কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্টের 'রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল'।। অনুবাদ ও টীকা : অর্ণব রায়।। সুপ্রকাশ।।

বগাডাঙা আধাআধি রাস্তা। এই জায়গাটাকেই আমরা ঘোড়াদের, চাকরদের ও আমাদের বিশ্রামস্থল হিসেবে ঠিক করে নিয়েছিলাম। ফলে আমরা বাকী দিনটা এখানেই থেকে গেলাম। ঠিক যেভাবে একজন প্ল্যান্টার আর একজন মফঃস্বলের যাত্রী গ্রামে গ্রামে যাত্রা করার সময় থাকে, সেভাবে। ট্রেনে করে যাতায়াত করার সময় যেরকম হুড়োহুড়ি করতে হয়, সেরকম ভাবে একেবারেই নয়, বরং অনেক ধীরেসুস্থে, আরাম করে। তা বলে এটা ধরে নিও না যে একজন প্ল্যান্টার দিনে ষোলো মাইলের বেশি যাত্রা করতে পারে না। যদি দরকার পরে, আর চাষের মরশুমে এরকম দরকার হামেশাই পড়ে, তাহলে বারবার ঘোড়া বদলে তারা দিনে তিরিশ থেকে চল্লিশ মাইল অবধি চলে যেতে পারে। 
  
পরের দিন সকালে আবার চাকরদের মালপত্র দিয়ে আগে পাঠিয়ে দেওয়া হল। আমাদের যাত্রার ব্যাবস্থা আগের দিনের মতোই থাকল। ফেরিনৌকায় নদী পার হয়ে আমরা আবার ঘোড়ায় চড়ে কৃষ্ণনগরের দিকে চললাম। সেটা মোটামুটি আরও ষোলো মাইল দূরে। মাঝখানে আর একটা জায়গায় নদী পার হতে হলো। জায়গাটার নাম হাঁসখালি (মানে হাঁস চলার নদী)। সেখানে গিয়ে দেখলাম একখানা বড়ো ভৌলিয়া নৌকা দাঁড়িয়ে আছে। জানতে পারলাম এইচ— অ্যান্ড ডাব্লিউ— কোম্পানির অতি পরিচিত প্ল্যান্টার মি. এইচ— কিছুক্ষণ আগেই নেমেছেন ও কৃষ্ণনগরের দিকে গেছেন। আমরা করলাম কী, আমরা আমাদের ঘোড়া ছেড়ে ওনার রেখে যাওয়া ঘোড়াগুলোয় চড়ে রওনা দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই যে হাতিটা তার মালপত্র বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, সেটাকে পার করে গেলাম। এই পার করার সময় আমি যে ঘোড়াটায় ছিলাম, হাতি দেখে সেটা এত ভয় পেয়ে গেল যে তড়বড় করে ছুটে আমাকে নিয়ে একটা বড় গর্তের মধ্যে পড়ছিল প্রায়। যাই হোক একটু পরেই আমরা মি. এইচ— ও তার সঙ্গীদের ধরে ফেললাম। মিঃ এইচ— একটা খুব সুন্দর বার্মার ছোটো ঘোড়া চড়ে যাচ্ছিলেন। ভদ্রলোককে দেখে মনে হলো, তিনি জীবনের এমন একটা স্তরে এসে পৌঁছেছেন যখন ঘোড়ার পিঠে চেপে দিনমান ছুটোছুটি আর তাঁর ভালো লাগছে না। বাকি পথটা তাই আমরা পায়ে হেঁটেই গেলাম।  
  
কৃষ্ণনগরে ঢোকার রাস্তাটা এত সুন্দর আর গাছে ভরা যে দেখে মনে হয় কোনও ইউরোপীয় শহরের কাছাকাছি চলে এসেছি। টিক গাছে ছাওয়া চওড়া রাস্তা, ছায়াভরা আর অতিশয় মসৃণ। বেশ খানিকটা যাওয়ার পর এই রাস্তা কিছুটা সরু হয়ে একটা স্থানীয় বাজারের মধ্যে দিয়ে যায়। এখানে একটা ছবির মতো সুন্দর আর সম্ভ্রম উদ্রেগকারী হিন্দু স্থাপত্যকলায় নির্মিত প্রবেশপথ বা তোরণ রয়েছে। এই প্রবেশপথটি আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর স্থাপত্যের নিদর্শন। রাস্তাটা তার তলা দিয়ে গেছে। এটা একটা চতুষ্কোণ বাড়ি বা মিনারও বলা চলে। এখন ধীরে ধীরে ধ্বংস্তূপে পরিণত হচ্ছে। চারপাশ থেকে অনেক খিলানের কোণা বেরিয়ে আছে। এই খিলানগুলি একসময় বিশাল বিশাল কাঠের বাঁকানো দরজা ধরে থাকত। দেখে মনে হয়, এই ধ্বংস্তূপটা আসলে রাজবাড়ির বাইরের মিনার বা দরজা।  এই রাজাবাড়ি এখন রাজা শিরীষচন্দ্র রায়ের বাসস্থান। এই বাড়িটির দক্ষিণের খিলান পার করে চওড়া মসৃণ পথ দিয়ে আমরা কৃষ্ণনগরে প্রবেশ করলাম। আমার জীবনে এই প্রথম আমি কোনও সিভিল স্টেশনে পা রাখলাম। 
.
.
.
কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্টের 'রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল'
অনুবাদ ও টীকা : অর্ণব রায়
.
প্রচ্ছদ : অজন্তা হাজরা
মুদ্রিত মূল্য : ৫৫০ টাকা
সুপ্রকাশ


Comments

Popular posts from this blog

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।

আমার রবীন্দ্রনাথ, আমাদের। আলাপ বিলাপ। স্বপ্নময় চক্রবর্তী

পাথারে। সেকালের চিত্র চরিত্র