তারাপদর জন্মনক্ষত্র।। শতঞ্জীব রাহা।। সুপ্রকাশ।।

একটি মাত্র গল্পকে নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বই বাংলা ভাষায় খুব বেশি আছে বলে মনে হয়ে না। রবীন্দ্রনাথের 'অতিথি' গল্পটিকে নিয়ে আসছে একটি পূর্ণাঙ্গ বই শতঞ্জীব রাহার 'তারাপদর জন্মনক্ষত্র'। আজ রইলো লেখকের ভূমিকা।
...................................
প্রায় তিন দশক পূর্বে এই একই নামে এই রচনাটি ছোটো প্রবন্ধের আকারে রচিত ও প্রকাশিত হয়েছিল একাধিক পত্রিকার পাতায়। পুনঃপ্রকাশের সময় প্রতিটি ক্ষেত্রেই কিছু সংযোজন বিয়োজন ঘটেছিল। পরে, ২০১৯ সালে এটি গ্রন্থাকারে বিস্তারিত হয়। গ্রন্থটি নির্মাণের পরও কয়েকটি ঋতুচক্র পেরিয়ে গিয়েছে। রচনাটির ভরকেন্দ্র বিষয়ে সংশয়ের কারণে তখন গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়নি। কেননা একটিমাত্র গল্পকে কেন্দ্র করে একটি গোটা বই লেখার এমন উদাহরণ আমাদের দেশে খুব বেশি আছে বলে মনে হয় না।

তবু এমন একটি কাজ করা গিয়েছিল তিনি রবীন্দ্রনাথ বলেই। তাঁর সমস্ত রচনা একটি সমগ্রের অংশ বলেই যে-কোনো অগ্রবিন্দু থেকে দেখতে শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত তার অচূর্ণিত সমগ্রকে স্পর্শ করা যায়। বিষয়ের অনুরোধে, লিখন-পরিকল্পনার স্বার্থে, আমরাও সেই সমগ্রের দিকে ইঙ্গিত করতে চেয়েছি, কিন্তু বিস্তারিত হতে পারিনি; বিষয়-সংলগ্ন তাঁর অগণন রচনার কথা আমরা মনে রেখেছি কিন্তু অতি-আবশ্যিক অংশ ছাড়া তার উল্লেখ করতে পারিনি। যেটুকু উল্লেখ করা হয়েছে, সেটুকু-ও রবীন্দ্র-পদন্যাসকে ব্যবহার করে রবীন্দ্রমানসের পটে তারাপদদের অনুধাবন করার চেষ্টা করা হয়েছে। 

'অতিথি' গল্পটি ছয়টি পরিচ্ছেদে বিভক্ত হলেও আয়তনে দীর্ঘ নয়। পরিসর মেপে তো আর ছোটোগল্পের জাতি নির্ধারণ করা যায় না। এর মধ্যে গল্পবস্তু আছে সামান্যই। যেটুকু আছে তার অপরিহার্য গল্প-কথাগুলি তো একটি অনুচ্ছেদেই বলে ফেলা যায়।

'তারাপদর বয়স অল্প', তার জীবনের ইতিহাসও তদনুযায়ী সংক্ষিপ্ত। সেই সংক্ষিপ্ত ইতিহাসকে বোঝার জন্য একটি গ্রন্থ!

তবু তারাপদকে আমাদের পক্ষে বুঝে-ওঠা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।

আমরা, যারা আত্মকেন্দ্রের ভুলভুলাইয়ায় পাক খেতে খেতে মুদিতচক্ষুর বিস্ফারকেই একমাত্র সত্য বলে মনে করি-সেই আমাদের পক্ষেও শিশু তারাপদকে সংগীতসভায় গানের তালে সর্বাঙ্গ আন্দোলিত করে দুলতে দেখে হাস্য-সংবরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বলাইয়ের গাছপালার প্রতি মায়া কিংবা ঘাসের ছেদন-ব্যথায় কাতরতার কথা শুনে 'আমরা' যারা হেসে উঠি-সেই 'আমরা'দের পক্ষেও।

যখন জ্বালাটুকু রেখে গ্রীষ্ম হারিয়েছে তার প্রাখর্য, প্রথম শরতের রোদ ঢাকা পড়েছে আমাদেরই দীর্ঘ ছায়ায়, আম্রমুকুলের গন্ধকে গ্রাস করেছে বাসনা-ব্যসনের রাসায়নিক বাষ্প- যখন মরা-স্বপ্নের ফলাও কারবারে আমাদের এতকালের এই বুড়ো গ্রহটার জল-বায়ু-সমুদ্র নদনদী-জলাশয় গাছপালা-অরণ্য-পর্বত-পশুপাখি ছড়িয়ে থাকা চৌম্বকীয় কম্পাঙ্কগুলি-মানুষ আর মানুষের ইচ্ছেগুলো বিকিয়ে গেছে তখন তারাপদদের কথা কিছুটা বিস্তারে বলতে যাওয়ার মধ্যে অনধিকারীর উপদ্রব থাকার অবকাশ যথেষ্টই আছে।

আসলে এই বইটিকে শুধুমাত্র নিজস্ব পাঠের একটি নিদর্শন বলা যেতে পারে, আর কিছু নয়। বিরাট নক্ষত্রলোক থেকে রক্তাচ্ছন্ন, ক্ষুৎপিপাসাকাতর, উদ্ভ্রান্ত এই পৃথিবীটার কোথায় কতটা আলো আর সংকেত এসে পড়ে, মেরুরেখার থেকে মরুপ্রদেশ-কোথায় জন্মচিহ্নের নির্দায় অভিজ্ঞান নিয়ে জেগে ওঠে তারাপদরা খোঁজ করলে হয়তো তার হদিশ আগামী পৃথিবীতে কোনোকালে পাওয়া গেলেও যেতে পারে।
.......................................
তারাপদর জন্মনক্ষত্র
শতঞ্জীব রাহা

প্রচ্ছদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা ছবি অবলম্বনে

মুদ্রিত মূল্য : ২৭০ টাকা
সুপ্রকাশ প্রকাশিতব্য

Comments

Popular posts from this blog

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।

নৈশ অপেরা।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।।

নৈশ অপেরা।। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।