হামারটিয়া।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।।

সুপ্রকাশ প্রকাশিত শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের উপন্যাস 'হামারটিয়া' পড়ে মতামত জানিয়েছেন সায়ন সরকার। আমরা তাঁর অনুমতি নিয়ে নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি। 
.............................................
হামারটিয়া 
শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য 
সুপ্রকাশ
মুদ্রিত মূল্য ₹৩৫০

গল্পে পরে আসা যাবে, আগে বুঝতে হবে হামারটিয়া মানে কি?? আর সেই মানের মধ্যেও রয়েছে একটা অদ্ভুত ডুয়ালিটি.....যে ডুয়ালিটি বা দ্বিধা মনখারাপের মত ছড়িয়ে রয়েছে এই উপন্যাসের পাতায় পাতায়....যা গ্রাস করেছে এই গল্পের ঘটনাক্রম, চরিত্র এমনকি পাঠক হিসেবে আমাকেও।
প্রাচীন গ্রিক থেকে আসা এই শব্দ হামারটিয়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বোঝায় কোন একটি চরিত্র যখন একটি মারাত্মক ভুল করে বসে অথবা সেই ভুলটি রয়েছে তার চরিত্রের মধ্যেই এবং যে ভুলের জন্য সেই চরিত্রের অবসম্ভাবী পতন হচ্ছে..... এই মানেটাকে ধরে এগোলে পুরো দোষটাই চরিত্রের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু কখনো কখনো হামারটিয়া মানে একটু অন্যভাবেও বোঝানো হয়। সেখানে শুধুমাত্র একটি ভুল বা একটি "এরর অফ জাজমেন্ট" এর জন্যেই গল্পের মুখ্য প্রোটাগনিস্টের পতন হচ্ছে.... সেই বিশেষ ভুলটি নট নেসেসারিলি ওই চরিত্রটিই করেছেন। 

এই ডুয়ালিটি, এই মানের সূক্ষ্ম পার্থক্যটা বুঝতে পারলে গল্পটা নিয়ে এগোতে অনেক সুবিধা হবে, যদি নাও বোঝেন তাও খুব একটা হেরফের হবে না। অনেকেই যারা লেখকের "নৈশ অপেরা" কে ক্রিটিসাইজ করেছিলেন এটা বলে যে সেই উপন্যাসটি বড্ড স্লো বা বোরিং (যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমার কখনোই তা মনে হয়নি), তাদের অন্তত এই উপন্যাসটি নিয়ে সেরকম কোন অভিযোগ থাকার কথা নয়। 

ছোট্ট করে ঘটনাটি বলে দি। ভবানীপুরের একটি বনেদি ফ্যামিলির মেয়ে মালিনী অধিকারী কে ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর মাসে তার বাড়ির বেডরুমে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। গলায় গভীর কাটা দাগ। বেডরুম ভেতর থেকে লকড ছিল এবং দরজা ভাঙ্গার পর মালিনীর পাশে পাওয়া যায় তাঁর প্রেমিক অনিরুদ্ধ কে। পুলিশের জেরায় অনিরুদ্ধ বাবু এই অপরাধটি করেছেন স্বীকার না করলেও, জোরালো ভাবে অস্বীকারও করেননি। তাঁর বক্তব্য অনুসারে দুজনেই মদ ও গাঁজা খেয়ে এবং পাশাপাশি উদ্দাম যৌনতার পরে যথেষ্ট ক্লান্ত ছিলেন এবং তিনি ঘুমোচ্ছিলেন। সেক্ষেত্রে তার পরিষ্কার মনে নেই যে তিনি আদৌ মালিনীকে হত্যা করেছেন কিনা। একে লকড রুম, তার ওপর ঘরের মধ্যেই পাওয়া গেছে আরো একজনকে যার আবার মার্ডার ওয়েপেনের ওপর হাতের ছাপও পাওয়া গেছে। ওপেন এন্ড শাট কেস..... ইনভেস্টিগেটিং অফিসার জাভেদ আহমেদ পাকাপোক্ত চার্জশিট বানিয়ে অনিরুদ্ধকে কোর্টে তোলেন, এতটাই পাকাপোক্ত চার্জশিট ছিল যে অনিরুদ্ধের ডিফেন্স খর কুটোর মত উড়ে যায়। জেল হয় অনিরুদ্ধ এর। 

