দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা | অনন্ত জানা | সুপ্রকাশ |
"বস্তুত শুধু সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকের ইংলন্ড, ফ্রান্স বা ইউরোপ নয়, কলোনী ভারতেও বাজারের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞাপনীর বাড়াবাড়ি রকমের ব্যবহার হতে থাকে। সাইনবোর্ডের ঘনঘটার ক্ষেত্রে অষ্টাদশ শতকের লন্ডন অথবা ব্রিটিশ ভারতের নগরকেন্দ্রগুলির বা বিশ শতকের প্রথমার্ধের রাজপথগুলির বিশেষ কোনো ফারাক খুঁজে পাওয়া মুশকিল।
আমরা আগেই দেখেছি যে, শুধু ভারতে নয়, সমগ্র প্রাচ্যেই সাধারণভাবে ব্যবসাকেন্দ্রগুলিতে বিপণি পরিচয়ের তেমন প্রয়োজন হতো না, কেননা জনভুক্ত ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই অক্ষর পরিচয়ের বিশেষ ধার ধারত না। তারও ওপর পণ্য-অনুযায়ী বিক্রয়-এলাকা এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের পছন্দ এতই সুনির্দিষ্ট এবং তাদের পারস্পরিক সম্বন্ধ এতই অব্যবহিত ছিল যে সাইনবোর্ড বা সাইনেজ-ব্যবহার করার প্রশ্নই ছিল না। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগের এবং তার পরেরও কলকাতার ছবি ও স্কেচগুলিতে ক্রেতা-বিক্রেতায় ভিড়াক্রান্ত বাজারে বিপণির সংখ্যা অগণন হলেও সেখানে বিপণির স্থায়ী কাঠামোর সংখ্যা কম এবং তা জ্ঞাপনীবিরল। সেকালের বিকিকিনির পদ্ধতির ধরনটি বোঝা যায় সেকালের গ্রন্থে। হুতোম তাঁর নকশায় লেখেন: 'যে সকল মহাত্মারা ছেলে-বেলা কলকেতার চীনে বাজারে "কম স্যার! গুড সপ স্যার! টেক্ টেক্ টেক্ নটেক্ নটেক্ একবার তো সী!” বলে সমস্ত দিন চীৎকার করে থাকেন, যে মহাত্মারা...।' (হুতোম প্যাঁচার নকশা: ১৮৬৪) হুতোম বিচিত্র অর্থে ও বিচিত্রতর ব্যঞ্জনায় বাজার শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
কিন্তু সম্ভবত এই সময়কালেই ইংরেজদের বাণিজ্য-প্রতিষ্ঠানগুলি বা মার্চেন্ট হৌসের শিরোদেশে ইংরেজি ভাষায় পরিচয়-জ্ঞাপনী লাগানো শুরু হয়ে গেছে। বস্তুত বাঙালির ব্যবসার ধারাবাহিকতার শুরু হয় আরও কিছু পরে— একেবারে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে বা বিংশ শতাব্দীর সূচনায়। 'হরিদাসের গুপ্তকথা' আখ্যায়িকায় ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায় লেখেন: 'বাঙালীরা কারবার জানেনা, কেবল চাকরী জানে, এই একটা দুর্নাম ছিল; এখন সেই দুর্নামমোচনের অভিলাষে বাঙালী সন্তানেরা এক একটা কারবারের নামে এক একটা দোকান খুলে বোসছেন, দোকানে দোকানে এক এক সাইনবোর্ড ঝুলছে। সব সাইনবোর্ডে প্রায় দোকানদারের নামের সঙ্গে "এণ্ড কোং” জোড়া। (উদ্ধৃত এবং বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন আত্মজিৎ মুখোপাধ্যায়: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২: ইনস্ক্রিপ্ট.মি) বাঙালীরা কোম্পানীবদ্ধ হয়ে কাজ কোত্তে জানেন, ঐ এণ্ড কোং শব্দ তারি পরিচয় দেয়, ফলে কিন্তু কি সেটি নির্ণয় করা দুর্ঘট। অক্ষরেই কেবল এণ্ড কোং, এণ্ড কোং, এণ্ড কোং!'
কী কী কারবারে বাঙালির মধ্যে বাণিজ্যে বসতে... জেগে উঠেছিল তা-ও জানিয়েছেন ভুবনচন্দ্র: 'কতদিকে কত প্রকারে ইংরেজী সভ্যতার নিদর্শন দৃষ্ট হয়, সংখ্যা করা যায় না। দেশের পূর্ব্ব গৌরবের উদ্ধারবাসনায় কেহ কেহ অগ্রসর। মধ্যে কয়েক বৎসর আয়ুর্ব্বেদমতে চিকিৎসা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে এসেছিল, এখন আবার কতকগুলি লোক— বৈদ্যই হউন আর অন্য জাতিই হউন, আয়ুর্ব্বেদকে জাগিয়ে তুলবার চেষ্টা করছেন, রাস্তায় রাস্তায় বড় বড় সাইনবোর্ডে "আয়ুর্ব্বেদীয় ঔষধালয়” অগণিত।' (ভুবনচন্দ্র: হরিদাসের গুপ্তকথা)
এসব ইতিহাস ঘাঁটতে ঘাঁটতে সুমন ১৯৪০-এর দশকের কলকাতার একটি ছবি পেলেন। হ্যারিসন স্ট্রীট (বড়োবাজার) ও স্ট্র্যান্ড রোডের সংযোগস্থলের এই ছবিটিতে ভুবনচন্দ্রের কথার সারবত্তা বুঝতে পারলেন সুমন। ছবিতে ঐ দুই রাস্তার সংযোগস্থলের স্থাপনার অঙ্গে, তার আশপাশের অট্টালিকায়, এবং রাস্তায় ঢাকা আয়ুর্ব্বেদীয় ফার্মাসী, বেঙ্গল শটী ফুড, অজস্র আয়ুর্বেদিক সংস্থার, চিকিৎসাগ্রন্থের, ভীমরস সালসা, দুলালের তালমিছরি, গোবিন্দ সুধা, কুমারেশ, হোমিওপ্যাথিক ঔষধ পুস্তক, হেমকান্তি সুরভিত কেশতৈল, সান বিস্কুট ও বার্লি, হ্যানিম্যান পাবলিশিং কোং ইত্যাকার ওষুধ-বই-প্রসাধনীর সাইনবোর্ড!
সাইনবোর্ড শিল্পের আর-একটি প্রেক্ষিতের দিকেও সুমনের নজর পড়ে। তা হলো স্ট্রীটনেম সাইন বা পথপরিচায়ক পথলিপি। মুখ্যত নগরজীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত এই লিপিচিত্র কলকাতায় থাকতে চোখের সামনে আকছার দেখেছেন। অনেকসময় চমকিতও হয়েছেন। কিন্তু তার স্বাতন্ত্র্য অনুধাবন করতে পারেননি। অনতি-বাল্যে স্মরণকালে যখন গঞ্জ থেকে তাঁর বাবা বদলি হলেন, তখন বর্ধমানের মতো মফস্বলী শহর ছুঁয়ে তাদের পরিবার একেবারে মহানগরে! ততদিনে সুমন কৈশোর ছুঁয়েছেন।"
.
.
.
আসছে...
কলকাতা বইমেলা অথবা বইমেলার আগেই...
.
দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা
অনন্ত জানা
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
সুপ্রকাশ
Comments
Post a Comment