বৃক্ষমানুষের ছায়া।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।।
"সদ্য-গড়ে-ওঠা মন্দিরটার সামনে দিয়ে এগিয়ে গিয়ে তাঁরা টালিখোলাটা বেড় দিয়ে অনেকটা পথ পেরোলেন। ভাটার পেছনদিকে মজুরদের ঘর। ঘরগুলো খুব নিচু, মনে হয় প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে সেখানে ঢুকতে হয়। প্রত্যেকটা ঘরে একটামাত্র বেড়ার দরজা, জানালার বালাই নেই। এই সন্ধে-হয়ে-আসা কপিশ বিকেলেও স্ত্রী-পুরুষ মজুরেরা কাঠের ছাঁচে মাটির দলা ঠুসে কাঁচা টালি বানিয়ে চলেছে। কয়েক জন সেগুলোকে মাটিতে সার দিয়ে রাখছে। রুক্ষ-চুলের অনেকগুলো বাচ্চা ধুলোখেলায় মেতে আছে। তাদের দেহাতি শব্দের আনন্দোল্লাস ছড়িয়ে পড়ছে ঈষৎ ভারি হয়ে-আসা শেষ-বিকেলের বাতাসে। ভাটার একেবারে পুব-প্রান্তে মাটির স্তূপে তখনও একটা বড়ো মাটি-কাটা বেঁকো-মেশিন ঘটাং ঘটাং শব্দে মাটি সরাচ্ছে।
ভাটার পেছনে পাড়া-ঘরের এলাকায় ঢুকে আঁকাবাঁকা খান-দুয়েক রাস্তা পেরিয়ে লোকটিকে অনুসরণ করে অনেক লোকের কৌতূহলী চোখে বিদ্ধ হতে হতে তাঁরা ভেঙে-পড়া বেড়া-দেওয়া একটা পরিচ্ছন্ন আঙিনায় প্রবেশ করলেন।
গৌর অনুমান করলেন— এই সেই অগ্নিদগ্ধ গোয়াল ঘর, এখানেই পুড়ে গিয়েছিল বিষাণের বকনা বাছুরটা।
গোয়াল ঘরের ডান পাশে আড়াআড়ি খান-দুয়েক ঘর, বসতঘর হবে— তার ফুটো টালির চালও প্লাস্টিক শিট দিয়ে পুলটিস দেওয়া। বসতঘরের পেছনে, মাথায় টিনের চালা-দেওয়া বেড়ার রান্নাঘরের আভাস নজরে আসে।
আর, প্রবেশের আগেই উঠোনের প্রায় মাঝখানে কাঠের বাটাম দিয়ে তৈরি একটা সাত-পুরোনো কেদারা-টাইপের আসনে বসে থাকা কালো আলখাল্লা-পরা হকিম আলি ফকিরকে দেখতে পেলেন তাঁরা। তাঁর কোলে একটি অস্বাভাবিক বড়ো-সাইজের দোতারা ধরনের তারবাদ্যের যন্ত্র শোভা পাচ্ছে। বিষাণ গুরুকে সম্ভাষণের আগেই ফকির বললেন— 'কী ব্যাপার বল দেকি বিষেণ, এতটা পথ পেরোলাম, এতদিন পরে আলাম— পাড়ার লোকে তেমনভাবে হাসল নে, কথা বলল নে!'
—'সে আনেক কতা, ফকির ঠাকুর। বলব'খন। এতকাল কোতায় ছিলেন?
একন আপনি আলেন কোতা থিকে?'
