বৃক্ষমানুষের ছায়া।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।।
"এখনও ভালো করে রোদ ওঠেনি, রাস্তার পাশের ঘাসের ডগায়, রাস্তার পাশ-বরাবর সবজির মাঠে কচি পালং-এর পাতায় ভোররাতের শিশিরবিন্দুগুলো টলটল করছে— এত সকাল বলেই বেশ একটু শীত-শীত ভাব। সুনন্দর পাশে একটা বাহারি ব্যাগ ভ্যানের মেঝেয় রাখা। সুনন্দ জানিয়েছেন— গতরাতে বাড়ি ফিরে বংশীকাকার চিরকুট পেয়ে আবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্টেশনবাজারের খ্যাপা সাহার দোকান থেকে কিনে আনা মিষ্টির প্যাকেটগুলো আছে ওই ব্যাগে।
আজ আর তাঁরা বকবক করছিলেন না— সকালের নরম হাওয়া, রোদের আভাস, সবজিখেতের পেছনে সদ্য আমন ধান কেটে-নেওয়া শূন্য মাঠান জমির বিস্তার, তারও পেছনে কয়েকটা ইটভাটার মোটা বেঁটে চিমনি, মাঝে মাঝে রাস্তার একেবারে ধার-ঘেঁষা বাড়িগুলোর সামনের আঙিনায় ইতস্তত বিক্ষিপ্ত অযত্নের গাছে উজ্জ্বল হলদে থোপা গাঁদা বা তারা গাঁদার গাছ, কয়েকটা সন্ধ্যামণির ঝোপ, কোনো কোনো আঙিনায় প্লট কেটে বেশ যত্ন করে বোনা ডালিয়া-চন্দ্রমল্লিকা-ইনকা-সাদা আর গোলাপি রঙের কৃষ্ণকলি, পিটুনিয়া ফোটানোর চেষ্টা দেখতে দেখতে তাঁরা এগোচ্ছিলেন। রাস্তার পাশে কোনো বাড়ির পাঁচিলের মাথা ছাড়িয়ে ঝুঁকে আছে টগর আর শিউলি গাছের মাথা— বাইরের ঘাসে ঝরা-শিউলির চির-চলিষ্ণুতা।
এইসব দেখতে দেখতে গৌরের চশমার কাচ যেন ঝাপসা হয়ে এল— কী এমন পুণ্য করেছিলেন তিনি যে, এতটা ঘর্মাক্ত-জীবন কাটাবার পর এই অবসরের গোধূলিবেলায় এমন একটা সকাল উপহার পেলেন!
রুমাল বের করে অকারণে চশমার কাচ দুটো মুছে নিলেন গৌর।
কলোনিকালের থেকেও পুরোনো বর্ণ ও বৃত্তি-বিভাজিত গ্রাম দুধপুকুর। গ্রামে অধিকাংশই গোয়ালা ঘোষদের সাতপুরুষের বাস। দেশভাগের পর অবশ্য অন্য বর্ণের এবং অনির্দিষ্ট পেশার লোকে মেশামেশি হয়ে গেছে।
দুধপুকুরে পৌঁছে তাঁরা দেখলেন— সত্যিই নবান্ন উপলক্ষে এখানে বেশ হইহই ব্যাপার।
প্রায়-প্রত্যেকটি বাড়িতে প্রস্তুতি চোখে পড়ছে— বার-বাড়ির উঠোন পর্যন্ত তকতকে করে নিকানো। এতটাই তকতকে যে, বেশ বোঝা যায় আজকের পরিচ্ছন্নতার পেছনে বিশেষ উদ্যম কাজ করেছে! সকালের ছবিটা বাঙালি লেখকদের নবান্নের বর্ণনার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে যেন।
কোনো কোনো আঙিনায় এর মধ্যেই গৃহিণীরা নবান্নের আয়োজনে লেগে গিয়েছেন। অল্পবয়স্ক ছোকরারা নিজেদের বা অন্য কোনো কলাবাগান থেকে কলাগাছ সংগ্রহ করে ধারালো বড়ো ছুরির সাহায্যে খোলা চিরে ছোটো ছোটো নৌকার মতো বানিয়ে ডাঁই করছে।
গৃহিণীরা গামলা থেকে নতুন চাল নিয়ে সেই কলার খোলার মধ্যে ভাগে ভাগে রাখছেন। ভ্যানে যেতে যেতে পূজার উপকরণের ভেতরে সদ্য-ওঠা খেজুর গুড়, গুড়ের মণ্ডা, চিনির কদমা, মঠ, পাথরের বাটিতে রাখা দুধ দেখতে পেলেন। তখনও কোনো বাড়িতে গৃহিণীরা বাড়ির অন্য মেয়েদের সঙ্গে করে ফলমূল কাটা শেষ করতে পারেননি— শাঁকালু, রাঙা আলু, আখ, নারকেলের টুকরো, কলা, নতুন ওঠা খাঁদাপোতার লাল মুলো ইত্যাদি কাটা হচ্ছে। গৌর দেখলেন কমলালেবু, নাশপাতি বা আপেল জাতীয় অভিজাত ফল এখানকার এই দেশজ উৎসবে অন্ত্যজ!"
বৃক্ষমানুষের ছায়া
দুর্লভ সূত্রধর
অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
মুদ্রিত মূল্য : ৩৬০ টাকা
সুপ্রকাশ
Comments
Post a Comment