উত্তরেই যায় চিঠি।। কৌশিক ঘোষ।। সুপ্রকাশ।।

সন্তুদার  শেষ চিঠি এসেছিল দিন পনেরো আগে। ওর কলকাতার বন্ধুরা বেড়াতে চায় এখানে, নিয়ে আসবে, চিঠিতে লিখেছিল। কলেজ স্ট্রিট, টবিন রোড, এইসব জায়গার কথা থাকে। নবা একবারই কলকাতা গেছিল। নিমাই পার্টির একটা জমায়েতে নিয়ে গেছিল তাকে আর রাণীকে, তখন নবার ক্লাস এইট। ট্রেন ছুটছে কোলাঘাট ব্রিজের ওপরে, ঝম ঝম শব্দ, তারপর ট্রেনটা একটা জায়গায় বাঁক নিয়েছিল, পথ ফুরাতেই চায় না আর। সে ট্রেনের জানলা থেকে বিস্ময়ে দেখেছিল পাওয়ার প্ল্যান্টের গা থেকে কুয়াশার মত কী যেন উঠছে, ঠিক ধোঁয়া নয়, যেন মেঘ, নাকি ঘনকুয়াশা, উড়ে যাচ্ছে। দুদিকের কত জনপদ আর কত স্টেশন পার করে শেষে ট্রেন থেমেছিল। হাওড়া স্টেশন থেকে মিছিলে হাঁটতে হাঁটতে একটা জায়গায় মিছিল এসে দাঁড়িয়েছিল, ওফফ এত লোক সেখানে... আর চতুর্দিক থেকে বাস, গাড়ি—নবার ভয় হচ্ছিল, সে নিমাইয়ের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করছিল আপ্রাণ। সেই মিটিংয়ে অনেক নেতা এসেছিল, নিমাই নাম বলছিল, দেখাচ্ছিল তাকে আর রাণীকে, সেসব নাম তার আর সব ভাল করে মনে নেই। একসময় নিমাই বলল, রাণী, ওই দ্যাখ, মৃণাল সেন। নবা দেখেছিল, মৃণাল সেনের জুলফির কাছটা খড়ির মত ঘষা। একটাই সিনেমা সে দেখেছিল মৃণাল সেনের, মামাবাড়িতে, চুরাশির ভোটের সময় টিভিতে মাঝে মধ্যে দেখাত সব, খণ্ডহর, খচখচ ফটো খিঁচতে হ্যায়,  নাসিরুদ্দিনের হাতে একটা ক্যামেরা, শুধু ছবি তোলে, একটা ভাঙ্গা বাড়িতে শাবানা আজমি।  ভোটের বুলেটিন রাতভর হতো, আর মাঝে মধ্যে সিনেমা দেখাত। রাণী তখন সবে কলেজে ঢুকেছে, উত্তেজিত হয়ে উঠছিল এতসব সিনেমা দেখে। চাপদাড়ি প্রণয় রায় আর বিনোদ দুয়া ভোটের রেজাল্ট দেখাত। একটা লোক ছড়ি হাতে দেখাচ্ছে ভারতের ম্যাপ, আর গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে শুধু কংগ্রেস আর কংগ্রেস। ইন্দিরা হাওয়া। সেই, সেই বছর তার মনে আছে তখন তার ক্লাস সেভেন, প্রসেন তখন কচি গলায় গেয়ে উঠত—মঙ্গল দীপ জ্বেলে। তখন তারা— তোতন, প্রসেন, নবা,  ডাকটিকিট জমাত। এক বিকেলে রাণী আর তৃষ্ণাদির সঙ্গে কার একটা বাড়িতে বিকেলে পূজা হচ্ছিল, নবাকে ওরা নিয়ে গেছিল, সেখানে নমিতাদি বলে একজন, তৃষ্ণাদিদের বাড়িতে আসে, মুখে অনেক পাউডার মেখে শাড়ি পরে সেজেগুজে বসে আছে, বলল, ইন্দিরা গান্ধীর গুলি লেগেছে, স্ল্যাইন চলছে এখন, শুনিসনি? স্ল্যাইন শব্দটা উচ্চারণগুণে নবাকে আকৃষ্ট করেছিল। পরে ইন্দিরা গান্ধী মরে যাওয়ার পর গোষ্ঠগোপালের গান খুব বাজত, এখনো মাঝে মাঝে বাজে—অক্টোবরের একতিরিশে, উনিশশো চুরাশি। তারপর রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী । তোতনের খাতায় একটা রাজীব গান্ধীর ছবি আছে, লেখা: ভারতবর্ষ কে কোণে কোণে মে...তারও অনেক অনেক আগে মনে আছে মামাবাড়িতে মেঝেতে আসনে খেতে বসেছে তারা, রেডিও বাজছে, দুপুর কী রাত সেটা মনে নেই, মনে হয় দুপুর: দাদু আর ছোটমামা বসে আছে, খবর চলছে রেডিওতে, হঠাৎ খেতে খেতে, খবর শুনতে শুনতে দাদু বলল: সঞ্জয় গান্ধী মারা গেছে। বিমান দুর্ঘটনায়। মনে হয়, এর কিছু আগে বা পরে, নবার তখন ক্লাস থ্রি বা ফোর হবে, খড়কপুরের সেরা স্টেডিয়াম না কোথায় একটা ভিড় ভিড়াক্কার জনসমুদ্রে সাত বছরের নবাকে কাঁধের ওপরে তুলে নিয়েছিল নিমাই। হঠাৎ মাইকে কেউ বলতে লাগল, আপনারা শান্ত হয়ে বসুন, জ্যোতিবাবু এসে গেছেন, জ্যোতিবাবু এসে গেছেন, হঠাৎ কী যে হলো, একটা ঢেউয়ের মত শব্দে বিস্ফোরণে ফেটে পড়ল জনতা, সে দেখেছিল, স্টেজে, মুখটুখ কিছু বোঝা যাচ্ছিল না, কিন্তু হাত নাড়ছে অনেক দূরে মঞ্চের ওপর একটা ধুতিপাঞ্জাবি পরা লোক, বুঝতে পেরেছিল সে।
....................
'উত্তরেই যায় চিঠি' থেকে
কৌশিক ঘোষ
....................
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত

মুদ্রিত মূল্য : ২৫০ টাকা

সুপ্রকাশ



Comments

Popular posts from this blog

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।

আমার রবীন্দ্রনাথ, আমাদের। আলাপ বিলাপ। স্বপ্নময় চক্রবর্তী

পাথারে। সেকালের চিত্র চরিত্র