আহাম্মকের খুদকুড়ো।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া

সুপ্রকাশ প্রকাশিত দুর্লভ সূত্রধরের বই 'আহাম্মকের খুদকুড়ো' পড়ে গুডরিডস্-এ মতামত জানিয়েছেন পৌলমী ঘোষ। আমরা নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি। 
..........................................................
দুর্লভ সূত্রধরের লেখার সঙ্গে আমার দ্বিতীয় পরিচয় আহাম্মকের খুদকুড়ো। 'অনন্যবর্তী' পড়ে তাঁর লেখার যে সহজ-সরল অথচ গভীর স্বরটির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল, এই বইয়ে এসে সেই স্বরটাকেই যেন আরও ব্যক্তিগত, আরও অন্তরঙ্গভাবে পেলাম।

এটি আসলে কোনো সাজানো-গোছানো আত্মজীবনী নয়। বরং জীবনের এদিক-ওদিক ছড়িয়ে থাকা কিছু টুকরো স্মৃতি-শৈশব, স্কুল, শিক্ষক, বন্ধু, বাড়ির মানুষ, পাড়া, উৎসব, খাবার, অভাব, আনন্দ, ছোট ছোট বিস্ময় আর সময়ের বদলে যাওয়া। লেখক নিজেই যেন সেইসব স্মৃতির খুদকুড়ো কুড়িয়ে এনে আমাদের সামনে সাজিয়ে দিয়েছেন। আর আশ্চর্যের বিষয়, যেগুলোকে জীবনের সামান্যতম ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায়, লেখকের হাতে সেগুলোই হয়ে উঠেছে এক একটি সম্পূর্ণ গল্প।

এই বই পড়তে পড়তে আমার বারবার মনে হয়েছে— মানুষের জীবনে আসলে বড় ঘটনা যতটা না থেকে যায়, তার চেয়ে অনেক বেশি থেকে যায় ছোট ছোট মুহূর্ত। জ্বরের দিনে মায়ের হাতে পাওয়া কোনো খাবারের স্বাদ, স্কুলের কোনো শিক্ষকের মুখ, পাড়ার কোনো গাছ, শীতের সকালের রোদ, সরস্বতী পুজোর ব্যস্ততা, বন্ধুর সঙ্গে কাটানো কোনো এক বিকেল... সময় পেরিয়ে গেলে হয়তো ঘটনাগুলো আর গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় না, কিন্তু স্মৃতির ভেতরে তারা অদ্ভুত যত্নে বেঁচে থাকে।

আর এই সামান্য জিনিসগুলোকেই অসামান্য করে তোলার ক্ষমতাই সম্ভবত দুর্লভ সূত্রধরের লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি।

আহাম্মকের খুদকুড়ো পড়তে পড়তে নিজের শৈশবের কথাও মনে পড়ে যায়। এমনকি লেখকের অভিজ্ঞতা আমার নিজের জীবনের সঙ্গে একেবারেই না মিললেও, তার অনুভূতিগুলো কোথাও যেন খুব চেনা লাগে। কারণ শৈশবের কিছু অনুভূতি বোধহয় সময়, স্থান বা মানুষের ভেদ মানে না। সেই মায়া, সেই কৌতূহল, ছোট্ট কোনো জিনিস নিয়ে বিপুল আনন্দ পাওয়া, সামান্য অভাবকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া— এসবের মধ্যে একটা সার্বজনীনতা আছে।

বইটির আরেকটি দিক আমাকে বিশেষভাবে টেনেছে— অভাবের গল্পকে লেখক কখনও করুণার গল্প বানাননি। মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবনের সীমাবদ্ধতা আছে, খাবারের হিসেব আছে, ছোট ছোট প্রাপ্তি নিয়ে বিস্ময় আছে; কিন্তু তার মধ্যে আত্মদয়া নেই। বরং সেই জীবনেও কত রকম আনন্দ, কৌতূহল, সম্পর্ক আর সৌন্দর্য ছিল, লেখক সেটাই দেখিয়েছেন। হয়তো তাই আধখানা ডিম, সাধারণ জলখাবার কিংবা জ্বরের দিনের ভাতও এই বইয়ে শুধুমাত্র খাবার থাকে না— তারা হয়ে ওঠে একটি সময়ের সামাজিক ও পারিবারিক স্মৃতি।

