দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা।। অনন্ত জানা ।। সুপ্রকাশ

কিন্তু এই গঞ্জে বহু-সংখ্যক পোস্টার বলতে সিনেমার পোস্টারকেই বোঝায়। এখানে একটিই মাত্র সিনেমা হল। হল ঠিক নয়, আগে ছিল আলুর গুদাম। সদরের আলু-কিং কমল গুছাইত সদর আর মহকুমার মাঝামাঝি এই গঞ্জের গুদামে বর্ধমান আর হুগলি থেকে আনা আলু মজুত করে দশটা হাটে, সাবেক বিহার বা এখনকার ঝাড়খণ্ডে সাপ্লাই করতেন। এখন এই রাঢ়ীয় অঞ্চল এবং সংলগ্ন মল্লভূমে প্রচুর আলু উৎপাদিত হওয়ায় মাঝারি ব্যাপারিরাও স্থানীয় আলু ছোটাহাতি বা ম্যাটাডোরে করে দিনের-দিন নিয়ে এসে খুচরা কারবারিদের দিয়ে দেয়। কমল গুছাইত পয়সাওয়ালা উদ্যোগী মানুষ। বিপাক বুঝে গুদামটাকে ঝেড়ে-ঝুরে তিনি সিনেমা হলে পরিণত করেছেন। হাটের দিনে ম্যাটিনি, পুজোপার্বণের দিনে ইভনিং, আর প্রতিদিনই নেশাড়ুদের নিয়ে নাইট শো-এর 'শীলা কী জওয়ানি'-মার্কা ছবি মোটামুটি ভালোই চলতো। মাঝে বাজারের পাশে ঝাঁপের ঘরে একটা ভিডিও হল গজিয়েছিল— তখনই সেটা গেছে। ঘরে ঘরে টিভির প্রাদুর্ভাব সত্ত্বেও তখনও গুছাইতবাবুর সিনেমা হল (হাটুরেদের ভাষায় 'সিনেমিনা') চলেছে, এখনও চলছে। পুরোনো প্রজেক্টারটা আছে কীনা কে জানে! এখনও ভ্যানে মাইক লাগিয়ে গঞ্জের একমাত্র মাইকের দোকান ছড়িদার সাউন্ডস্-এর মালিক কাম কর্মচারি কাম অ্যানাউন্সার ফটকে ছড়িদার ইয়ারলি 'কনটাক্'-অনুযায়ী প্রত্যেক দিন সকালে গঞ্জ এবং তার দিগড়ের পাঁচটা গ্রামে সামাজিক বাংলা ছবি বা 'নাচে গানে দুর্ধর্ষ ফাইটিং-এ ভরপুর' হিন্দি ছবির ঘোষণা দিয়ে যায়। প্রত্যেক বেস্পতিবার বিকাল নাগাদ বাজারের দোকানপাটের ঝাঁপের গায়ে, রেলগুদামের ইটের বা গ্রামগুলোর দোকানপাট ও গৃহস্থবাড়ির মাটির দেয়ালে ফটকে, হাটতলায় ফটকে ছড়িদারের চেলা গলু সেনাপতি ছাপানো পোস্টার সাঁটিয়ে দিয়ে যায়। পোস্টারগুলো পুরোনো পদ্ধতির লিথোগ্রাফে বা কাঠের ব্লকে ছাপানো বলে মনে হয়। কদাচিৎ সস্তার অফসেটে। কখনও হঠাৎ করে বহুবর্ণ হাতে আঁকা পোস্টার দুটো-একটা এলে সেগুলো হাটতলার পুটে বর্মনের মশলা পেষাই কলের বিস্তৃত দেয়ালের গায়ে মেরে দেয় গলু সেনাপতি। ঐ দুটো-একটা পোস্টারেই একশো পোস্টারের কাজ হয়ে যায়। পোস্টারগুলো ফিল্মের রোলের সঙ্গেই কলকাতা থেকে আসে, সম্ভবত ডিস্ট্রিবিউটারের কাছ থেকে সিনেমার রোলের সঙ্গে সঙ্গে এগুলো আনানো হয়। এছাড়া ভোটের মরশুমে দলের প্রার্থীদের নাম ও প্রতীক দিয়ে ছাপা পোস্টার আসে কলকাতা থেকে। বাবু লালার মতো বড়ো দোকানপাটে নানা কোম্পানির লোক বা সদরের ডিলার-ডিস্ট্রিবিউটাররা ছাপানো বিজ্ঞাপন দিয়ে যায়।

এই ধরনের পোস্টার ছাড়া গঞ্জের স্থানীয় প্রয়োজনে প্রায় সব পোস্টারই শিবেশদের লিখতে হয়— চণ্ডীমাতা বয়েজ ইস্কুলের বার্ষিক অনুষ্ঠান থেকে জিনিয়াস টিউটোরিয়াল সেন্টারে ভর্তির আবেদন। কিন্তু রাজনৈতিক শ্লোগান ও বার্তা-সমন্বিত জ্ঞাপনীই হলো শিবেশ-যতীশদের কাছে আসল পোস্টার!
.
.
.
আসছে...
.
দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা
অনন্ত জানা 

প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী

সুপ্রকাশ

        
             

Comments

Popular posts from this blog

অনন্যবর্তী।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

অনন্যবর্তী।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

অনন্যবর্তী।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।