বৃক্ষমানুষের ছায়া।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।
সুপ্রকাশ প্রকাশিত দুর্লভ সূত্রধরের উপন্যাস 'বৃক্ষমানুষের ছায়া' পড়ে মতামত জানিয়েছেন ফারজানা রহমান। আমরা তাঁর অনুমতি নিয়ে নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি।
..............................................................
বই : বৃক্ষমানুষের ছায়া
লেখক : দুর্লভ সূত্রধর
প্রকাশনী : সুপ্রকাশ
মুদ্রিত মূল্য : ৩৬০ টাকা
শুশ্রূষার সকাল আর আরোগ্যের বিকেলগুলো ঠিকই থাকে। বদলায় না। বদলে যায় মানুষ। ভেতরে ভেতরে ভেঙে যাওয়া মানুষ। তাদের চোখে তাই সেই সকাল এবং বিকেলগুলো হয়ে ওঠে জীবনে যে উদ্দেশ্যর বৃত্ত তার বহু বাইরের কিছু।
স্যানাটোরিয়াম থেকে যায় তখন রূপকথার রাজ্যে।
ঠিক এই চাওয়া আর পাওয়ার মাঝে দুর্লভ সূত্রধরের উপন্যাস 'বৃক্ষমানুষের ছায়া' যেমন একদিকে হয়ে ওঠে বৃক্ষের ছায়া, অথবা স্বপ্নের কোমল টোনের একটা রাস্তা, তেমনি সামাজিক অবক্ষয়েরর রুক্ষ্ণ টোনটুকুও সেই স্বপ্নের রাস্তাটুকু পিচ্ছিল করে তোলে। বৃক্ষপ্রতিম চরিত্রগুলোর পাশাপাশি আগাছাসদৃশ্য কিছু চরিত্রগুলোর ডুয়ালিজম যোগ করে সংঘাতগুলো জোরালে হয়ে ওঠে। বিভাজনগুলিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
তখন উপন্যাসের কোন এক জায়গায় হয়তো হুমায়ূন আজাদও হয়ে ওঠেন প্রাসঙ্গিক। প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে তার কবিতা ”সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে”।
তাই বলে দুর্লভ সূত্রধরের উপন্যাস 'বৃক্ষমানুষের ছায়া' ডিস্টোপিয়ান ঘরনার না, বরং ইউটোপিয়া ঘরনার। সামাজিক অবক্ষয়টা যেমন সত্যি, তার প্রতিষেধক হিসেবে লেখক বলেননি কোন সুপারহিরোদের কথা। মহৎ কোন ব্যক্তিত্ব অথবা কোন রাজনৈতিক অদল-বদলের প্রত্যাশায় চেয়ে থেকে স্বপ্ন দেখার সম্ভাবনাকে সম্ভব বলে উপস্থাপন করেননি। বরং 'বৃক্ষমানুষের ছায়া' এখানে অনেক বেশি সমতল। সমাধান অপ্রাসঙ্গিকও না, প্রাসঙ্গিক মনে হবে। এমন সব দিনেগুলো আমরা খুব বেশি পেছনে ফেলে আসিনি। বর্তমানে দাঁড়িয়ে ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকালে বড়জোড় ৩৫/৪০ বছর পেছনে তাকাতে হবে।
উপন্যাসের সমতল তটে তাই উঠে আসা অবক্ষয়ের রেশটুকু আপেক্ষিক, গল্পের প্রয়োজনেই সেই দৃশ্যটুকু ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিষেধকের নিয়ামকটা নিজস্ব প্রভাব বিস্তারের লক্ষে প্রয়োজনীয় সময়টুকু দিয়েই হয়ে উঠেছে উপন্যাসের মূল সুর। হকিম আলি ফকির, গৌর, সুনন্দ, বিষাণ, হিয়া 'বৃক্ষমানুষের ছায়া' উপন্যাসের চরিত্র হলেও মূল চরিত্র এরা কেউ নয়, বরং তাদের চিত্ত বিকল করা যে অনুভূতি, তাদের মূল্যবোধ এবং চিন্তাধারা হয়ে উঠেছে উপন্যাসের মূল মূল উপজীব্য। অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এক পলকের চাহনির উপলক্ষ।
তেভাগার ইতিহাসের কথা উপন্যাসের বহু জায়গায় উঠে এলেও দুর্লভ সূত্রধর উপন্যাসের পথ-নির্দেশিকা রেখেছেন সেই অবক্ষয়, প্রতিরোধ এবং পুনর্গঠনের দিকে। মানবিকতা সামাজিক অগ্রগতির এবং সামাজিক অবক্ষয় রোধের এক সহজ ও সুন্দর সমাধানের শব্দ দিয়েই সাজিয়েছেন উপন্যাসের সমতল ভুমি। তথাপি যারা সংশয়বাদী, লেখকের শব্দে অনুগত প্রকাশ করে শেষটার মত তারাও বলতে পারেন -
‘‘এইসবই ফিকশনাল-টেরিটরি।’’
দুর্লভ সূত্রধর ‘প্রতিযাত্রা’ দিয়ে পাঠকদের নিয়ে রীতিমত খেলেছেন। ‘বৃক্ষমানুষের ছায়া’ পরবর্তী বই হওয়াতে কিছুটা ভয় ছিল যে প্রতিযাত্রা পাঠের ধৈর্য এখানেও লাগে কিনা। বড় রকমের রিলিফ তা না হওয়াতেই। অনন্যবর্তী, আহাম্মকের খুদকুড়ো এর মতোই সুখপাঠ্য। তবে ‘বৃক্ষমানুষের ছায়া’ ওগুলোর থেকে অনেকটা পিছিয়ে থাকবে অবশ্যই। দুর্লভ সূত্রধর প্রিয় লেখক হয়ে উঠেছেন প্রথম বই থেকেই। তার ধারাবাহিকতা বজায় ছিল সব বইয়েই। ‘বৃক্ষমানুষের ছায়া’ পড়তে আরাম নিঃসন্দেহে। কিছু কিছু জায়গায় দুর্লভ সূত্রধরীয় হয়ে উঠেছে; কিন্তু মোটের উপর অন্য বইগুলো থেকে কিছুটা পিছিয়েই থাকবে এই উপন্যাসটি।
Comments
Post a Comment