উত্তরেই যায় চিঠি।। কৌশিক ঘোষ।। সুপ্রকাশ।।
বল্লভপুর-পার নবা কিছুটা সচেতন ছিল, হরি সিনেমা পার করে ভেবেছিল এবার বুঝি পাপিয়া সোজা চলে যাবে। সেক্ষেত্রে, তার পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হতো, হে পাঠক, নির্ণয় করা দুরূহ। এক্ষেত্রে মাত্র দুটি সম্ভাবনা ছিল, এক্ষেত্রে বিবেচনা বলে, নবা তার গন্তব্যনির্ধারিত বাঁদিকের সরু গলি ধরবে, কিন্তু অন্যথায় যদি পাপিয়া অন্য রাস্তাটি ধরত সেক্ষেত্রে অনুসরণকারী, এড্রিনাল সার্জ বিচলিত নবা, সচেতন বা অচেতন, হয়ত বা পাপিয়ার পিছু পিছু নতুনবাজারগামী সোজা রাস্তা ধরত। কিন্তু নবাকে বিস্মিত করে টাউন স্কুল হতে আনুমানিক তিরিশ সেকেন্ড পর পাপিয়া হরিসিনেমার চক পার করে অতি সরু বামদিকের গলিতে সহসা অদৃশ্য হয়ে যায়। এতে নবার পরবর্তী সম্ভাবনাময় জার্নির কথা ভেবে নবা যারপরনাই পুলকিত হয়, কেননা এটি নবার বাড়িগন্তব্যের নির্ধারিত ও হাঁটাপথে আনুমানিক মিনিট কুড়ির প্রলম্বিত পথ। কিন্ত, অকস্মাৎ গলিতে অন্তর্হিত পাপিয়াকে দেখতে না পেয়ে তার প্রত্যাশী চোখ ঈষৎ মুষড়ে পড়ে, সুতরাং সে গতি বাড়াতে প্রয়াসী হয়। এই দীর্ঘতর অতিসংকীর্ণ গলি মূল রাস্তা হতে ভেতরে সেঁধিয়েই ডাইনে তুমুল বিসর্পিল, তাই নবা ঢুকেই পাপিয়াকে দেখতে অসমর্থ হয়। বেপরোয়া নবা গতি আরও বাড়ায়। গলির পরবর্তী দুটি বক্রচাপ দ্রুত মেরে ফেলা তার গতি এরপর তাকে কাঙ্খিত দৃশ্য পুনরায় এনে দেয়, সামনে পাপিয়া একই ভঙ্গিমায় হেঁটে চলেছে, এখন কমে এসেছে দুজনের দূরত্ব।
এবার নবাকে নিরাপদ দূরত্ব নির্মাণার্থে গতি কিছু কমাতে হয়। সে কিছু শ্লথ হাটতে থাকে। অতঃপর পাপিয়ার বেণীদৃশ্য ও স্থির হেঁটে চলার ছন্দ তাকে এমনই মুগ্ধতা এনে দেয়, নবা বস্তুত টের পায় না, কখন আগামী মিনিট সাতেকে সে নিঃশব্দে পার হয়ে যায় যথাক্রমে ব্রজপল্লী, ঘটিবাবুর বাগান। রাস্তা প্রথমে ডানদিক ও পরে বাঁদিকে ঈষৎ মোচড় দেয়, নবা স্বপ্নাবিষ্টের ন্যায় হেঁটে যেতে থাকে, খিরিষতলা শুরু হয়।
কিন্তু, অবিলম্বে তার এই ঘোর কেটে যায়। ‘কী রে নবা!’— বলে জোরে চেঁচিয়ে ওঠে কেউ, সে চমকে ওঠে। তার পথ প্রায় আগলে দাঁড়ায় উল্টোদিক হতে একটি সাইকেল, সে রাজুকে দেখতে পায়। সাইকেলে বসা অবস্থায় এক পা প্যাডেলে রেখে নিচে পায়ে ঠেক দিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করে হাফপ্যান্ট ও রংচটা টিশার্ট পরিহিত রাজু বলে, ‘কদিন মাঠে আসিসনি কেন?’ নবার চোখ পাপিয়ার হাঁটার দিকে ফিরতে চায়, তাড়াতাড়ি কথা শেষ করতে চায়। কিন্তু সদরঘাট গান্ধিঘাট টিমের ক্যাপ্টেন রাজু, সামনের রোববার নতুনবাজারের সঙ্গে আগামী ম্যাচ ও সেই সংক্রান্ত যতেক পরিকল্পনা নিয়ে অবিলম্বে জরুরি আলাপ শুরু করে দেয়। নবা পালাই পালাই করতে চায়, কিন্তু রাজু কেড়ে নেয় তার দুর্মূল্য ও জরুরি তিনটি মিনিট। অব্যাহতি পেয়ে সে দ্রুত গতিতে হাঁটা শুরু করে। কিন্তু সামনের রাস্তায় আর পাপিয়াকে দেখা যায় না, বরং চোখে পড়ে অনভিপ্রেত, আধচেনা ঘরবাড়ি, লোকজন। কার্যত হতাশা নিয়ে তাকে বাকি পথ বাড়ি ফিরতে হয়।
....................
'উত্তরেই যায় চিঠি' থেকে
কৌশিক ঘোষ
....................
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত
মুদ্রিত মূল্য : ২৫০ টাকা
সুপ্রকাশ
Comments
Post a Comment