টাঁড় পাহাড়ের পদাবলি।। মিহির সেনগুপ্ত।। সুপ্রকাশ।।
'টাঁড় সেই স্থান, যেখানে শুধু ঝাঁটি, ঝাড়, জঙ্গল, খাঁ-খাঁ ভূমি, পাথর এবং অসম্ভব দরিদ্র 'ডিংলাপারা' মানুষজন। তারা ওই মালভূমির খাঁজে-খাঁজে টিলার গোড়ালিতে কিছু চাষ-আবাদ করে, অথবা আশপাশ অঞ্চলের খনিতে কয়লা, অভ্র, ম্যাঙ্গানিজ এইসব আকর তোলে। যারা এসব কাজে দড় নয়, অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া এবং গভীর অরণ্যবাসী গোষ্ঠী, তারা জংলি লতা, গাছের আঁশ এই সব দিয়ে দড়ি বোনে, বনের কাঠ চুরি করে হাই রোডের ধারে সাজিয়ে বসে বিক্রি করার জন্য।
সাতঘাটের জল খেয়ে, সাতসতেরো হ্যাপা সেরে এ-রকম এক স্থানে আমার স্থিতি। এখানে ভূমির চরিত্র বড় বিশৃঙ্খলার। এ-ভূমি টাঁড় তো, ও ভূমি বহিয়ার। টাঁড়ে ভূমি বড় রুক্ষ, তথাপি বৃক্ষ সব বনস্পতি। নাবালের ভূমিতে জন্মকর্ম, ডাঙর হওয়া। সেখানে শস্য-শাবক, গাছপালা, বৃক্ষ লক্-লহমায় বাড়ে। তারা শ্যামলিমায় শ্যামল, কান্তিতে কান্ত। টাঁড়ে তা নয়। এখানের বৃক্ষ-বনস্পতির চরিত্র ভিন্ন। তাদের শরীরে কান্তভাব কম। কিন্তু তারাও কি ছায়া দেয় না? দেয়, তবে তফাত আছে। এই তফাতটি প্রকৃতি এবং মানুষের এক নতুন অধ্যায় খুলে দেয় চোখের সামনে। রুক্ষ কঠোর আদিম এই সৌন্দর্য।
বিশাল-বিস্তার এই ভূখণ্ডের বেশিটাই টাঁড়। কোথাও নাবাল, বহিয়ার আছে বটে, কিন্তু ওই দরিদ্র মানুষগুলো সেখানে থাকতে পারে না। সেসব ভূমি রইসদের দখলে। সে-সব স্থান বড় চমৎকার শোভন।
মানুষ নাবাল থেকে টাঁড়ে যায় তখনই, যখন অহেতুক উৎপাতে কোনো না কোনো বিপর্যয় ঘটে। এখানে যারা টাঁড়ের বাসিন্দা, তারা সেই উৎপাতের কারণেই নাবাল, বহিয়ার ভূমি ছেড়ে টাঁড়ে এসে নিজ নিজ ডেরাডাণ্ডা ফেলেছে। নাবাল, বহিয়ারে রইসরা তাদের থাকতে দিতে নারাজ। যেমন করে হোক সে-স্থান থেকে তাদের উৎখাত করে ছাড়বে তারা। জাতপাত নিয়ে হাজার হাঙ্গামা, হাজার ফ্যাসাদ। তবে এরই মধ্যে কিছু সহৃদয় মানুষ দেখেছি, এখনও যারা টাঁড়ের এই হতভাগ্যদের সঙ্গে বড়ো গভীর ভালোবাসায় একাত্ম।
এই ঝাঁটি জঙ্গল, খাঁ-খাঁ ভূমি আর আধমরা মানুষগুলোর মধ্যে এসে পড়ে পালিশ-করা নাগরিক মনমগজে আর গতরে বড়ো ঘিনিঘিনি ঝিনিঝিনি ভাব হয়েছিল। নাগাড়ে তেরাত্তির গুম মেরে বসে শুধু পালিশ-করা জীবনযাপনের জন্য হা-পিত্যেশ। স্থানের নাম তোপচাঁচি। সামনে শাহিসড়ক, পিছনে বেলমা পাহাড়। তার পাশের গাঁ-টির নাম বেলামু।
তেরাত্তিরের গুমরানো কাটল এক সকালে। সেদিন ছুটি। বেলামু গাঁওটির পাশের গাঁ লছমনপুর থেকে দুই কত্তাব্যক্তি এসেছেন। একজন ব্রাহ্মণ, অপরজন ক্ষত্রিয়। নাম, চন্দ্রশেখর ত্রিবেদী এবং বিক্রম সিং। বিক্রম স্থানীয় প্রাক্তন রাজার ব্যাটা, আর ত্রিবেদী তাঁদের পুরোহিত। সিং আবার লছমনপুরের মুখিয়াও বটেন। দু-দণ্ড গালগল্প। আলাপ পরিচয় শেষে 'নেওতা' দিয়ে গেলেন। ত্রিবেদী বললেন, একবার আসেন আইগা, জায়াগাটো জঙ্গল বট্যে, তবে খারাপ লাইগবে নাই।
মানুষটির কথাবার্তা শুনে বেশ এলেমবাগীশ মনে হল। সিং সাদামাটা, ফুর্তিবাজ মানুষ। সবেচেয়ে যে ব্যাপারটি মন কাড়ল— তা তাঁদের ভাষা। টাঁড়ের ব্যবহৃত শব্দগুলি মনের মধ্যে মাদল বাজাল। ভাষা মানুষকে মানুষের কাছে এক সম্মোহে টানে। মানুষের স্বাভাবিক ভাষা আমার আত্মীয় সন্ধানের জগৎ।'
টাঁড় পাহাড়ের পদাবলি
মিহির সেনগুপ্ত
প্রচ্ছদ : শুভশ্রী দাস
অলংকরণ : পার্থপ্রতিম সরকার, আত্রেয়ী সাহা
মুদ্রিত মূল্য : ২৯০ টাকা
সুপ্রকাশ
Comments
Post a Comment