রান্নাঘরের গল্প।। মহুয়া বৈদ্য।। সুপ্রকাশ।।
"জ্ঞান হওয়া ইস্তক মায়ের যে রান্নাঘর দেখেছি, সেটি এখনকার যে রান্নাঘরের ধারণা, তার সঙ্গে একেবারেই যায় না। বাসাবাড়িতে আমাদের শোবার ঘরে ছিল একটা তক্তপোশ, সেটা ইট দিয়ে অ্যাত্তোখানি উঁচু করা। তার নীচে গোটা-চারেক ট্রাঙ্ক, তাতে জামাকাপড়, বইপত্তর। আর শোবার ঘরের সামনে একটা খোলার টালি দেওয়া বড়ো জায়গা, যার আদ্দেকটায় সিমেন্টের মেঝে, আদ্দেকটা মাটি। সেখানে জানালা ছিল দুটো- কাঠের ফ্রেম, কাঠের দাঁড়া (এবং কপাট), যা আজকাল প্রায় দেখাই যায় না। সস্তার জানালা, রাসের মেলা থেকে কেনা, ঘুণ ধরা থেকে বাঁচাতে তাতে দেওয়া ছিল কালো আলকাতরার পোঁচ। এইখানেই আমার মায়ের রান্নাঘর, এইখানেই আমাদের আসন পেতে খাওয়া- আজকের ভাষায় যারে বলে 'কিচেন-কাম-ডাইনিং'। এই রান্নাঘরের প্রাণ ছিল একটা এই অ্যাত্তো বড়ো কাঠের লম্বা আলমারি, যার পিছনটা কাচ দেওয়া। আজকাল মিষ্টির দোকানে যেমন শোকেস থাকে, জিনিসটা অনেকটা সেই রকম ছিল। মানে কাচের দিকটাই সামনে থাকার কথা, মা সেটাকে নিজের প্রয়োজনমতো ব্যবহার করছিলেন। মায়ের কাছে শুনেছিলাম, বিয়ের পর আমাদের দেশের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে বারান্দার এক কোণে অতি অবহেলায় মা এটাকে পড়ে থাকতে দেখেছিলেন। দিদিশাশুড়িকে কেন সেটি পড়ে আছে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেছিলেন, রাগ হলে সবাই ওতে নাকি লাথি মেরে রাগ মেটায়। আমার মা সেই সময়ের তাঁর টানাটানির সংসারে সবার লাথি-খাওয়া এই শোকেসটিকে রান্নাঘরের আলমারি করবেন বলে চেয়ে নিয়েছিলেন। ভাঙাচোরা, লাথ-খাওয়া সেই শোকেস মায়ের সাধের রান্নাঘরের আলমারি হয়ে ছিল সুদীর্ঘ সময়। মা সেটিকে সারিয়ে নিয়েছিলেন। এই যে আলমারি, এতে মায়ের যাবতীয় রান্নার মশলাপাতি, আমাদের ছোটোবেলার দুধ-বিস্কুট, ছোলা-বাদামভাজা ইত্যাদি সবকিছুই থাকত। এর সঙ্গে রান্নাঘরের সরঞ্জাম বলতে ছিল মায়ের তোলা-উনুন, কয়লা অথবা গুল দিয়ে যাতে আঁচ পড়ত, ছিল কেরোসিনের জনতা স্টোভ আর একটা শিলনোড়া। রান্না-খাওয়ার সমস্ত বাসনপত্র থাকত এই আলমারির উপরেই। সেখানে একটা মস্ত অয়েল ক্লথ বিছানো থাকত আলমারির কাঠটিকে জলের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। এই আলমারিটি এত বড়ো ছিল মাঝে-মাঝে জিনিসপত্র কোন কোনায় হারিয়ে যেত, তারপর বেশ ক-দিন পর হয়তো সেই কোনা থেকে আবিষ্কৃত হলো একদলা কালো কুচকুচে তেঁতুল, হরলিক্সের কাচের বয়ামে; এই কোনা থেকে আড়াইশো মতো মিছরির দানা, কিংবা ভুলে যাওয়া পাঁপড়ের প্যাকেট... এই রকম আর-কি!"
.
.
.
রান্নাঘরের গল্প
মহুয়া বৈদ্য
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত
মুদ্রিত মূল্য : ২০০ টাকা
সুপ্রকাশ প্রকাশিতব্য
কলকাতা বইমেলায় স্টল : ৫০৩
Comments
Post a Comment