উত্তরেই যায় চিঠি।। কৌশিক ঘোষ।। সুপ্রকাশ।।

সাফাইকার্যে নিযুক্ত লোকজনকে কাজে লাগিয়ে ব্যস্ত নিমাই দৃশ্য হতে চলে যায়,  নবা দুরুদুরু বক্ষে কুয়ার অনতিদূরে দাঁড়িয়ে থাকে। অনতিবিলম্বে কাজে লাগা লোকজনের মেহনত শুরু হয়, রজ্জুবদ্ধ, ও, একটি সাফাইউপযুক্ত কাঁটা নামানো ও তোলা হবে দফায় দফায়। প্রথম দফাতেই, উপস্থিত কর্মীদের, ও, উদ্বিগ্ন, অপেক্ষারত নবার চোখে পড়ল একটি  দৃশ্য:  কুয়া থেকে উঠে এলো উঁচিয়ে থাকা লোহার ঊর্ধ্বমুখী কাঁটাআবৃত রাজ্যের ভেজা পচা পাতা, কিছু ডালপালা, আবর্জনা, ও, জলে ভেজা একটি বই। কিন্তু তার চেয়েও আশ্চর্য, পাতার স্তূপেই কাঁটাটি বেষ্টন করে আপ্রাণ বেরিয়ে আসতে চাইছে একটি সরু আকৃতির কালচে ও ডোরাদাগের সাপ, আপাতত যে অপারগ ও অসহায়। সাপটিকে কাঁটা হতে বের করতে চেষ্টা করে নাকাল হচ্ছিল উপস্থিত সবাই। অনেক খোঁচাখুঁচি করে কাহিল সাপটি বেরোনোর পর একজন মারতে উদ্যত হলে বাকিরা, সাপটি নিতান্ত বিষহীন, এই মর্মে সরীসৃপটিকে রেহাই দেয়, সাপটি বাগানের ইতিউতি বিস্তৃত ঘাসজমি বেয়ে  বাঁদিকের বেড়া বরাবর দ্রুত পালাতে সক্ষম হয়।
       
এর পর পাতা ও সংশ্লিষ্ট আবর্জনা পাশের জমিতে মিস্ত্রিরা রাখামাত্রই নবা জলে ভেজা ও খানিক ফুলে ফেঁপে ওঠা বইটি আপাতনির্দোষ ভঙ্গিতে আলগোছে তুলে নেয়, উপস্থিত বাকিরা বইটি নিয়ে আদৌ ভাবিত ছিল না, তারা কাজে মনোযোগী ছিল। অতি সন্তর্পণে নবা বইসমেত কুয়াকে পেছনে ফেলে অগ্রসর হয় ও  নিমাইনির্মিত তাদের এল-আকৃতির পুকুরের পরিসীমা ধরে বাগানের অন্তিম প্রান্তে দ্রুত পৌঁছে যায়। এরপরে বাগানের ওপারের সীমানার বাঁশ ও কঞ্চির বেড়া পার হওয়ার অংশটুকু তার পক্ষে বস্তুত ছিল কিছু সময়সাপেক্ষ ও দুরূহ। এই প্রয়াসে কাঁটা ও কঞ্চিতে তার হাঁটু ছড়ে যায়,  কোনক্রমে লাফ দিয়ে সে এসে পড়ে বাগানের ওপারে।         

