রান্নাঘরের গল্প।। মহুয়া বৈদ্য।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।
সুপ্রকাশ প্রকাশিত মহুয়া বৈদ্যের বই 'রান্নাঘরের গল্প' পড়ে মতামত জানিয়েছেন সুমনা চৌধুরী। আমরা তাঁর অনুমতি নিয়ে নিজেদের টাইমলাইন থেকে শেয়ার করছি।
....................................................................
রান্নাঘর— আপাত উপেক্ষিত, দেওয়ালে তেল-হলুদের ছোপ পড়া ঝুলকালিমাখা আধো অন্ধকারময় এক অন্দরমহল, যার সাথে কয়েক শতক জুড়ে মেয়েদের অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রাখা সুনিশ্চিত করেছে আমাদের মধ্যবিত্তীয় মূল্যবোধ-যাপন। আদর্শ মা, আদর্শ বউ এসবের মাপকাঠি একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে এখনও রান্নাঘরের চারদেয়াল ঠিক করে দেয়। রান্নাঘরের রাজনীতি থেকে লিঙ্গ-সাম্যের রাজনীতি, গৃহশ্রমের ধারণা-মজুরী— যাত্রাপথ, আলোচনা, তত্ত্ব, তর্ক কম তো হয়নি দশকজুড়ে! আবার মেয়েদের রান্নাঘরকে কেন্দ্র করে নস্টালজিয়ায় মোড়া সাহিত্য, সিনেমা, সিরিজও কম হয়নি! সেসব অধিকাংশক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি পুরুষ লেখক বা নির্মাতার চোখে নারীর রান্নাঘরের শ্রম আর স্মৃতির বয়ান বা ভাষ্য। ঠিক এ-জায়গায় এসেই প্রশ্ন জাগে একজন নারী তাঁর রান্নাঘরের যাপন আর অভিজ্ঞতাকে কেমন করে দেখেন? কী বলতে চান তিনি বা তাঁরা? বদলে যাওয়া পারিপার্শ্ব, সময়, পরিস্থিতি, সমাজ, দেশ, রাজনীতি— কী অভিঘাত ফেলে রান্নাঘরের চারদেয়ালে?
এসব নানা প্রশ্নোত্তরের অন্তর্দ্বন্দ্বের মাঝেই সম্প্রতি পড়লাম মহুয়া বৈদ্যের ‘রান্নাঘরের গল্প’। বইটি মূলত স্মৃতিগদ্য, কিন্তু তা কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতি আখ্যান নয়— সময়, সামাজিক শ্রেণী, মধ্যবিত্তীয় মূল্যবোধ, সংস্কৃতির এক সম্মিলিত স্মৃতি। এমন এক সময়ের স্মৃতি যখন অসাম্প্রদায়িক বোধের প্রাথমিক চর্চাটুকু আমাদের প্রাত্যহিক জীবন চর্চার মাধ্যমে বাড়ির পরবর্তী প্রজন্ম শিখে যেত। পাড়া-প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে আসা খাবারের আদান-প্রদান, যেখানে ধর্ম বা জাতপাতের চেয়ে বড় হয়ে উঠতো হাতের স্বাদ এবং আন্তরিকতা। শিখে ফেলতো আরো অনেককিছুই সহজাত ভাবে। আর এখানে এসেই মহুয়ার বড়ো হয়ে উঠার আবহ-পরিস্থিতি-প্রতিবেশ ইত্যাদির সাথে আমাদের বড়ো হয়ে ওঠাও যেন কেমনভাবে মিশে যায়। বইটি হয়ে ওঠে মধ্যবিত্ত বাঙালি গৃহস্থ সংস্কৃতি-মূল্যবোধের নৃবৈজ্ঞানিক দলিলও।
