দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা ।। অনন্ত জানা ।। সুপ্রকাশ।।
দেওয়ালে লেখা থেকে কাগজের পোস্টার— এই গঞ্জের এমনতর কাজের সব কিছুই এতকাল ধরে যতীশ আর শিবেশই করে এসেছে। কিন্তু সে-সবই বিনা পয়সায় বেগারস্বরূপ। এমন কী পাড়ার কাকিমা, বৌদিরা তাঁদের ইস্কুলে-পড়া বাচ্চাদের ওয়ার্ক এডুকেশনের খাতা, সদরে বিটি পড়া ভাইপো-ভাইঝিদের লেসন প্ল্যানের খাতা, প্র্যাকটিস-টিচিংয়ের পোস্টার— সেসবও বিনি মাগনায় করিয়ে নিয়েছেন। মিষ্টিকথার দাম বা অ্যামেচারের হদ্দমুদ্দ যাকে বলে। বিনিময়ে প্রাপ্য শুধু হাসি। প্রথম প্রথম দেয়াল লেখার মুন্সিয়ানা দেখে নেতারা পিঠ চাপড়াতেন, প্রশংসাও করতেন। ইদানীং সেটুকু করাকেও তাঁরা বাহুল্য বলে মনে করেন।
এই দুজনের স্থায়ী কোনো পেশা না-থাকায় দুবেলা বাড়ির বাইরে দু-কাপ চায়ের পয়সা জোটাতে দুই শিল্পী (যাদের বাপ-জ্যাঠা-কাকারা, এমন-কী আড়ালে-আবডালে সহযোগী কর্মীরাও শিল্পীর বদলে ঝুলপি বা কুলপি বলে থাকেন) একেবারে জেরবার।
তবে যতীশ আর শিবেশের ক্ষেত্রে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর উদাহরণ নিতান্তই খাপ খায় না। কেননা তাদের দুজনের কারোর ঘরেই খাবারই নেই! যতীশের বাপের মৃত্যুর পর তাদের বিঘে দশেক জমির প্রায় সবটাই দাদারা বাঁটোয়ারা করে নিয়ে নেবার পর তার ভাগে নিচু ডোবা জমি বর্তেছে বিঘা-দুয়েক। মা তাঁর ছোটো ছেলে যতীশকে নিয়ে বাস্তু জমির এককোণের ভাঙা ঘরটাতে বসত করেন। তার ভাগের দু-বিঘায় ধান বা গম যা হয় তাতে চাষের খরচ ওঠে না। তাছাড়া অমন জমি চাষ করার পুঁজিও মা-ব্যাটার নেই। সে-জমি তাই ভাগে দেওয়া আছে। যতীশের নিজস্ব কোনো স্থায়ী পেশা ছিল না। চারপাশের দশটা গ্রামে ছেড়ে পালা মুরগির ডিম কিনে এনে গঞ্জের বাজারে বিক্রি করা, পুজোর মরশুমে সদরে গিয়ে কাপড়ের দোকানে কাজ করা, ধান উঠবার সময় চালকলে দৈনিক মজুরিতে জোগাড় দেওয়ার কাজ, গঞ্জের পূবের মাঠে মিন্টু পাটিদারের গুল কারখানায় লেবারের কাজ, লোকের বাড়িতে বাগানের কাজ— ইত্যাদি যখন যা জোটে আর কী! মা এখনও অসংখ্য পুকুর বা ডোবার ধারে, মাঠেঘাটে গজিয়ে থাকা বেওয়ারিশ শাকপাতা তুলে বাজারে 'বিক্কিরি' করে, মুড়ি ভেজে, অপরের ধানসিদ্ধ করে দু-মুঠো জোগান— তাই দুবেলা ক্ষুণ্ণিবৃত্তি হয় যতীশের।
শিবেশের অবস্থা আরও সরেস। বন্ধুর সঙ্গে সদর থেকে পল্লী-এলাকার হাট পর্যন্ত সর্বত্র দৌড়েও ছুটকো কাজ ছাড়া আর কিছু জোটে না তার। দাদাদের সংসারে টাকা দিতে পারে না বলে দুবেলা যে খাবার জোটে তাতে পেট ভরে না, কিন্তু প্রত্যহ অভিমানী বেদনার মেঘ জমা হয় শিবেশের শিল্পী-চিত্তাত্মার মর্মদেশে।
তবু হরফে প্রাণসঞ্চারের টানে বার বার তাদের ফিরে আসতে হয় লিপিকর্মের অদ্ভুত স্বপ্ন-নেশায়।
সুমনের সান্নিধ্যে, সাইনবোর্ড লেখা এবং প্রচার-জ্ঞাপন শিল্পের সংস্পর্শে এই প্রথমবার দুই বন্ধু বুঝতে পারল যে, তাদের এই শিল্পকর্মের মূল্য যাচাইয়ে বিনামূল্যে সুবিধালাভকারী বুদ্ধিমানদের চাটুপূর্ণ স্তুতিবাদ ছাড়াও অন্যতর মাপকাঠি আছে। এবং সেই মাপকাঠি খুবই বাস্তব। তার পোশাকী নাম টাকা! আর ডাকনাম জীবিকা!
এই প্রথমবার যতীশ আর শিবেশ তাদের কাজের জন্য নিয়মিত অর্থ লাভ করে, জীবিকার্জনের নিশ্চয়তা পেয়ে বিশেষ চরিতার্থতার বোধে উদ্দীপ্তি অর্জন করল।
আমাদের অপেশাদারিত্বের কর্কশ নখরাঘাতে যতীশ-শিবেশের মতো শতেক লিপিশিল্পী বাংলা তথা ভারতের গ্রাম-শহর-গঞ্জ-বসত এলাকায় প্রতিদিন রক্তাক্ত হয়ে এসেছে! এঁদের কারও নাম শিবুরাম, কারও নাম নিধু লস্কর, কারও নাম শেখ জালালুদ্দিন কামারুদ্দিন, কারও নাম আশিক হুসেইন, কারও নাম ভালি মহম্মদ মীর কুরেশি, কারও নাম অববিন্দভাই পারমার, কারও নাম ফটিক দাস, কারও নাম বিপুল সেনরায়, পিন্টু বাহার— আবার কেউ সাক্ষাৎ আমাদের সুমন। এঁদের কারও বাড়ি পুরুলিয়ায়, কারও চন্দননগরে, কারও বাস দমদম নাগেরবাজারে, কারও চন্দনগাছির শহর এলাকায়, কারও দেশ খুলনা বা বরিশালে, কারও বা আমেদাবাদে, আর কেউ-বা আমাদের সুমনের মতো গৃহহারা, সবজায়গায় বহিরাগত, সর্বত্র অনুপ্রবেশকারী। এঁরা নামে ভিন্ন, বসবাসে ভিন্ন, কাজেও ভিন্ন। কিন্তু সময়ের আঘাতে সকলে সমানভাবে আহত ও রুধিরলিপ্ত!
.
.
.
দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা
অনন্ত জানা
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
মুদ্রিত মূল্য : ৫৪০ টাকা
সুপ্রকাশ
Comments
Post a Comment