জনবিলাসের বারোমাস্যা।। সমরেন্দ্র মণ্ডল।। সুপ্রকাশ।।
বিলাস পা বাড়াল বোর্ডিং হাউসের দিকে। এই ছোট্ট ঘিলুর বয়সেই তার ভিতর দ্বন্দ্ব শুরু হল। বোর্ডিং হাউসের দিকে যেতে যেতেই তার মনে হল, সে তো বিলাস। বিলাস সরকার। কোথা থেকে যে একটা জন এসে ওর ঘাড়ে বসল! সে মায়ের কাছে ভূতের গল্প শুনেছে অনেক। তার মনে হল জন একটা ভূত। তার ঘাড়ে চেপে বসেছে। জন নামটাকে সে মেনে নিতে পারছে না। কিন্তু সবাই ওকে জন বলে ডাকছে। আর জন ঘাড়ে চেপে বসতেই তার ভিতর কেমন রাগ রাগ অনুভূতি দেখা গেল। বিলাস ছিল নম্র, মৃদুভাষী। তার ভিতর ক্রোধ নামক রিপু কোনওদিন সেভাবে বাসা বাঁধেনি। কখনও সখনও অল্প স্বল্প রেগেছে ঠিকই, কিন্তু সে সাময়িক। কিন্তু এখন যেন ক্রোধ ওর ভিতর চোরাস্রোতের মতো ধীরে ধীরে প্রবাহিত হচ্ছে।
সে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল পিতৃদেব অফিসঘরের সামনে বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। পাশে সেই সাদা ফাদার।
বিলাস প্রশ্ন করল সতীশকে, উনি কে?
—কে?
—ওই যে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। সাদা ফাদার।
হাসল সতীশ। বলল, উনি ফাদার অ্যান্টনি। আমরা বলি ফাদার আন্তন। উনি এখানে সবচেয়ে বড়ো। বড়ো ফাদার।
বিলাস কী বুঝল কে জানে। বলল, ও।
সতীশ বলল, তোমার জিনিসপত্র রেখে, তোমাকে নিয়ে ঘুরব। তোমার মা কিছু খাবার দিয়েছেন?
—না তো!
—কিছু দেননি? মুড়ি-চিড়ে।
—হ্যাঁ, ভুজি আছে, বিস্কুট আছে।
সতীশ জানে মুড়ির সঙ্গে ভাজা চিড়ে, বাদাম, ঝুরিভাজা মিলিয়ে দিলেই ভুজি হয়ে গেল। ওদের গ্রামে ওরা ভুজি বলে। সেও নিয়ে আসে বাড়ি থেকে। তার মা অবশ্য ছোলা ভাজাও মিশিয়ে দেন।
সতীশ বলল, ভুজি খেয়ে, আমরা ঘুরব। বই খাতা আছে? অঙ্ক বই? ইংরেজি বই?
—না তো।
—ঠিক আছে। সন্ধে হলেই স্টাডি। সকলকে পড়ার ঘরে যেতে হবে। তোমার কোন ক্লাস?
—ক্লাস থ্রি।
—আমি ক-টা অঙ্ক দেব, তুমি করবে। ঠিক আছে?
বিলাস ক্রমশ খাঁচার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। প্রথম দিনেই তার মনে হল, পিতৃদেব তাকে এক অচেনা বিরাট খাঁচার ভিতর রেখে দিয়ে চলে গেলেন। তার কেমন অভিমান হল। সেই অভিমান গলায় দানা বাঁধতে শুরু করল। মনে হল সে কেঁদে ফেলবে।
জনবিলাসের বারোমাস্যা
সমরেন্দ্র মণ্ডল
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
মুদ্রিত মূল্য : ২৫০ টাকা
সুপ্রকাশ
Comments
Post a Comment