লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর : এক বিষাদান্ত পরম্পরা ।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।
সুপ্রকাশ প্রকাশিত অনন্ত জানার বই 'লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর : এক বিষাদান্ত পরম্পরা' পড়ে মতামত জানিয়েছেন সৌরজিৎ বসাক। আমরা তাঁর অনুমতি নিয়ে নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি।
.....................................................
পাঠ প্রতিক্রিয়া—
➤ বই : লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর : এক বিষাদান্ত পরম্পরা
➤ লেখক : অনন্ত জানা
➤ প্রকাশক : সুপ্রকাশ
➤ মুদ্রিত মূল্য : ২৯০ টাকা
➤ প্রচ্ছদ শিল্পী : সৌজন্য চক্রবর্তী
➤ অলংকরণ শিল্পী : সুলিপ্ত মণ্ডল
পাঠক-জীবনের মুসাফিরনামায় এই যে এতশত শব্দের সমুদ্রের (নিদেনপক্ষে স্রোতস্বিনী নদী তো বটেই) মধ্যে দিয়ে বৈঠা বেয়ে এগিয়ে চলতে হয়, সেটির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ‘বই’ নামক ‘দুই-মলাটে-বন্দি’ সত্তার বোধকরি দু’রকমের আত্মপ্রকাশ। তার মধ্যে প্রথমটা তো সুপরিচিত লেখক-পাঠক যুগলবন্দি, কিংবা একটি গ্রন্থ যা বলতে চায়, শোনাতে চায়। কিন্তু এরপর দ্বিতীয় যে বিষয়, যা কিনা অনেকটাই অব্যক্ত — অর্থাৎ, কাগজ-কালির কাঁচামাল হতে সম্পূর্ণ গ্রন্থে উত্তরণের যে যাত্রা, সেই শেষ-হতে-না-চাওয়া যাত্রার অভিযাত্রীদের নিজস্ব ইতিকথা।
প্রাসঙ্গিকতার খাতিরে আমরা যদি এখন লেটারপ্রেসের কথা বলি, তা হলে তার বাস্তব অস্তিত্ব এখন হয় পাঠকদের সংগ্রহে থাকা জীর্ণ-দীর্ণ পুরনো বইয়ের সারিতে, না-হয় কিছু প্রাচীন প্রকাশকের/বিক্রেতার অবিক্রিত স্তূপে। কিন্তু ব্যক্তিগত পাঠকবৃত্তি থেকে এ-কথা তো হাড়েহাড়ে টের পেয়েছি যে, একটা নির্দিষ্ট সীমার পর কোনও-না-কোনও উপায়ে সেই লেটারপ্রেসের যুগের বই হাতে তুলে নিতেই হয়, বা বলা ভালো হাতে এসেই পড়ে ঠিক। গ্রন্থনির্মাণের সেই যুগের সাক্ষ্যবহনকারী বইগুলিকে অতীত হিসেবে একেবারে বিস্মরণের দিকে ঠেলে দেওয়া তো মোটেই সহজ কথা নয়।
মনে করা যাক, পাতলা ফিনফিনে একটা কাগজের পৃষ্ঠা বুক চিতিয়ে শায়িত রয়েছে যন্ত্রবেদিতে এবং তার উপর মর্মভেদী অস্ত্রের মতো নেমে আসছে কালিমালিপ্ত ধাতব শব্দের সারি। মুদ্রণের এই আদিম-পন্থায় কষ্ট তো শুধুমাত্র সেই লেটারপ্রেসের জগদ্দল ভার নিজের উপর নেওয়া কাগজের নয়, বরং নেপথ্যের সেই মুদ্রণকর্মীরও বটে — যা অনেকাংশেই উপেক্ষিত। এবং সেই উপেক্ষাকেই মূল রসদ হিসেবে সম্বল করে আলোচ্য বইয়ের যাবতীয় কথকতা বা কত কথা।
