয় পোস্টারটি বশীরের 'একুশের আঁকা, একুশের লেখা' গ্রন্থের প্রচ্ছদরূপে ব্যবহৃত হয়েছে)— তারপরেও পোস্টারে, ব্যানারে, ফেস্টুনে, উডকাটে, লিনোকাটে, এচিংয়ে, দেয়াললিখনে বশীর জাগ্রত থেকেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বশীর ছাপচিত্র ব্যবহারের একটা ধারা গড়ে তোলেন। 'ছাপচিত্রই সবচেয়ে গণতান্ত্রিক মাধ্যম'।

বিভাগোত্তরকালে পশ্চিমবঙ্গীয় পোস্টার শিল্পে খ্যাত-অখ্যাত শিল্পীদের গণ-অংশগ্রহণ লক্ষণীয়মাত্রায় ধরা পড়ে। শহর-গ্রামের সংখ্যাতীত শিবেশ-যতীশ-সুমন পোস্টার এঁকেছেন, দেয়াল লিখেছেন। পুরোদস্তুর শিল্পীদের কথাই যদি ধরা যায়— তবে কেই-বা আঁকেননি পোস্টার? রামকিঙ্কর থেকে চিত্তপ্রসাদ, দেবব্রত মুখোপাধ্যায় থেকে মীরা মুখোপাধ্যায়, বিজন চৌধুরী থেকে খালেদ চৌধুরী, সোমনাথ হোড় থেকে হিরণ মিত্র— সকলেই পোস্টারের ডিজাইন করেছেন বা তাঁদের চিত্রকর্ম পোস্টারে ব্যবহৃত হয়েছে। রাজনৈতিক পোস্টার, নাটকের পোস্টার, আনুষ্ঠানিক পোস্টার তো বটেই, সত্যজিৎ রায় ছাড়াও প্রশিক্ষিত শিল্পীরা সিনেমার পোস্টারও কম করেননি। এদের মধ্যে আছেন ও সি গাঙ্গুলি, রণেন আয়ন দত্ত, অভিজিৎ গুপ্ত, খালেদ চৌধুরী, দেবব্রত মুখোপাধ্যায়, পূর্ণেন্দু পত্রী প্রমুখ। (শুভেন্দু দাশগুপ্ত সম্পাদিত প্রাগুক্ত গ্রন্থ) পোস্টারের কথা বস্তুত অন্তহীন। গণনাতীত পোস্টার ও পোস্টার শিল্পীর আবেগী কর্মকুশলতায় পোস্টারের জগৎ স্পন্দিত। আমাদের স্বখ্যাত শিল্পীদের বহুজন এই রাস্তার শিল্পের চর্চা করেছেন। পোস্টারের বিপুল সমৃদ্ধি ও বৈচিত্র্যের উল্লেখই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট। সেই বিপুলতার একটি অনুমিত রেখাচিত্র অঙ্কন বা তাঁদের নামের একটি নির্ভরযোগ্য তালিকা প্রণয়ন করাও অসম্ভব বললে কম বলা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় (১৮৩৯) ব্রিটিশ পত্রিকা 'পাঞ্চ'-এর শিল্প সম্পাদক ছিলেন ফুগাসে [নিজ নাম: সিরিল কেনেথ বার্ড (১৮৮৭-১৯৬৫)]। বিনা পারিশ্রমিকে ব্রিটিশ সরকারের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রচারণামূলক গ্রাফিতিক পোস্টার তৈরি করেছিলেন। সেই গ্রাফিতির মধ্যে লোকপ্রিয় হয়েছিল— 'বিঅয়্যার। দি ওয়ালস্ হ্যাভ ইয়ারস্', 'শপ টক, মে বি স্যাবোটক', 'ওয়ার্নিং! ওয়ালস্ হ্যাভ ইয়ারস্।/বি কেয়ারফুল দ্যাট হোয়াট ইউ সে', 'ডু নট ফরগেট দ্যাট ওয়ালস্ হ্যাভ ইয়ারস্/কেয়ারলেস টক কস্টস্ লাইভস্'— ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সময় ফুগাসের তত্ত্বাবধানে এই জাতীয় বহু প্রচারণা রচিত হয়। প্রপাগান্ডিস্ট হলেও সেকালে এগুলির যথেষ্ট প্রভাব ছিল। পরে পোস্টারের মধ্যস্থতায় দেয়ালশিল্পের এই ধারার বিস্ফোরণ প্রমাণ করে দেয় যে, দেয়ালের কান আছে, দেয়াল দেখতেও পায়, দেয়াল বলতেও পারে!"
.
.
.
আসছে...
.
দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা
অনন্ত জানা 

প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী

সুপ্রকাশ
        


             

Comments

Popular posts from this blog

এক যে ছিল গ্রাম।। অর্ধেন্দুশেখর গোস্বামী।। সুপ্রকাশ।।

চেতনার পথ জুড়ে শুয়ে আছে।। অনির্বাণ সিসিফাস ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

প্রতিযাত্রা।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।।