কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্টের 'রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল'।। অনুবাদ ও টীকা : অর্ণব রায়।। সুপ্রকাশ

বন্যা এখন মোটামুটি চরমে। ধানচাষীরা আউশ ধান কেটে ঘরে তুলে ফেলেছে। আর যাকে বলে ঘোলা পানি  সেই লাল রঙের কাদাগোলা জল ওপরের দিকের প্রভিন্সগুলো থেকে নেমে এসে ইছামতী ভরে ভরে বইছে। আর এই কাদাজলের আড়ালেই ঘুরে বেড়াচ্ছে কুমীর। খুব সম্ভবত গরমকালে এরা সুন্দরবনের দিকে চলে গেছিল। এবার তারা তাদের অভ্যস্ত শিকারের স্থলে ফিরে এসেছে। ইতিমধ্যেই গত পনেরো দিনে দুজন হতভাগ্য মহিলা এই আড়ালে আড়ালে ঘুরে বেড়ানো দৈত্যগুলোর শিকার হয়েছে। এই সব দৈত্যদের হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই ঘাটগুলোকে ঘিরে কাঠ আর বাঁশ দিয়ে শক্ত করে বেড়া দেওয়া হয়েছে। এই বেড়া নদীর ভেতরে ছয় থেকে আট ফুট পর্যন্ত এলাকা ঘিরে রেখেছে। এতে যে সমস্ত মানুষ স্নান করতে বা ঘরের কাজের জন্য জল নিতে আসবে, তারা সুরক্ষা পাবে। আর এদেশের পরিবারে এই দায়িত্বটা সবসময় মহিলাদের ঘাড়েই পড়ে। কিন্তু, এই সমস্ত অজ্ঞ, জেদি আর মূলত অদৃষ্টবাদী লোকগুলোর জন্য কোনওরকম সুরক্ষার ব্যবস্থা করার সব চেষ্টাই বৃথা। মি. এফ এখানে বাজারের কাছের ফেরি-ঘাটে এত কষ্ট করে একখানা বেড়া দাঁড় করালেন, কিন্তু যাদের ফায়দার জন্য এত কিছু করা, অন্তত এটুকু তো আশা করা যায় যে তারা এই বেড়াগুলো মেরামতটুকুর দায়িত্ব নেবে! তারা যে শুধুমাত্র বেড়া মেরামতের বিষয়টিকে অবহেলা করে তা নয়, হামেশাই এই সুরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করার প্রয়োজনও মনে করে না! এই কয়েকদিন আগে, সকালবেলা, আমি ঘাটের স্কেচ করছিলাম, দেখি এক মহিলা গট গট করে ঘাটে নেমে আসছে, বেড়ার মধ্যে দিয়ে নয়, বাইরে দিয়ে। আমি তাকে সাবধান করার জন্য আপত্তি জানাতে সে নিজের মনে গরগর করে একগাদা কথা বলে গেল। 

আমি যখন প্রথমবার কুমীর দেখি, আমি মি. এস-এর সাথে ছিলাম। কুমীর মারাতে এই ভদ্রলোকের এতই প্রসিদ্ধি যে এখানকার স্থানীয় লোকেরা এঁর নাম দিয়েছে ‘কুমীর সাহেব’ বা কুমীর ভদ্রলোক। কুমীরটাকে শেষ কোথায় দেখা গেছিল সেটা আগে নিশ্চিত করা হল। খবর পাওয়া গেল, নদীর নীচের দিকে একটা নীলের ক্ষেতের মধ্যে ওটাকে দেখা গেছে। আমরা সকাল আটটা নাগাদ বের হলাম। নদী পার করে নিঃশব্দে গুঁড়ি মেরে কুমীরের কয়েক গজের মধ্যে গিয়ে উপস্থিত হলাম। ওখানে পৌঁছোনোর প্রায় সাথে সাথেই কুমীরটিকে আবিষ্কার করা গেছিল। আমার সঙ্গী প্রথমেই বন্দুক তাক করে একখানা গুলি ধাঁ করে কুমীরের খুলির মাঝ বরাবর বসিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে কুমীর একটা ধাক্কা খেয়ে ঝুপ করে নদীর মধ্যে ডুবে গেল। কিন্তু এমনই পরিস্থিতি হলো, আমি মি. এস-এর সাথে থাকতে পারলাম না। বাকি দিনটা তাকে একাই কুমীরের পেছনে ছুটোছুটি করতে হয়েছিল। অসীম পরিশ্রম আর কষ্ট ভোগ করবার পর, (যেরকম আশা করা গেছিল) তিনি এই পশুটিকে খতম করতে সক্ষম হন (তার গায়ে আটখানা গুলি লেগেছিল)। তারপর গলার দড়ি বেঁধে উনি আর ওনার নৌকার মাঝি পশুটাকে টেনে টেনে পাড়ের দিকে নিয়ে আসেন। ইতিমধ্যে নদীর অপর পাড়ে মহিলারা আর অন্যান্য গ্রামবাসীরা চেঁচামেচি শুরু করেছে। তাদের প্রার্থনা, তারা তাদের পুরোনো শত্রুকে একবার চোখের দেখা দেখতে চায়। তাদের অনুরোধ রাখতে মি. এস নৌকা ঘুরিয়ে মাঝনদীতে নিয়ে যান। আর তখনই জন্তুটা, যেন পুণরায় প্রাণ পেয়ে ছটফটিয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। স্বাভাবিকভাবে, নৌকাও উলটে যায়। যে কজন লোক নৌকার ওপর ছিল, তারাও নদীতে গিয়ে পড়ে। সৌভাগ্যক্রমে, আমার বন্ধু, তার চাকর এবং মাঝি, সকলেই ভালো সাঁতার জানত। তারা নিরাপদে নদীর ঘাটে এসে পৌঁছোয়। আমি একবিন্দু সাঁতার জানি না। আমি যদি ওদের সাথে যেতাম, তাহলে আমার ভাগ্য সেদিন অন্যরকম হতেই পারত। আসলে কুমীরটা মরার আগে একটা শেষ লড়াই দেয়। যার ফলে নৌকাটা সঙ্গে সঙ্গে ডুবে যায়। কিন্তু পরের দিন সকালে নৌকা এবং কুমীর, দুটিকেই উদ্ধার করে ফ্যাক্টরির ঘাটে এনে রাখা হয়।
.
.
.
কোলস্ওয়ার্দি গ্রান্টের 'রুরাল লাইফ ইন বেঙ্গল'
অনুবাদ ও টীকা : অর্ণব রায়
.
প্রচ্ছদ : অজন্তা হাজরা
মুদ্রিত মূল্য : ৫৫০ টাকা
সুপ্রকাশ

Comments

Popular posts from this blog

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।

আমার রবীন্দ্রনাথ, আমাদের। আলাপ বিলাপ। স্বপ্নময় চক্রবর্তী

পাথারে। সেকালের চিত্র চরিত্র