কত কথাই বটে। বিগত কয়েক শতকের বাংলাভাষার গ্রন্থনির্মাণের ক্ষেত্রে লেটারপ্রেসের আদি-অনন্তের ঠিকুজিকোষ্ঠী নির্ধারণ করতে অনেক কথারই উল্লেখ করতে হয়েছে এ-ক্ষেত্রে। তাতে বাংলার পাশাপাশি দক্ষিণ ভারতের মুদ্রণশিল্পের কথা যেমন উঠে এসেছে, তেমনই উঠে এসেছে সীমানা পেরিয়ে মার্কিনমুলুকের প্রবাদপুরুষ বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের সঙ্গে মুদ্রণ জগতের সম্পর্কের কথাও। তারপর আবারও নিজের দেশে ফেরত এসে প্রসঙ্গ উঠেছে কাঙাল হরিনাথ-এর (হরিনাথ মজুমদার), প্রসঙ্গ উঠেছে বটতলা সংস্কৃতির, এবং সর্বোপরি সেইসব অখ্যাত কম্পোজিটরদের — যাঁদের দিনযাপনের কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই এতকিছুর অবতারণা।
তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধধর্মী লেখ্যরীতির পাশাপাশি সমস্তকিছুর আরেকটি যে প্রধান ভিত্তিপ্রস্তর রয়েছে এই সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে, তা হল লেখকের নিজস্ব প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অভিজ্ঞতা। কারণ, লেখকের নিজের পরিবারের আপনজনেরাও জড়িয়ে ছিলেন এই মুদ্রণজগতের সঙ্গে। তাও যে-সেভাবে তো নয়, দস্তুরমতো নীতিগত আদর্শ বজায় রেখে। মানবচিত্ত জোলো হয়ে ওঠার পূর্বযুগে যেটা কিছুটা সময়োচিত স্বাভাবিকও হয়তো ছিল। তা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত যে তাগিদ, প্রেস-কে ঘিরে পরিবারতন্ত্রের যে একান্নবর্তী যাপন — তা যথেষ্ট পরিমাণে স্বতন্ত্রতার দাবিদার তো বটেই। বিরলও বটে। সেই কারণেই হয়তো একটা পর্যায়ের পর লেখক-পরিবারের সেই মানু্ষগুলোকে নিজেরই বড্ড চেনা মনে হতে পারে। তবে সেটা লেখকের নিজস্ব পরিবেশনার জাদু, নাকি সেই সমস্ত অতীতের মানুষগুলির দৃঢ়চেতা অস্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ — তা বলা মুশকিল। হয়তো দুটোই।
লেটারপ্রেসের ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, কর্মযজ্ঞের বিবরণ, কম্পোজিটদের শ্রম-মূল্যায়ন, শ্রমের নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা কিছু অসাধারণ মেধাশক্তি এবং ধীশক্তির পরাজিত জয়গাথা — এই আখ্যানে রয়েছে সমস্তকিছুই। এবং কয়েকটি শব্দ পিছিয়ে গিয়ে যে ‘পরাজিত জয়গাথা’-র কথা উল্লেখ করেছি তা সচেতনভাবেই করা, ব্যাকরণের ত্রুটি হিসেবে নয়। প্রযুক্তির ক্রমবিকাশের ফলে লেটারপ্রেসকে যে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে এই শতাব্দীর গোড়া থেকেই, তা কে না জানে? সেটাকে যদিওবা বিলুপ্তির পরাজয়ের আওতায় গণ্য করা যায়, তবুও, একদা সেইসমস্ত গ্রন্থশিল্পীদের শ্রমই যে আজকের গ্রন্থশিল্পের ভিত গড়ে দিয়ে গিয়েছে, তা কি অস্বীকার করা চলে? সেও তো একরকমের জয়। অতীতের জমিতে পা না রেখে বর্তমান কবেই বা দাঁড়াতে পেরেছে মানুষের ইতিহাসে?
এখানেও তো তার ব্যতিক্রম নেই।
Comments
Post a Comment