বইটির শুরুতেই মহুয়া জানিয়েছেন তাঁর জীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রায় পঁচিশটি রান্নাঘর—এর মধ্যে এগারোটি তাঁর নিজের সংসারের। এই প্রাথমিক তথ্যই গোটা বইটির একটি আখ্যানগত দিক রচনা করে। রান্নাঘর বদলেছে, বাড়ি বদলেছে, সময় বদলেছে— কিন্তু স্মৃতি রয়ে গেছে। সেই স্মৃতিগুলোই মহুয়া আমাদের সামনে অ্যালবামের পাতার মতো উল্টে গেছেন। শৈশবের রান্নাঘরের স্মৃতি থেকে মহুয়ার মায়ের রান্নাঘর, তানজিলা, ঘুঁটে বিক্রি করতে আসা পাঞ্চালীর মা, কিংবা কয়লা এনে দেওয়া ঘটেদা—এইসব চরিত্রেরা মহুয়ার স্মৃতির রান্নাঘরকে এক বৃহত্তর সামাজিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। অনেকটা কমিউনের মতো। এসেছে মহুয়ার মামাবাড়ির বিশাল রান্নাঘরের বর্ণনা। সেখানে প্রায় বাইশজন মানুষের জন্য প্রতিদিন রান্না হয়। দিদার সেই বিশাল সংসারে রান্নাঘর যেন এক কর্মব্যস্ত থিয়েটার—যেখানে একসঙ্গে বহু মানুষের চলাফেরা, কাজ, হাসি আর ক্লান্তি মিলেমিশে এক রূপকথার দৃশ্য তৈরি করে। নববর্ষের দিনে নিরামিষ রান্নার আয়োজন, বড় সংসারের খাবার তৈরির ধাপ, বাড়ির ছোটোদের হুটোপুটি—এসবের মধ্যে দিয়ে ধরা পড়ে এক সময়ের যৌথ পরিবারের চালচিত্র।
কাজীসাহেবের বাড়ির রান্নাঘরের গল্প, মেজোনানা আর ছোটোনানার রান্নাঘরের গল্প, বুম্মির সাথে গড়ে ওঠা নিবিড় সম্পর্কের গল্প, মহুয়ার নিজের রান্নাঘরের গল্প— গোটা বইটিতেই রান্নাঘরের চারদেয়াল পেরিয়ে মহুয়া আস্ত এক সময়কে বর্ণনা করতে চেয়েছেন আসলে। একটা গোটা সময়, প্রতিবেশ, পরিস্থিতি, সংসার, সমাজ— সব নিয়েই। সে সময়কে পড়তে পড়তে কখনো হাসি-আনন্দ, কখনো মনকেমনের টুকরো মেঘ ঘিরে ধরে পাঠককে।
মহুয়ার গদ্যের ভাষা সহজ এবং আন্তরিক। নির্মেদ ঝরঝরে। পাঠককে কোথাও হোঁচট খেতে হয় না। আর যে বিষয়টি অত্যন্ত ভালো লেগেছে, মহুয়া কোথাও সরাসরি গুরুগম্ভীর তত্ত্বকথায়, ডিসকোর্স নির্মাণ বা রাজনৈতিক ভাষ্যে যাননি। তিনি স্মৃতি নকশীকাঁথার মতো বুনে গেছেন— শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে নিজের সংসার অব্দি। আর সেটুকু আসতে আসতে যে দৃশ্যপট এবং ছবি তৈরী হয়েছে সেটা হয়ে উঠেছে নারীর অদৃশ্য শ্রমের ইতিহাস। নারীর কাঙ্ক্ষিত একান্ত এক নিজের ঘর—নিজের বাড়ির স্বপ্নালু লড়াই। আবার কখনো সহজ সাবলীলভাবে ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতাকে হারিয়ে দেওয়া মানুষে মানুষে আন্তরিক সহাবস্থানের গল্প।
বইটির প্রতিটি চ্যাপ্টারের নামগুলোও খুবই আকর্ষণীয়। প্রথম চ্যাপ্টার ‘নারকেল দুধের ভাত’, এভাবেই ক্রমে ‘সোনা মুগের ডাল’, ‘চৌকোনা পরোটা আর আলুভাজা’, ‘রূপকথার রান্নাঘর’ সহ নয়টি চ্যাপ্টার পেরিয়ে ‘শেষপাতের চাটনি’তে এসে থেমেছে মহুয়ার ‘রান্নাঘরের গল্প’। আর যেটা না বললেই নয়, বইটির অলংকরণগুলো। খুবই ভালো। হার্ডকাভার বই। প্রচ্ছদটিও বইটির বিষয়ের সাথে খুবই যথাযথ।
………………………………………
রান্নাঘরের গল্প
মহুয়া বৈদ্য
মুদ্রিত মূল্য : ২০০ টাকা
সুপ্রকাশ
Comments
Post a Comment