কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্টের 'রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল'।। অনুবাদ ও টীকা : অর্ণব রায়।। সুপ্রকাশ

তেলের ঘানি বা তেল পেষানোর মিল যে ঠিক কী জিনিস, সেটা আমার কলমের থেকে আমার পেনসিল তোমাদের ভালো বোঝাতে পারবে। সাধারণত একটা গোটা কুঁড়েঘর জুড়ে একটা ঘানি হয়। সেখানে পুরো জায়গাটা লাগে ‘অন্ধ বাহক’-টির জন্য— সে আসলে একটা শান্ত অত্যন্ত ধৈর্য্যশীল চোখে ঠুলি পরানো বলদ। সে এক এক বারে তিন ঘণ্টা ধরে ধীরে ধীরে ঘানি ঘোরানোর ক্লান্তিকর পরিশ্রমের কাজটা করে থাকে। 
  
সরষে পিষে তেল বের করার যে মূল যন্ত্র তাকে বলে ঘানি গাছ। এই ঘানি গাছ তৈরি করা হয় অশ্বত্থ বা বটের নিরেট গুঁড়ি থেকে। সেটাকে ঘষে ঘষে মসৃণ করে একটা নির্দিষ্ট আকারে আনা হয়। তারপর সেটাকে শক্ত করে মাটিতে পুঁতে দেওয়া হয়। এর ওপরের অংশটাকে বলা হয় পিঁড়ে। এটি একটি হামানদিস্তার হামান বা বাটির কাজ করে। এর নীচের অংশে একটি গর্ত থাকে। তার মধ্যে সরষে বা যা পেষাই করা হবে সেটিকে ঢেলে দেওয়া হয়। এর মধ্যের হামানদিস্তার মুষল অংশটি যাকে ঝাঁট বলা হয়, সেটিকে ঢুকিয়ে পেষাই-এর কাজটা করা হয়। একটা বাঁশের হেলেদার আড়াআড়িভাবে পাশ থেকে লাগানো থাকে। এতে করে খোঁদলের মধ্যে দেওয়া বীজ ক্রমাগত নাড়া যায়। এছাড়া হামানদিস্তার মধ্যে ক্রমাগত পেষাইয়ের জন্য মাল সরবরাহও করা যায়। হামানদিস্তার মুষলের মাথাটা একটা চওড়া কাঠের তক্তার সাথে আটকানো থাকে। একে ঢেক্কা বলা হয়। এর নীচের অংশটা আবার দড়ি দিয়ে টেনে নামিয়ে একটা কাঠের গুঁড়ির সাথে বাঁধা হয় (একে মুত্তুম বলে)। যদি তুমি খেয়াল করো তাহলে দেখবে, এই তক্তার একটা অংশ ঘানিগাছটিকে ঘিরে গোল গোল ঘুরছে। তক্তার আর একটা দিকে মাটি বা ভারী পাথর বোঝাই বস্তা চাপানো থাকে ভারী করার জন্য। তক্তার এই অংশটা হামানদিস্তার মাথার যে অংশটা সরষে বীজের ওপর বসে থাকে, তার ওপর চাপ দেয়। এই হামানদিস্তার মাথার দিকটা, যাকে জোয়াল বলে, সেটা বলদের কাঁধের সাথে লাগানো থাকে। আর এই জোয়াল থেকে বলদের মাথা পর্যন্ত একটা একটা কাঠের টুকরো চলে যায়, একে কান-নুড়ি বলে। এটা জোয়ালের সাথে দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকে। ঠিক যেমন ঘোড়ার গাড়ির সাথে ঘোড়া দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকে আর সেটাকে টানে, এই কান নুড়ি দিয়ে বলদ জোয়ালটাকে টানে আর পুরো তেল পেষাইয়ের যন্ত্রটা গোলগোল ঘোরে। এই পুরো সিস্টেমটা নানারকম দড়ি আর ফিতে দিয়ে এমন আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা থাকে আর সেটা এমনই আদিম একটা ব্যাপার যে পেনসিলে ছবি এঁকেও সবটা বোঝানো অসম্ভব। সরষে পিষে যে তেল বের হয়, সেটা বেরিয়ে আসে তেলকলের গোড়ার দিকে রাখা একটা ফুটো দিয়ে। ফোঁটা ফোঁটা করে বেরিয়ে এসে বাইরে একটা নারকেলের মালায় জমা হয়। নারকেলের মালার যে চোখের মত অংশ, সেখানে একটা ফুটো করা থাকে। সেই ফুটো এখানে ফানেলের কাজ করে। সেখানে দিয়ে তেল বেরিয়ে এসে নিচে একটা জালায় জমা হয়। আর এই সাধারণ যন্ত্রের মাধ্যমে মানব জাতির এক ষষ্ঠাংশকে তাদের সমস্ত রকম প্রয়োজনীয় তেল সরবরাহ করা হয়। 
.
.
.
কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্টের 'রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল'
অনুবাদ ও টীকা : অর্ণব রায়
.
প্রচ্ছদ : অজন্তা হাজরা
মুদ্রিত মূল্য : ৫৫০ টাকা
সুপ্রকাশ

Comments

Popular posts from this blog

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।

আমার রবীন্দ্রনাথ, আমাদের। আলাপ বিলাপ। স্বপ্নময় চক্রবর্তী

পাথারে। সেকালের চিত্র চরিত্র