শেকল ভাঙার গান।। অলোক সান্যাল।। সুপ্রকাশ।।

রোজকার মতোই দুপুরে একটা বড়োসড়ো গাছের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছে টি৩৭। একটু দূরের ঘাসজমি টপকে জলাশয়। ঝোপের আড়ালে থাকলেও ঘাসের ফাঁকফোঁকর গলে সেদিকে নজর রাখতে অসুবিধা হচ্ছে না। জলাশয়ের দিকে নজর বিছিয়ে শুয়ে আছে সে। জলের ওপর থেকে তিরতিরে ঠান্ডা বাতাস ভেসে আসছে। মন্দ লাগছে না। জলার কাছে জন্মানো রসালো পাতার লোভে হরিণের পাল মাঝেমধ্যেই এসে উপস্থিত হয়। জায়গাটা বেছে নেওয়ার এটাই কারণ। কিছুক্ষণ পর তার অনুমান অভ্রান্ত প্রমাণ করে একটা ছোটো দল হাজির হল। হরিণের পালটা দৃষ্টি সীমানায় ধরা দেওয়ার আগেই টি৩৭ যাবতীয় আলিস্যি ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল। এবার সে স্থির এবং নিষ্পলক চোখে চেয়ে রইল জলাশয়ের দিকে। বাঘিনীরা এমন আভাস আগে থেকে পেয়ে গেলেও তার ছানারা বুঝতে পারে না। নূর এখন ছোটো। তিন মাসের। আরও একটু বড়ো হলে এমন হাজারো না-ফোটা শব্দগুলো সে-ও নিশ্চয়ই টের পাবে।

নূর এতক্ষণ তার ভাই-বোনের সঙ্গে খুনসুটিতে মত্ত ছিল। মাঝেমধ্যে মায়ের নরম পেটে গড়িয়ে পড়ছিল তিনজনায়। খানিক গলা ভিজিয়ে নিয়ে আবার ঝাঁপাই জুড়ছিল। মাকে হঠাৎ উঠে দাঁড়াতে দেখে অবাক হল তারা। নূর 'কুঁই কুঁই' স্বরে মাকে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, শিকারের গন্ধ পেতে টি৩৭ তাকে মৃদু ধমক দিয়ে বলল, 'চুপটি করে থাক দেখি বাছারা। সকাল থেকে চারবার শিকার ফসকেছে। এবারেও যদি হাতছাড়া হয়, বাকি দিনটুকু উপোস করে কাটাতে হবে।'

নূর জানে এ নিছকই কথার কথা। তার মায়ের মতো শিকারি জঙ্গলে অমিল। তবুও আর কথা বাড়াল না সে। ঝোপ থেকে সামান্য পেছনে খোলা জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়াল। মাথাটা অল্প উঁচুতে তুলে ধরে ঢালু জমির ওপরে চোখ রাখল। আর তখনই সে লোকটাকে দেখতে পেল। জন্মের হপ্তা দুয়েকের মধ্যে চোখ খুলে গেলেও, নজর পেতে পেতে তার মাস গড়িয়ে গিয়েছিল। তার পর থেকে গত দু-তিন মাসে বেশ কিছু দু-পেয়েকে নূর দেখেছে। মা বলে, 'ওরা মানুষ।'

মানুষদের মধ্যে এই রোদে পোড়া তামাটে রঙের লোকটাকে নূরের বেশ পছন্দ। 'নূর' নাম যে ওই লোকটারই দেওয়া সে-কথা অবশ্য তার জানা নেই। যেমন অজানা লোকটার নাম।


শেকল ভাঙার গান
অলোক সান্যাল

অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী 

মুদ্রিত মূল্য : ২৫০ টাকা

সুপ্রকাশ
       

Comments

Popular posts from this blog

অভিমানভূম।। শুভদীপ চক্রবর্ত্তী।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

নৈশ অপেরা।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।