—'সে কি এক জায়গা থিকে রে! সে আনেক কতা, বলব'খন।'
বিষাণের ভঙ্গি নকল করে বললেন ফকির।
গুরু-শিষ্যের এই চক্র-কথোপকথনে গৌর আর সুনন্দ বেশ মজা পাচ্ছিলেন।
—'শুনছ, কারা আয়েছেন দেখো।' ঘরের দিকে মুখ করে বিষাণ গলা তুলে হাঁকাড় দিল।
—'আরে, চেঁচাস কেনে! মা আমার জন্য ইস্পেশাল চা বানাতেছে।' ভেতর থেকে মেয়েলি-কণ্ঠে উত্তর আসার ফাঁকেই হকিম ফকির শিষ্যকে ধমক দিলেন— 'আগে ওঁদের বসতে দে, হুম্মাভুতুম কোথাকার।'
বিষাণ অ্যাবাউট-টার্ন করে ঘরের ভেতরদিকে চলে গেল, আর চোখের পলকে দুটো টুল নিয়ে এসে গৌর আর সুনন্দর জন্য একেবারে ফকির ঠাকুরের সামনে পেতে দিল।— 'বসুন আপনেরা।' সে ঘরের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
দুই বন্ধু টুলে বসে বুঝতে পারলেন কেদারাটার মতোই এই টুল দুটোর স্বাস্থ্যও মোটেও সুবিধার নয়।
গৌর হাতজোড় করে ফকিরকে বললেন— 'আমার নাম গৌরচন্দ্র আর ইনি সুনন্দ। সহকর্মী, দুই বন্ধু। আমরা ওই গঞ্জতে থাকি।'
হকিম আলি ফকির অতি বিনম্রভাবে প্রতি-নমস্কার করলেন— 'আপনেদের সেলামালেকুম না-দিয়ে প্রণাম জানাই।'
সুনন্দ তাড়াতাড়ি বললেন— 'আমাদের প্রণাম জানাবেন কেন? আপনি সাধক মানুষ!'
—'সাধক?' হাসলেন ফকির। 'জানেন তো আমি ধম্মের লোকেদের কাছে চিরকালের, ওই শিখ-ধর্মীয় পঞ্জাবিরা যাকে বলে "তনখাইয়া”- শিখ, অকাল তন্ত্রের নির্দেশবিরোধী, তাই।' ফকির একটু সোজা হয়ে বসে বললেন— 'আপনেরা ভদ্রমানুষ, আমার বিষেণটার বাড়িতে এয়েছেন! তবে, সক্কলে মিলে বাড়ি কি আর রেকেচে, খণ্ডহর বানায়ে ছেড়েচে। তবু আপনারা আয়েছেন, আপনাগের মঙ্গল হোক।' হাতজোড় করলেন তিনি।
—'আরে, করেন কী, করেন কী।' হাঁ-হাঁ করে উঠলেন গৌর।
—'বিষেণটা চেরকালের বোকা-সরল, ওই যে বললাম, যারে বলে এক্কেবারে হুম্মাভূতুম। দাতাবাবার মেলাতেই খবর পেইচি ইদিককার। ইদিকের একটা লোক ওই ছবি-টবি বিক্কিরি করতে গিয়েছিল মেলায়। সেও প্রায় মাস-ছয়েক আগে। তারপর কর্ণগেড়িয়ার পিরের মোচ্ছবে দেকা হয়ে গেল কানবেড়িয়ার একজনের সনে, সে বলল— বিষেণটা নাকিন কারে পড়ে রয়েচে। আমি ফকিরজাতের মানুষ— মায়া থাকতি নেই। কিন্তু, পরানটা কেঁদে উঠল, বাবা! কোতায় আর সাধনা-টাধনা। তাই চলে আলাম। একেনে এসেই বুঝেছি— লোকে ভালা করে তাকায় না, কতা বলতে ভয় পায়। এ-পাড়ায় সব আড়ে আড়ে চায়, ঠারে-ঠোরে বলে। আর, বিষেণের আঙিনায় ঢুকে তো সব জলের মতো পোষ্কার হয়ে গেল, বাবা।'
সুনন্দ ফকিরের কথা শুনতে শুনতেই সন্ধ্যাভাসিত আলোয় চারপাশটা ভালো করে দেখে নিলেন।
