উত্তরেই যায় চিঠি।। কৌশিক ঘোষ।। সুপ্রকাশ।।
বাগানের দিকে যেতেই এককোণে নয়নতারা গাছটার দিকে চোখ পড়ে তার, যেটা সেই এক বৃষ্টির দিন ভিজতে ভিজতে তারিক খালপাড় থেকে এনে এখানে পুঁতেছিল। উচ্চতা কোমর অবধি বড়জোর, কয়েকটা বেগুনি ফুল ফুটে আছে। কুলগাছে অনেক কুল, কিছু কুল পেকেছে, কেউ বিশেষ আসেনি এবার। লেবুগাছ, কুলগাছ, কুয়া, সবজির খেত, দুদিকের নারকেল, পেয়ারাগাছ ফেলে এগিয়ে যায় নবা পুকুরের দিকে। পরিধি বরাবর গোল হয়ে হেঁটে বেড়ার ওপারে নো ম্যানস ল্যান্ডের দিকে একবার তাকায়। এই জায়গাটা আশ্চর্য, একই রকম অন্ধকার, ছায়াময় মনে হয় এইদিক থেকে। দূরে ক্ষীণ রাস্তার আড়ালে বেলগাছটা অবধি দৃষ্টি যায়। ওদিকে যে কোনো রাস্তা আছে, এখান থেকে টের পাওয়া যায় না।
ঘাটে ফিরে আসে সে, ওপরের পাদানিতে বসে। তারিক কবে আসবে বলতে পারল না মানিক। কোথায় গেছে, রাণীগঞ্জ, পিনকোড কত? তারিককে ঠিকানা জোগাড় করে চিঠি লিখে চমকে দেবে সে? তারিক কি উত্তর দেবে? ঘাটের দিকে ধাপগুলো ডুবে গেছে ফের, দুটো আঁকাবাকা আনাড়ি হাতের লেখার দুটো নাম তৃতীয় ধাপে আছে, সে জানে, আবার জাগবে আগামী গ্রীষ্মে, যখন জল টানতে টানতে চৌচির হয়ে যাবে মাটি। হঠাৎ তার চোখে ভেসে ওঠে একটা অলীক দৃশ্য, সেই কবেকার এক প্রখর গ্রীষ্মের দুপুরে তারিক সদলবলে খালি গায়ে তাদের দাওয়ায় এসে পৌঁছাল। হঠাৎ ধড়াম করে মাটিতে আছাড় খেয়ে উল্টে ছটফট করতে করতে ছড়া কেটে কেটে বলতে লাগল, 'দে ধড়াধড় পানি দে, দে ধড়াধড় পানি দে, ছাওরা দিবার কানি দে।' গোটা পাড়া জমে গেছে, মানসী, চারু শঙ্কিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, আছাড়ি পিছাড়ি খেতে খেতে তারিক কীসব বলে যাচ্ছে, নবা ভাবছিল, তারিকের কী হলো, চারু ভেবেছিল, বুঝি ভর করেছে কোনও অপদেবতার। সঙ্গে যারা ছিল, একজন তার গায়ে বালতি থেকে জল ঢালতে লাগল, তারিক ছটফট করতে করতে আবার চেঁচাতে লাগল, 'দে ধড়াধড় পানি দে, খুড়ি দুটি মুড়ি দে—'। কিন্তু, কিছু পরেই সে স্বাভাবিক উঠে দাঁড়াল। লাজুক ভঙ্গিতে বলল, 'কাকি, মুড়ি আর পয়সা দাও।' তারপর মানসীর কাছ থেকে মুড়ি আর পয়সা সহ তার দলবল নিয়ে আবার চলে গেল অন্যত্র।
আরেকবার মিনিমার্কেটে সে আর তারিক, কতকাল আগে একটা অন্যরকম যাত্রাদল দেখেছিল, যে দলটা নিউ তরুণ অপেরার থেকে চরিত্রে অনেক পৃথক, 'রূপবান' বলে একটা পালা করেছিল তারা, হামিদাপুত্র সাদিকুল দর্শকদের মধ্যে ছিল। তারিক গিয়ে সাদিকুলকে বলছিল, 'সাদিকভাই, এদেরকে আমাদের পাড়ায় লিয়ে আসো না।' মহল্লা ঘুরে ঘুরে চাঁদা তুলেছিল সাদিকুল, সঙ্গে তারিক, রাতে নবাদের দাওয়ার উপরে পালা হয়েছিল। পুরো যাত্রাদলটা দু-দিন আশ্রয় নিয়েছিল নবাদের বাইরের ঘরে। বস্তুত দলটা আদতে একটা গোটা গ্রাম, এভাবেই তাদের উপার্জন। বালক নবা প্রত্যক্ষ করেছিল, যাত্রার মূল নায়িকা তার শিশুকে একটি অন্তরাল রচনা করে পালায় নামার আগে ঘরের এক কোণে লুকিয়ে স্তন্যদানরত। তাদের মূল কর্ণধার একটা গাঁট্টাগোঁট্টা প্রৌঢ় লোক, পালার আগে গালে নকল দাড়ি লাগাতে লাগাতে মানসীর দেওয়া মুড়ি খেতে খেতে বলেছিল, 'আপনারা তো ঘোষ, চাষা সদগোপ তো? আমরা ক্ষত্রিয়।'
লোকটির এই উচ্চারণে নিহিত অহংকার ধ্বনিত হয়েছিল, নবা সেই বাল্যেও পড়তে পেরেছিল।
তারপর সেই দল তাদের ঘরে বসে পালা শুরু হওয়ার আগে সমস্বরে গেয়েছিল, 'জয় রাধে রাধে, গবিন্দ গবিন্দ, গবিন্দ, গবিন্দ, বলো রে।' সান্ধ্য সুর আর সেই কোরাসটুকু কানে বাজে নবার।
রাত জেগে দর্শকদের মধ্যে বসে পালা দেখেছিল নবা, শুনেছিল, একটা গান, পাড়ায় হিট হয়ে গিয়েছিল— 'আমি যে রেশকাওয়ালা, তুমি কি আমার হবে?' আর তারিক, সে কোথায় ছিল তখন? কবে সেই যাত্রার দল, কোত্থেকে, কোন গ্রাম থেকে এসেছিল, কোথায় গিয়েছিল? নবা কি জানতে পারবে সেই লোকগুলোর পিনকোড?
....................
'উত্তরেই যায় চিঠি' থেকে
কৌশিক ঘোষ
....................
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত
মুদ্রিত মূল্য : ২৫০ টাকা
সুপ্রকাশ
Comments
Post a Comment