পলাশবাড়ি।। শুভদীপ চক্রবর্ত্তী।। সুপ্রকাশ

"পাহাড়ে একটা এনজিও চালাতো রুকুর মা। উত্তরবাংলার চা বাগানগুলো থেকে মেয়ে, বিশেষ করে শিশুকন্যা পাচার হয়ে যাওয়া দগদগে একটা ক্ষতের মতো জ্বলছে যখন, রুকুর মা, শ্রীমতি দয়াময়ী গোস্বামী ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ঘেন্না করার মতো এই কাজটাকে আটকানোর চেষ্টায়। দয়াময়ীর স্বামী, অপ্রতীম, জালান জুটমিলের সর্বময় কর্তা তখন। চিফ ম্যানেজার। কিন্তু ব্যস্ত স্বামীর ছত্রছায়ায় ঢাকা পড়তে চাননি দয়াময়ী। ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মেয়ে পাচার আটকানোর মতো পবিত্র, অথচ চূড়ান্ত বিপদমাখা একটা কাজে। অপ্রতীমও বাঁধা দেননি কখনও। বরং ছোট্ট রুকুকে দাদু-দিদার জিম্মায় রেখে নিজেও সামিল হয়ে যেতেন কখনও কখনও দয়াময়ীর সঙ্গে। সেরকমই একটা দিনে কার্শিয়াংয়ের একটা চা বাগানে যাওয়ার দরকার পড়ল খুবই। কিন্তু সেদিনই সকাল থেকে বৃষ্টি অবিরাম। ওখানকার বহুদিনের চেনা ড্রাইভার বিনোদজীর বারংবার বারণ শুনে শুরুতে অপ্রতীম একটু ইতস্তত করলেও, বেরিয়েই পড়েছিলেন শেষমেষ দয়াময়ীর সঙ্গে। সেই যে বেরোলেন, তারপর গাড়ি নিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই যেতে যেতে আচমকাই রাস্তার পাশের উঠে যাওয়া পাহাড়টা থেকে একটা অতিকায় সরীসৃপ নেমে আসার মতো শব্দ হল, আর...

আর তার সঙ্গেই তৈরি হয়েছিল যে বিশাল শূন্যতাটা, দরদীতে খবরটা পৌঁছানোর পর হঠাৎ করে সেটা বুঝে উঠতে পারেনি ছোট্ট রুকু। শুধু কেমন যেন মনে হয়েছিল, বাবার বাগানের সমস্ত গাছগুলোর মনখারাপ ভীষণ। আর অনেকটা বড় হওয়ার পর দাদু-দিদাও যখন চলে গেলেন একে একে, রুকু একা একাই পাহাড়ে চলে গেল একদিন। পাহাড়ি রাস্তার ধারে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নীচের দিকে তাকাতেই, কোথা থেকে যেন একটা পাহাড়ি ঝর্না নেমে এল ওর চোখে। আর অনেকক্ষণ পর উঠে দাঁড়িয়ে রুকু দেখেছিল, গাড়ির ড্রাইভার ফুরবা লেপচা একটা জলের বোতল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওর পিছনে। ওকে ডাকেনি একবারও। কথাও বলেনি একটাও। চুপচাপ অপেক্ষা করেছে শুধু রুকুর ধাতস্থ হওয়ার। তারপর রুকুকে নিয়ে কত কত পাহাড়ি বাঁক পেরিয়ে হাজির হয়েছে শেষমেশ দয়াময়ীর সেই এনজিও অফিসের সামনে।

বছর দশেক আগের সেই দিনে ওখানেই মিনাংমা তামাংকে পেয়েছিল রুকু। জন্মের সময়ই মাকে হারিয়েছে মেয়েটা। আর এনজিও অফিসের সামনে পৌঁছেই দেখল ঘন্টা কয়েক আগে দাঁতালের পায়ের তলায় পিষে যাওয়া মিনাংমার বাবার শরীরটা এবড়ো-খেবড়ো অবস্থায় পড়ে আছে কেমন। ফলে আশেপাশের সবাই যখন বিলাপ করছে কী হবে তিনকূলে কেউ না থাকা মেয়েটার এবার, তখনই সিদ্ধান্তটা নিতে রুকুর সময় লেগেছিল মিনিট খানেক। পাহাড়ি মিনাংমা তামাংকে দয়াময়ী মাঈয়ের লেড়কির সঙ্গে ছেড়ে দিতে কোনও আপত্তিই ছিল না গ্রামের কারোরই। সমস্যা হয়নি স্থানীয় থানা থেকে প্রয়োজনীয় সম্মতি যোগাড় করে আনতেও। কতই বা বয়স তখন মিনুর? বারো বা তেরো হবে হয়তো। সেই থেকেই মিনু থেকে গেল রুকুর সঙ্গে, পাহাড় থেকে অনেকদূরে মফস্বলি পলাশবাড়িতে। শুধু মিনাংমাটা কেটেছেঁটে মিনু করে নিয়েছিল রুকু। রুকু আর মিনু, যেন মনে হবে বেশ দুই বোন!"
.
আসছে...
.
পলাশবাড়ি
শুভদীপ চক্রবর্ত্তী

প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্ত্তী 
অলংকরণ :  অদ্বয় দত্ত

মুদ্রিত মূল্য : ২৫০ টাকা

সুপ্রকাশ প্রকাশিতব্য
   


Comments

Popular posts from this blog

এক যে ছিল গ্রাম।। অর্ধেন্দুশেখর গোস্বামী।। সুপ্রকাশ।।

চেতনার পথ জুড়ে শুয়ে আছে।। অনির্বাণ সিসিফাস ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

প্রতিযাত্রা।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।।