স্কুল আর শিক্ষকদের উপস্থিতিও বইটিতে বিশেষভাবে মনে থাকে। শিক্ষকরা এখানে শুধু পড়ানোর মানুষ নন; তাঁরা একটা সময়ের মূল্যবোধ, শাসন, স্নেহ আর মানুষের হয়ে ওঠার অংশ। একইভাবে চারপাশের মানুষ, পাড়া, উৎসব কিংবা রূপেশ্বরী নদী— সব মিলিয়ে লেখকের শৈশবটা যেন একা তাঁর নিজের থাকে না। ধীরে ধীরে তা পাঠকেরও হয়ে যায়।

এই বইয়ের ভাষাও আমার খুব ভালো লেগেছে। অনন্যবর্তী-তে যে সরলতার মধ্যে মানুষের মনস্তত্ত্বের গভীরতা খুঁজে পেয়েছিলাম, এখানেও সেই একই সরলতা। লেখক কোনো স্মৃতিকে অতিরিক্ত আবেগ দিয়ে ভারী করেন না, কোনো ঘটনাকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করেন না। খুব স্বাভাবিকভাবে গল্প বলে যান। আর সেই স্বাভাবিকতার মধ্যেই কখন যে বুকের ভেতর একটা দীর্ঘশ্বাস এসে বসে, টের পাওয়া যায় না।

সম্ভবত বইটির নামের মধ্যেই তার একটা বড় ইঙ্গিত আছে— খুদকুড়ো। জীবনের যেসব টুকরোকে আমরা অপ্রয়োজনীয় ভেবে ফেলে রাখি, ফিরে তাকালে দেখা যায়, সেগুলোই হয়তো আমাদের স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল অংশ। বড় হয়ে ওঠার পথে আমরা কত কিছু ভুলে যাই; অথচ কোনো এক শীতের সকাল, কোনো খাবারের গন্ধ, কোনো স্কুলঘর, কোনো নদীর পাড় হঠাৎ বহু বছর পর মনে পড়ে যায়। তখন বোঝা যায়, কিছুই আসলে তুচ্ছ ছিল না।

আহাম্মকের খুদকুড়ো তাই আমার কাছে শুধু একজন মানুষের শৈশবের গল্প হয়ে থাকেনি। এটি হয়ে উঠেছে হারিয়ে যেতে থাকা এক সময়ের স্মৃতির সঙ্গে বসে থাকার অভিজ্ঞতা।

বইটি শেষ করার পর মনে হয়েছে— আমরা সবাই হয়তো নিজের জীবনের কত খুদকুড়ো এদিক-ওদিক ফেলে রেখে এগিয়ে চলি। সময়ের সঙ্গে সেগুলোকে আর গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না। অথচ একদিন ফিরে তাকালে বুঝি, সেই সামান্য টুকরোগুলো দিয়েই তো আমাদের শৈশব, আমাদের মানুষ হয়ে ওঠা, আমাদের স্মৃতি— সবকিছু তৈরি।

কিছু বই পড়ে নতুন কোনো পৃথিবী আবিষ্কার করি। আর কিছু বই পড়ে ফিরে যাই নিজেরই কোনো পুরোনো পৃথিবীতে।

আহাম্মকের খুদকুড়ো আমার কাছে তেমনই এক ফিরে যাওয়া।
________________________________
আহাম্মকের খুদকুড়ো
দুর্লভ সূত্রধর 
সুপ্রকাশ
মুদ্রিত মূল্য : ৩২০ টাকা


Comments

Popular posts from this blog

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।

আমার রবীন্দ্রনাথ, আমাদের। আলাপ বিলাপ। স্বপ্নময় চক্রবর্তী

পাথারে। সেকালের চিত্র চরিত্র