রান্নাঘরের গল্প।। মহুয়া বৈদ্য।। সুপ্রকাশ।।
"সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে যখন এই যৌথ রান্নাঘরের হাঁড়ি আলাদা হলো, তখনো নববর্ষ-রান্নাপুজো-বিজয়া এমন সব পর্বদিনে সবাই একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেছি। ছোটোমামা অবশ্য এই সময়ে অন্যত্র বাড়ি করে চলে যান। ফুলমামা তো বরাবর বাইরে থাকতেন। তবু বচ্ছরকার দিনে, বিশেষত পয়লা বৈশাখ, আমরা সবাই একসঙ্গে হয়েছি। খুব মনে পড়ে, নববর্ষের দিন ভোরবেলা পুকুরে জাল পড়ত। এত-এত মাছ উঠত। মামিরা সবাই মিলে একসঙ্গে হইহই করে সেই মাছ কুটতে বসে যেতেন। মামারা সব দিলখোলা হয়ে বাজার করছেন সেদিন। কেউ আনলেন খাসি তো কেউ চিংড়ি। কেউ মনে করে কুমড়ো ফুল কিনলেন ছোটোবোনের জন্য তো কেউ আবার বাগান ঘুরে খুঁজে-খুঁজে কেটে আনলেন পুরুষ্টু এঁচোড়— মেজোবোনটা যে এঁচোড়-চিংড়ি খেতে বড়ো ভালোবাসে! বাড়ির একটু বড়ো দাদারা নিমগাছ থেকে আঁকশি দিয়ে নিমপাতা পেড়ে ফেলছে। রান্নাঘরের পাশের জমিতে লংকা গাছের পাশে কয়েকটি হলুদ গাছ টেনে তুলল টুসি। নিমপাতা আর হলুদ পুকুরজলে কষকষে করে ধুয়ে ঝুড়িতে তুলে রাখলেন সেজোমামি। ওগুলি বেটে সরষের তেল-সহ গায়ে মাখতে হবে আজ। আমি ঝুনুদিদির সঙ্গে ঘুরে ঘুরে টুকটুক করে সংগ্রহ করলাম পাঁচ রকমের ফোটা ফুল আর পাঁচটি গাছের পাতা। এর সঙ্গে সোনা-রুপো মিলিয়ে শাঁখের ভিতর জল-সহ রেখে সেই জল চানের শেষে সবার মাথায় দেওয়া হবে। বাগান ঘুরে কুসি আম কুড়িয়ে নিয়ে এসেছে বাচ্চু, আজ শেষপাতে আমের ঝোল ওর চাই-ই চাই! গোটা বাড়ি জুড়ে নিটোল ভালোবাসার হাওয়া খেলে বেড়াত সেদিন। মামি আর মাসিরা সবাই মিলে হইহই করে দশহাতে সমস্ত রান্না করে ফেলতেন। আমরা নিম-হলুদ মেখে যথেচ্ছ ভূত হয়ে পুকুরে ঝুঁকে থাকা নারকেল গাছের গোড়া থেকে একটু উঠে ঝপাং করে ঝাঁপ দিতাম। তারপর জল তোলপাড় করে সাঁতার। পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে বড়োমাসি ছদ্ম-বকুনি দিতেন, 'অনেক হয়েছে, এবার উঠে আয় শিগগির!' আমরা আরও একটু লাফঝাঁপ করে উঠে আসতাম রুনুদিদি-ঝুনুদিদির কাছে। ওরা তখন শাঁখের ভিতর থেকে ফুল পাতা আর সোনা-রুপোর জল মাথায় ঢেলে দিত। পয়লা বৈশাখের নতুন জামা পরে আমরা দল বেঁধে যেতাম বড়োদের প্রণাম করতে। মামিরা, মা-মাসিরা তখন খেতে দেবেন বলে গোছ করছেন, তাঁদের হাত এঁটো। তখন দুই হাতের কবজির পরের অংশটুকু দিয়ে অদ্ভুত কায়দায় গাল দু-টি টিপে আদর করে দিতেন। তারপর আমরা ছোটোরা মামাদের সঙ্গে সারি দিয়ে খেতে বসে যেতাম— ভাত, শুক্তো, মুগডাল, পাঁচ রকম ভাজা, এঁচোড়-চিংড়ি, কালবোস কিংবা রুইমাছের কালিয়া, খাসির মাংস, আমের ঝোল, পায়েস— আমরা ছোটোরা সব খেয়ে উঠতে পারতাম না। কিন্তু তাতে কিছু যেত-আসত না, পরিতৃপ্তিটুকু তখন তো খাবারদাবার থেকে আসত না!
বিজয়ার সময় নাড়ু বানানোর জন্য একটা ছোট্ট শিলপাটা দিদার ঘরে আলাদা করা রাখা থাকত। রান্নাঘর থেকে নারকেল, চিনি বা গুড় দিয়ে ছাঁই মেরে এনে দিদা সেগুলিকে ধীরে-ধীরে শিলপাটায় বেটে নাড়ু, নারকেল সন্দেশ এসব বানাতেন। দিদার নাড়ু হতো একটু লালচে, কড়া পাক। আর, বড়োমামি ধপধপে সাদা নারকেল নাড়ু বানাতেন। তাতে পড়ত দুধের সর আর কপূর। ওই মাটির রান্নাঘরে বানানো এই দুই স্বাদের নাড়ুর স্বাদে-গন্ধে আমার ছোটোবেলাটি ভরে আছে।"
.
.
.
রান্নাঘরের গল্প
মহুয়া বৈদ্য
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত
মুদ্রিত মূল্য : ২০০ টাকা
সুপ্রকাশ প্রকাশিতব্য
কলকাতা বইমেলায় স্টল : ৫০৩
Comments
Post a Comment