কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্টের 'রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল'।। অনুবাদ ও টীকা : অর্ণব রায়।। সুপ্রকাশ
শহরের ইউরোপীয় অংশ ছাড়িয়ে আর উত্তরদিকে নদীবন্দরের মুখে জড়ো হওয়া অসংখ্য মালবাহী দেশীয় নৌকার ভিড় পার করলে প্রথম যে জিনিসটা চোখে পড়বে সেটা একটা ভাঙাচোরা দেখতে চতুষ্কোণ চত্বর, নদীর দিকে খোলা মুখ, বাকি দিকগুলোয় প্রাচীর দেওয়া। এই প্রাচীরের গায়ে বিরাট মাঠ। আর এই মাঠেই এক কাঁচা চামড়ার ব্যবসায়ী কিছু সাফাই আধিকারিককে সঙ্গে করে কলকাতা শহরের মৃত চতুষ্পদদের নিয়ে তার সুচারু কাজকারবার চালিয়ে থাকে। আর ওই প্রাচীরের ওপর সারাক্ষণ গোটা পঞ্চাশেক ক্ষুধার্ত শকুন হাঁ করে বসে থাকে। আর নীচে, আবর্জনা আর হাড়ের স্তূপের মধ্যে ঘুরে বেড়ায় একই রকম ক্ষুধার্ত জঘন্য দেখতে কিছু রাস্তার কুকুর। তাদের সাথে ওই ময়লা ঘেঁটে পাওয়া পুরস্কার নিয়ে কাড়াকাড়ি করে গোটা কুড়ি দৈত্যাকার সারস।
এই বাড়িটাকে শ্মশানঘাট বলে। হিন্দুরা এই জায়গাটা ঘিরে দিয়ে অন্য জায়গার থেকে আলাদা করে রাখে তাদের মৃতদের দাহ করার জন্য। যখন আমি ‘হিন্দুরা’ বলছি, তখন বুঝতে হবে আমি বলতে চাইছি, যাদের মৃতদেহ দাহ করার ক্ষমতা আছে, তারা। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে, হিন্দু সমাজের অর্ধেকের বেশি মানুষ এই ক্ষমতা রাখে না। আর তোমরা ভালো করেই জানো, দু একটি ব্যতিক্রম ছাড়া (খুব অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ বা সাধুসন্ন্যাসী), হিন্দুরা তাদের মৃতদেহ কবর দেয় না, পোড়ায়। আর তোমরা জানলে অবাক হয়ে যাবে, দরিদ্র হিন্দুরা কীভাবে তাদের মৃতদেহ সৎকার করে। তাদের নদীর পাড়ে খোলা আকাশের তলে ফেলে রেখে চলে যাওয়া হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মরার আগেই মরার জন্য সেখানে এনে ফেলে রাখা হয়, যতক্ষণ না নদীর ঢেউ এসে তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আর এই নদীর থেকেই কলকাতার বেশিরভাগ অঞ্চলের পানীয় জল সরবরাহ করা হয়! যদিও আমার উদ্দেশ্য গঙ্গাবক্ষে যা যা ভেসে বেড়ায় তার দিকে তোমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা নয়, বরং তোমাদের সাধারণ মানুষদের থেকে চারপাশ বিষয়ে আর একটু বেশি কৌতূহলী করে তোলা।
কয়েক বছর আগে কলকাতার এক খবরের কাগজে একটা খুব সুন্দর লেখা বেরিয়েছিল। সেখানে প্রস্তাব করা হয়েছিল যে চাঁদা তুলে একটা তহবিল বানানো হোক। সেই টাকায় শুধু দরিদ্র হিন্দু নয়, বিত্তবান হিন্দুও তাদের মৃতদেহ যেভাবে তাদের সুবিধে মনে হয় সৎকার করতে পারবে। শহরের শৌচ ব্যবস্থার দিক থেকে দেখতে গেলেও এতে সুবিধে হবে। এই প্রবন্ধে আরও দেখানো হয়েছিল, এই পদ্ধতিতে একটি মৃতদেহ সৎকারের খরচ দুটাকার মধ্যে সেরে ফেলা যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে, কাজের কাজ কিছুই হল না। বরং সৎকার তহবিল গঠনের বদলে পুলিশ করল কী, ঘাটের ধারে ধারে কয়েকটা নৌকো রেখে দিল। সে সব নৌকো ডোমেদের। তাদের কাজ হল গঙ্গাবক্ষে কিছু অপ্রীতিকর দেখতে ভেসে থাকলে সেগুলোকে সরিয়ে ফেলা। আর এই সরিয়ে ফেলার কাজ বলতে তারা যা করে তা হল জিনিসগুলোকে ডুবিয়ে দেওয়া। আর এই ডোবানোর কাজটি সারা হয় যত নৌকোর সারি আছে, সব সামনে দিয়ে ওগুলোকে দেখতে দেখতে চলে যাওয়ার পরে। কখনও কখনও তো কোনো কোনো হতভাগ্যের দেহাংশ কোনো জাহাজের নোঙরের শেকলে বা কোনো স্টিমারের পাখনায় জড়ামড়ি অবস্থায় পাওয়া যায়। আজ যদি সরকার এই ডোমেদের নৌকার বন্দোবস্তটা তুলে দিয়ে সেই টাকাটা সৎকার তহবিলে পাঠিয়ে দিত, তাহলে সেই তহবিলে কম টাকা জমা পড়ত না।
.
.
.
কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্টের 'রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল'
অনুবাদ ও টীকা : অর্ণব রায়
.
প্রচ্ছদ : অজন্তা হাজরা
মুদ্রিত মূল্য : ৫৫০ টাকা
সুপ্রকাশ
Comments
Post a Comment