এটাকে বাড়ি বললে বেশি বলা হয়। আঙিনার এককোণে একটা ভাঙাচোরা চালা। বোঝাই যায়— ওটাকে বলপ্রয়োগ করে ভাঙা হয়েছে। সম্ভবত কোনোকালে ওটা গোয়াল ঘর ছিল। বেড়ার দেওয়াল পুড়ে এখানে-ওখানে ঝুলি ঝুলি হয়ে ঝুলছে। তার এককোণটা আবার পুড়ে কালো হিচিং। মূল ঘরের বারান্দার টালির চালাটার ডান দিকের কোণের টালিগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। ভাঙা বেড়ার পাশে একটা টিউবওয়েল, কয়েকটা মলিন ইট আর আধলা দিয়ে তলাটা বাঁধানোর একটা চেষ্টা করা হয়েছে। টিউবওয়েলটার অদূরে একটা কাঁঠাল গাছ। কাঁঠাল গাছের গোড়ায় বিষাণের মাডগার্ডহীন সাইকেলটা ঠেসান দিয়ে দাঁড় করানো রয়েছে। মূল ঘরের পাশ দিয়ে একটা টালি-চালার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সুনন্দ অনুমান করলেন— ওটা বিষাণদের হেঁশেল ঘর হবে।
গৌর তাকিয়ে ছিলেন হকিম আলি ফকিরের দিকে, কোনো কথা বলছিলেন না। এমনিতে দেখে ফকির ঠাকুরের বয়স আন্দাজ করা কঠিন। পঞ্চাশ থেকে আশি— যে-কোনো বয়স বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। মাথার কাঁচা-পাকা চুল ঘাড় বেয়ে নেমে এসেছে। দাড়ি-গোঁফও তার সঙ্গে মানানসই। কিন্তু আশ্চর্য, মুখে বা কপালে একটুও বয়সের চিহ্ন বা বলিরেখা নেই। গলায় সাদা-লাল-নীল-সবুজ-মেজেন্টা বিচিত্র রঙের স্ফটিকের মতো পাথরের মালা। আলখাল্লার ঢোলা ফাঁদের জামার হাতার তলা দিয়ে হলুদ রঙের সুতোর মোটা ধাগা উঁকি দিচ্ছে।
গৌর আর সুনন্দ প্রথমেই ফকিরের মনুষ্য-চরিত্রপাঠের ক্ষমতার পরিচয় পেলেন।
বিষাণ ফকিরের 'ইস্পেশাল চা' এনে দিতে চায়ের গেলাসে চুমুক দিয়ে ফকির মিষ্টি হেসে বললেন— 'কী দেকতেছেন বাবারা, আমার বয়েস? তার আর গাচ-পাতর নেইকো। বিষেণের ঠাকুদ্দা রাধাবিনোদদাদা আর ঠাগমা লক্ষ্মীদিদি বেঁচে থাকতে, তকন তাঁরা একেবারেই বুড়ো হয়েচেন— আমি অল্প বয়সে এই উঠোনে কত সন্দেয় বড়ো বড়ো আসর করিচি, গেইয়েচি কুপি আর হ্যারিকেনের আলোয়।'
ফকিরের কথা শুনতে শুনতে গৌরের মনে হলো— এই আধা-অন্ধকার উঠোনে, এই ভাঙা চালাঘরের আনাচেকানাচে কতকালের কাঁচা-ইতিহাস জমে আছে— মানুষের ইতিহাস! সেখানে এখনও ভাড়াটে পণ্ডিতদের হাত পড়েনি।
—'তেভাগার লক্ষ্মীমণি গো। আমার ধম্মদিদি গো। দেকো দিকি, জেবনের কী কুদরত, তিনি মোগের ধম্মদিদি, কিন্তুক তাঁর ছেলে সুধাবিনোদ মোগের সাঙাত।'
ফকিরের কথার মাঝেই উঠোনের টিমটিমে আলোটা জ্বলে উঠল। ঘরের ভেতর থেকে শাঁখের শব্দ এল ভেসে।"
বৃক্ষমানুষের ছায়া
দুর্লভ সূত্রধর
অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
মুদ্রিত মূল্য : ৩৬০ টাকা
সুপ্রকাশ
Comments
Post a Comment