হামারটিয়া।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

সুপ্রকাশ প্রকাশিত শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের উপন্যাস 'হামারটিয়া' পড়ে মতামত জানিয়েছেন তিতির চ্যাটার্জি। আমরা তাঁর অনুমতি নিয়ে নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি।
............................................
হামারটিয়া
শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য 
প্রকাশক : সুপ্রকাশ 
মুদ্রিত মূল্য : ৩৫০ টাকা। 

Hamartia
হামারশিয়া: গ্রিক সাহিত্যে ব্যবহৃত এই শব্দের অর্থ হলো কোনও চরিত্রের নিজের কৃতকর্মের জটিল গোলকধাঁধা তাঁর নিজের অবনমনের কারণ হয়। যেমন macbeth এর হামারশিয়া ছিলো তার ক্ষমতার জন্য লোভ, লালসা, ইকারাসের হামারশিয়া ছিলো দম্ভ এবং অবাধ্যতা। 
  এই গল্পের মূল দুই চরিত্র মালিনী এবং অনিরুদ্ধ। ২৫ বছর আগে মালিনী নিজের বাড়িতে বন্ধ ঘরে খুন হয়। খুনের সময় ঘরের ভেতরে ছিলো মালিনীর প্রেমিক অনিরুদ্ধ। পাতি লক্ড room murder মিস্ট্রি হিসাবে পুলিশ কেস সলভ করে ফেলে। অনিরুদ্ধর জবানবন্দিতে পাওয়া যায় অঢেল অসঙ্গতি এবং স্বাভাবিক ভাবেই খুনি সাবস্ত্য করা হয় অনিরুদ্ধকেই। ঘটনায় মোড় আসে ২৫ বছর পর। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার ১২ বছর পর অনিরুদ্ধ সুইসাইড করে, করার আগে নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করে চিঠি লিখে যায় সেই ঘটনার তদন্তকারী অফিসারকে। তৎকালীন তদন্তকারী অফিসার জাভেদ খান তাঁর সঙ্গী ইমানুয়েলকে দায়িত্ব দেন ঘটনার পুনর্তদন্তের জন্য। অফিসিয়াল ভাবে না, শুধুমাত্র অনিরুদ্ধর মরণোত্তর ইচ্ছাকে সম্মান জানাতেই। সেই সময় ঘটনার সাথে জড়িয়ে থাকা অফিসার্স সহ মালিনী ও অনিরুদ্ধের প্রিয়জন দের জবানবন্দি এবং সেখান থেকে আসল অপরাধীকে তুলে আনার চেষ্টা সাথে ইমানুয়েলের নিজের সাথে টানাপোড়েন; এই নিয়েই সংবলিত ১৬৪ পাতার এই বইটি। 
এবার আসি আমার নিজস্ব আলোচনায়। আপনারা যদি শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের একানড়ে পড়ে থাকেন তাহলে এই বই অনেকটা সেই ঘরানার। ডার্কসাইকো থ্রিলার গোত্রে ফেলা যায় বইটিকে। বইটির ending আপনাকে ভাবাবে, চুপ করিয়ে বসিয়ে রাখবে খানিকক্ষণ। 
“A probable impossibility is preferable to an improbable possibility.”
aristotle এর লেখা poetics বইয়ের এই লাইনখানা এই বইয়ের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। পাঠক বই পড়তে পড়তে ওসিলেট করবেন এই দুইদিকের মধ্যে। probable impossibility নাকি improbable possibility কোনটা হবে সমাধানের সূত্র তা শেষ অবধি জানাবেন লেখকই যদিও। শেষটুকু পড়ে মনে হতেই পারে এভাবেও কি শেষ হওয়া যায়, ন্যায় অন্যায়ের যে দ্বিধা-দ্বন্দে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলেন ইমানুয়েল বই জুড়ে তার আঁচ এসে পড়বে আমাদের গায়েও। 
এবার আসি শুরুর হামারশিয়ার কথায়। গল্পের মূল নায়ক ও নায়িকা, মালিনী ও অনিরুদ্ধের হামারশিয়াগুলি যে কী ও কেন তা ছড়িয়ে রয়েছে বই জুড়ে। যদিও আমি মালিনীর মধ্যে কোনরকম flaws পাইনি। একটা অসুখী বৈবাহিক জীবন থেকে বাঁচতে চেয়েছিল সে, চেয়েছিল তার সন্তান কে সুস্থ শৈশব দিতে, চেয়েছিল নিজের কেরিয়ারগ্রাফ কে উর্ধমুখী করতে। কিন্তু কিছুই পারেনি। ডমিনেন্ট মা এবং এক খারাপ, দুর্বল চরিত্রের স্বামীকে ছেড়ে অনিরুদ্ধকে আঁকড়ে বাঁচতে চেয়েছিল। অনিরুদ্ধ কিছুটা ব্যবহারই করে মালিনীকে। কোনও সম্পর্কের প্রতিই লয়াল না থাকা, প্রেমিকা ও বউয়ের মধ্যে বেছে নিতে না পারার চিরপরিচিত দ্বিধা, উশৃঙ্খলতা, এসবই অনিরুদ্ধর হামারশিয়া হিসাবে কাজ করে। ফলস্বরূপ পতন, খুনের দায়ে বারো বছর জেল খেটে, নিঃসঙ্গ অবস্থায় আরও বারো বছর কাটানোর পর স্বেচ্ছামৃত্যু। 

বইটি অতন্ত্য সুলিখিত। বইটিতে গ্রিক মাইথলজি, বাইবেল ও বিভিন্ন ইহুদি গল্পের প্রসঙ্গ এসেছে বারে বারে। এগুলো আমার কাছে খুবই নতুন লেগেছে এবং সমৃদ্ধ হয়েছি। সব মিলে আপনার হাতে যদি সময় এবং শুধু সময় না, ধৈর্য থাকে তাহলে বইটি পড়তেই পারেন। 
একানড়ের পর এটা আমার দ্বিতীয় প্রিয় সাইকো থ্রিলার হয়ে থাকবে।


Comments

Popular posts from this blog

অভিমানভূম।। শুভদীপ চক্রবর্ত্তী।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

নৈশ অপেরা।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।