এরপর কেটে গেছে ২৫ বছর..... জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন অনিরুদ্ধ। ধরা পড়েছে ক্যান্সার, আপন বলতে কেউ আর পাশে নেই। এই অবস্থায় আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি, কিন্তু ঠিক তার আগে একটি চিঠি লিখে যান ইনভেস্টিগেটিং অফিসার জাভেদ আহমেদ কে.... এখান থেকেই শুরু হয় গল্প। 

জাভেদ ডেকে নেন তাঁর এক্স কলিগ ইমানুয়েল গুহ কে.... দুজনেই অবসরপ্রাপ্ত.... একটি ক্লোজড কেস.... তাই বৈঠকি চালেই আনঅফিসিয়ালি দুজনে আবার ইনভেস্টিগেশন চালু করেন। উঠে আসে পুরনো পাপ, উঠে আসে সেই সময়ের তদন্তের ফাঁক ফোকর..... আর সবচেয়ে জরুরী কথা আদতে এটি একটি ক্লোজ ডোর মিষ্ট্রি না ওপেন ডোর মিষ্ট্রি??

একদম ভিনটেজ শাক্যজিৎ...... বৃষ্টিতে ভেজা শহর.....সেপিয়া বা ডার্ক টোন.... কখনো ভবানীপুরের ভগ্নপ্রায় বনেদি বাড়ি আবার কখনো সল্টলেকের নিঝুম একটা বার..... কখনো খিদিরপুরের মুন্সীগঞ্জে একটা ঘুপচি ফ্ল্যাট আবার কখনো বিডন স্ট্রিটের জীর্ণ চারতলা ফ্ল্যাটবাড়ি। হামারটিয়া যেন লেখকের আমাদের শহরটা কে লেখা একটি প্রেমপত্র। এই শহরে....এই গল্পে প্রত্যেকটা চরিত্র নিজের নিজের মতো করে ভেঙে গেছে বা ভাঙছে। প্রত্যেকের শরীরে কোন না কোন রকমের রোগ বাসা বেঁধেছে..... একে অপরের সঙ্গে দেখা হলে তারা প্রথমেই আলোচনা করে সুগার বেড়েছে না কোলেস্টেরল.... লোকে আলোচনা শুরু করার আগে কেউ বলে বসেন ইনফেকশনের জন্য ফেস মাস্ক পরে নিতে। এর পাশাপাশি রয়েছে আরো একটা ব্যাপার, গল্পটা কলকাতায় হলেও ভীষণ রকম ভাবে স্টিফ আপার লিপ ব্রিটিশদের কথাও আমাকে মনে করিয়েছে, এমনই কিছু চরিত্র এখানে নিয়ে এসেছেন লেখক। 

আর ঘুরে ফিরে আসেন চার্লি চ্যাপলিন বা চার্লি চ্যাপলিন সেজে কলকাতার রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো একজন। চিন্তা নেই, উপন্যাসের পরিসর ছোট হলেও সমস্ত প্রশ্নের উত্তর বইয়ের শেষে পেয়ে যাবেন পাঠক.... আর গল্পের ক্লাইম্যাক্স তো পুরো গ্রীক ট্রাজেডি। 

শুধু একটাই প্রশ্ন থেকে গেল..... অনেকদিন আগে লেখকের সাথে যখন কথা হচ্ছিল অন্য একটি বইয়ের প্রকাশ উপলক্ষে তখন তিনি বলেছিলেন একটি বিশেষ সাইকোলজি নিয়ে তিনি ট্রিলজি লিখতে চান..... এই গল্পটার শেষ পরে মনে হচ্ছিল, হামারটিয়া কি সেই ট্রিলজির থার্ড বই?? উত্তর আমার জানা নেই। 

তবে যে উত্তরটা জানা আছে, সেটা হল শাক্যজিৎ ধীরে ধীরে বাংলা সাহিত্যে ইম্পসিবল ক্রাইমের মাস্টার হয়ে উঠছেন।

Comments

Popular posts from this blog

অভিমানভূম।। শুভদীপ চক্রবর্ত্তী।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

নৈশ অপেরা।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।