উত্তরেই যায় চিঠি।। কৌশিক ঘোষ।। সুপ্রকাশ।।

এগোয় নবা। গলিপথ ধরে। যখন সে পৌঁছয় দেখে প্রায় সবাই এসে গেছে, মেয়েদের জায়গাগুলো নির্দিষ্ট, ছেলেদেরগুলো বদলে বদলে যায়, যে আগে যাবে সে নিজের পছন্দের জায়গা দখল করে। শুধু বিবেক নিজের জায়গার ব্যাপারে চেঁচামেচি করে।
আজ একদম কৌণিক ও দূরবর্তী অবস্থানে পাপিয়া। একবার কি তাকাতে চাইল এদিকে? হতে পারে, নাও পারে। আগেরদিন যে নবা তার পেছনেই ছিল, টের পেয়েছে? কাউকে বলবে? কিন্তু, নবারই বা কী করার ছিল? সে তো বাড়িই যাচ্ছিল।
হলুদের বাটি নিয়ে আসেন দীপেন স্যার। একটা কাঁচা হলুদের টুকরো চেবান, বাটিটা একপাশে রাখেন। শতরঞ্জিতে বসেন।
যারা ক্লাস নাইনের, আর ক্লাস টেনের যারা তারাও দেখো, হয়ত আগে পড়েছ, নিউটনের গতিসূত্র তো আগের দিন কিছুটা হয়েছে।
নবার মনে পড়ে, আজ এডিশনাল ফিজিক্সের দিন।
একজনের খাতা টেনে নেয় দীপেন স্যার, সবাই খাতা পেন খুলে বসে।
ত্বরণের একক কী? দীপেন স্যার শুধান।
মিটার ভাজিত বর্গ সেকেন্ড ।
বর্গ সেকেন্ড কেন এলো? এটা কিন্তু বোঝা দরকার। কেউ বলো, আশেপাশে তাকায় দীপেন স্যার।
উত্তরটা জানে নবা। কিন্তু মুখ খুলতে চায় না।
কোণার দিকে একবার চোরা চোখে তাকায়, পাপিয়া মুখ নিচু করে আছে। নবার দিকে, এই মুহূর্তে একটা বিষদৃষ্টি হানে ডলি। ভয়ে নবা চোখ নামিয়ে নেয়।    
উত্তর দেয় না কেউ। দীপেন স্যার হলুদ চিবান একটু। একটা অংক করো তো সবাই, দেখি কে কতটা করতে পারছে, বইটই না দেখেই মনে মনে অংক দেন: একটি বস্তুর প্রাথমিক গতিবেগ এক মিটার পার সেকেন্ড ও ত্বরণের মান দুই মিটার প্রতি বর্গ সেকেন্ড হলে, পাঁচ মিনিটে তার অন্তিম গতিবেগ নির্ণয় করো, একটু থেমে দীপেন স্যার হলুদ চিবান, চিবাতে চিবাতে, আরও লেখো, বস্তুটি  কত দূরত্ব অতিক্রম করবে?
কী বললেন, আরেকবার বলুন স্যার। কে একটা বলে।
এই সময়ে বস্তুটি কত দূরত্ব অতিক্রম করবে?
দীপেন স্যার ভেতরে চলে যায়। ওদিক থেকে বিবেক পাশের ছেলেটাকে বলে, কী রে পারবি?
ছেলেটা পেনটা থুতনিতে ঠোকে।
নবা অংকটা করতে চেষ্টা করে। প্রথম ফর্মুলাটা মনে আছে তার, ভি ইকুয়াল টু ইউ প্লাস এফটি। ফেলে দিলেই হয়ে যাবে মনে হচ্ছে। কষতে কষতে গুণ যোগ করে যায়। ধুর মুখে মুখে হয়ে যায় অংকটা। কিন্তু পরের ফর্মুলা টা কী যেন, ইউ প্লাস এফটি স্কোয়ার? কী একটা গন্ডগোল হচ্ছে যেন। আপাতত মান বসিয়ে দিই, নবা গুণ করতে থাকে।
আনসার কত এসছে রে? নবাকে জিজ্ঞেস করে মুখোমুখি বসা ছেলেটা।
প্রথমটা না দ্বিতীয়টা?
প্রথমটা?
এগারো।
আমারও এগারো এসচে। দ্বিতীয়টা?
পঞ্চান্ন।
আমার তো ছাব্বিশ এসছে।
কারুর উত্তর কারুর সঙ্গে মেলে না। 
ডলি একবার পাপিয়াকে জিজ্ঞেস করে, তোর কত এসছে?
পাপিয়া ধীরে কী একটা বলল। নবা শুনতে পায় না, তার প্রখর শ্রবণইন্দ্রিয় আজ অবধি পাপিয়াকে শোনেনি।
হঠাৎ নবার মনে হয়, সে যে পাপিয়ার পিছু পিছু হাঁটছিল, তাদের গতিবেগ কত ছিল? দূরত্ব তো তাদের মোটামুটি এক ছিল, কারুর কি ত্বরণ ছিল? কেউ তো তাদের বাইরে থেকে বল প্রয়োগ করেনি। নিজের থেকে তবে হাটল কী করে? তাহলে যে বাহির হইতে বল না প্রয়োগ করিলে স্থির বস্তু স্থির থাকিবে, সচল বস্তু সম বেগে সরলরেখা বরাবর চলিবে। পি ইকুয়াল টু এমএফ হলে এখানে বাইরে থেকে কে কাকে বল দিচ্ছে? কেমন একটা গুলিয়ে যেতে থাকে সব। 
ধুর কখন তারা সরলরেখা বরাবর চলল? রাস্তা তো বারবার আঁকবাঁক নিয়েছে। কাকে জিজ্ঞেস করবে এসব? দীপেন স্যারের কাছে প্রশ্ন করতে ভয় লাগে তার, কেউ প্রশ্ন করলে তার দিকে এমনভাবে বিবেক তাকায়, যেন প্রশ্নকর্তা অন্যায় করছে কোনো। 
দীপেন স্যার ফিরে আসে, বাটিতে মুড়ি। এর ওর খাতা দেখে, ভুল ঠিক করে দেয়। নবার খাতার ফর্মুলা ঠিক করে, তাছাড়া মিনিটে সময়ের একক ঠিক নেই।
....................
'উত্তরেই যায় চিঠি' থেকে
কৌশিক ঘোষ
....................
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত

মুদ্রিত মূল্য : ২৫০ টাকা

সুপ্রকাশ


Comments

Popular posts from this blog

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।

আমার রবীন্দ্রনাথ, আমাদের। আলাপ বিলাপ। স্বপ্নময় চক্রবর্তী

পাথারে। সেকালের চিত্র চরিত্র