বাগানের ওপারের এই ত্রিসীমানা প্রকৃত প্রস্তাবে পাথরআড়া, বীরেন পল্লী ও ইমলিতলা, এই তিন এলাকার সংযোগকারী আভ্যন্তরীণ এক কার্যত জনশূন্য এলাকা, বস্তুত এক নো ম্যানস ল্যান্ড, আদতে খাসজমি: দৃশ্যমান একটি নিম, একটি শিমুল ও একটি বেলগাছ, ঘাস, গুল্ম ও ঝোপঅধ্যুষিত অঞ্চলটি গবাদি পশুদের নিশ্চিন্ত চারণভূমি। চোখে পড়ে কিছুদূরের এক মেঠো ক্ষীণ রাস্তা যা পাথরআড়া হতে ইমলিতলা যাওয়ার, যানবাহন যাতায়াতের অযোগ্য এক দুরূহ শর্টকার্ট । বাগানের বেড়ার কাছাকাছি অবস্থিত ক্ষুদ্র বাঁশঝাড় ও ঝোপঝাড়বেষ্টিত একটি মাঝারি আকৃতির কচুরিপানা ও শ্যাওলাআচ্ছন্ন পুরাতন, পান্ডববর্জিত পুকুর। নবা এই অস্বস্তিকর, অথচ, আশ্বস্ত নৈর্জন্যে এসে একাকী ভাবতে থাকে তার পরের অবশ্যকর্তব্য। ভাবতে ভাবতে দিশাহারা নবা পানা সরিয়ে বিছুটি দংশন সয়ে পুকুরে অকস্মাৎ নেমে পড়ে ও তার দুই পা অবিলম্বে প্রাচীন কাদায় গেঁথে যায়। এই অব্যবহার্য স্নানঅযোগ্য পুকুরে কোনো বাঁধানো স্থায়ী ঘাট নেই, ফলে তাকে একরকম হ্যাঁচড়প্যাঁচড় করে নামতে হয়েছিল। তাকে ঘিরে ধরে কচুরিপানার দল, পা আটকে ধরে পাতাঝাঁঝি, হাফপ্যান্টে মাখামাখি হয়ে যায় দল-শ্যাওলা, চতুর্দিক থেকে উপর্যুপরি আক্রমণ করে চলে যুথবদ্ধ ও বদ্ধপরিকর মশককূল। প্রায় কোমর ছুঁতে চায় জল, সে বইটিকে জল ও পাড়ের মধ্যবর্তী ঢালু, আনতজমিতে কোনমতে রেখে জলের খানিক উপরিভাগে নরম ভেজা মাটি দুই রোগা হাত দিয়ে খোঁদল করতে শুরু করে। একটি মাটিতে গেঁথে থাকা টালির টুকরো সে খুঁজে পায়, তাই নিয়ে খুঁড়তে খুঁড়তে, ও, মাটি তুলে সরাতে সরাতে নবা লক্ষ্য করে, মাটির দেওয়ালে কর্মরত তার দুই হাতের পাশে সাপ থাকার উপযোগী একটি খতরনাক ও সন্দেহজনক গর্ত। তাকে ক্রমাগত আক্রমণ করে যায় মশার ঝাঁক, মাটি টেনে তুলতে তুলতে তার হাত ও নখগুলি টনটন করে ওঠে, কিন্তু ভ্রূক্ষেপহীন নবা তখন এক অক্লান্ত নতুন প্রস্তর যুগের শ্রমিক, পরম ধৈর্যে স্বীয় খননকার্য চালিয়ে যায়। খুঁড়তে খুঁড়তে তার হাতে উঠে আসে অজানা গুল্মের নরম শিকড় ও মাটি কামড়ে থাকা ঘুম থেকে জাগ্রত, অসন্তুষ্ট ও শিউরে ওঠা কেঁচো।  কিছু পরে সে সফল হয়। বইটিকে টেনেটুনে দুতিনভাগ করে মাটির ভেতরে তার শবদেহ গুঁজে দিতে দিতেই ছায়াময় ও পরিত্যক্ত পুকুরে কোমর জলে দন্ডায়মান নবা পরম বিস্ময়ে নিরীক্ষণ করে যে, এতদিনের কুয়ার গহীন, অশীতিপর অন্ধকার সহ্য করে বইটির কোনও এক খোলা পাতার বড় বড় অক্ষরে মুদ্রিত ও সবিশেষ জলস্নাত ‘নীতার যৌবন’— নামক গল্পশিরোনাম, কী আশ্চর্য, এখনো অটুট।
....................
'উত্তরেই যায় চিঠি' থেকে
কৌশিক ঘোষ
....................
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত

মুদ্রিত মূল্য : ২৫০ টাকা

সুপ্রকাশ

Comments

Popular posts from this blog

লেটারপ্রেসের কম্পোজিটর।। এক বিষাদান্ত পরম্পরা।। অনন্ত জানা।। সুপ্রকাশ।।

আমার রবীন্দ্রনাথ, আমাদের। আলাপ বিলাপ। স্বপ্নময় চক্রবর্তী

পাথারে। সেকালের চিত্র চরিত্র