বৃক্ষমানুষের ছায়া।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ

বেশ একটু শীত-শীত ভাব পড়ায় বিষাণের দু-কাঠার বেগুন গাছগুলো আবার চেগে উঠেছে। ফলে, তাকে ইদানীং ঘন ঘন বাজারে আসতে হচ্ছে। নিতাই এখন আর বিষাণের বেগুন রাখছে না, সে-জায়গা নিয়েছে শটে।

ফকিরবাবা আরও দু-চারটি বউ-ঝিকে ঝুড়ি বোনা শেখাচ্ছেন। তিনি বলেছেন— এতে সব’ক-টা সংসারেরই মেয়েদের আয় বাড়বে অনেক। সুরাহা হবে. কথাটা পাড়ার কারো কারো মনে ধরেছে। তাই গোবিন্দডাঙার পুবপাড়ার বাড়ি বাড়ি মেয়ে-বউদের কুলো আর ঝুড়ি বোনার ধুম চলছে।

অন্যদিকে, হকিম আলির কাছে কেউ কেউ শিখছে পুতুল বানানোর কায়দাকানুন। ফকিরবাবা বার বার বলেছেন— নদীর ধারে বাস, মাটির নেই অভাব। তিনি বলেন— নিজেদের শক্তি না-থাকলে অন্য-কেউ এসে শুধু সাহায্য দিয়ে বাঁচাতে পারবে না। শরীরের ভেতরে রোগ ঠেকানোর ‘ক্ষেমতা’ না-থাকলে ডাক্তার, বদ্যি, ওষুধপত্র কাউকে বাঁচাতে পারে না।

এর মধ্যেই দুই বন্ধু মধ্যদুপুরে বিষাণের বাড়িতে হানা দিয়ে ঝুড়ি বুননরত ফকিরবাবার কাছ থেকে আগের দিনের কথা, তেভাগাকালের গল্প, বিষাণের ঠাকুমা-ঠাকুদ্দা, বাবা-মা, শহিদ দানেশ শেখ— বাউলিয়া বা বাউলি থেকে গোবিন্দডাঙা পর্যন্ত এই জনপদের তেভাগার লড়াইয়ের গল্প শুনলেন— যদি ফকিরের কথা আর বংশীকাকার বিবরণ থেকে থেকে কোনো ইতিবৃত্ত দাঁড় করানো যায়! ফকিরের কথনে গৌর আর সুনন্দর সামনে যেন শিল্পী সোমনাথ হোরের ‘তেভাগার ডায়েরি’র স্কেচগুলি জীবন্ত হয়ে উঠল। সেই আধিয়ারের বাড়ি, সেই ধোঁয়া-ছড়ানো টেমির টিমটিমে আধো-আলোয় রহস্যময় গা-ছমছমে পরামর্শ-সভা, র্শ সেই বীর কৃষক ভলান্টিয়ারদের ধান কেটে নিজেদের গোলায় তোলা, সেই তেভাগা আন্দোলনের জানা-অজানা কৃষক-রমণীদের দৃপ্ত ছবি।

সেদিন ফিরবার পথে ফকিরের বিবরণ শুনে সোমনাথ হোরের ছবির অনুষঙ্গ জেগে ওঠার কথা সুনন্দকে বলছিলেন গৌর। সুনন্দ বললেন— ‘ঠিক বলেছ। ফকিরবাবা যেমন পুরোনো দিনের যেকোনো কথা বা পুরোনো কথা বলতে গেলে নিজেকে আড়ালে রাখেন, নিজের কথা সবচেয়ে কম বলেন, শিল্পী সোমনাথ হোরও তাঁর “তেভাগার ডায়েরি” রচনাটি ডায়েরি বলেই উত্তমপুরুষে অভিজ্ঞতার বর্ণনা করলেও, এই বইতে তিনি সবচেয়ে বেশি নির্ভরতা দিয়েছেন নিজের স্কেচবুকে আঁকা ছবিগুলোকে। সেখানে সবটা জুড়ে আছেন আন্দোলনের সহযোদ্ধারাই। তাদের মুখাবয়ব, দেহভঙ্গি এবং লড়াই! বইয়ের ভূমিকাটার নাম তো দেখেছ, কৈফিয়ৎ। সেখানে সোমনাথ সহযোদ্ধাদের কাছে প্রায় মার্জনা চেয়েছেন এই বলে যে, প্রকৃ ত কৃষক যোদ্ধারা রক্ত দিয়েছেন আর শহরের লোক হয়ে তিনি ও তাঁর মতো কর্মীরা আরাম কিনেছেন। সোমনাথের উপলব্ধি শহুরে মানুষেরা কৃষকদের দুঃখ বোঝেন কিন্তু প্রতিদিনের সেই দুঃখ ভোগ করেন না। শিল্পীর আশা কৃষক বা খেটে-খাওয়া মানুষেরা একদিন নিজেরাই ইতিহাস হয়ে উঠবেন, অন্যের লেখা ইতিহাসের বিষয়বস্তু হবেন না।’

গৌর গ্রামীণ রাস্তার ম্লান আলোয় বন্ধুর মুখের দিকে তাকালেন। সেই মুখে প্রজ্ঞার সঙ্গে ঈষৎ বিব্রতির ছায়া।

বিষাণের মুখে ফকিরবাবার কথা যত শোনেন, নিজেরা যতই দেখেন গৌর আর সুনন্দ ততই অবাক হন। তাঁরা বুঝতে পারেন— বৃক্ষ হয়ে অপরকে ছায়া দেওয়ার জন্য শক্ত আর স্বাস্থ্যবান গুঁড়ি, অজস্র ডালপালা ধরে রাখার মতো শিকড়ের ক্ষমতা আর নিরন্তর সালোকসংশ্লেষিত নীরোগ পাতা চাই। গৌর বুঝলেন— আজীবন শত-তত্ত্বের ফুলঝুরি ছোটালেও তাঁদের মতো মানুষের পুঁজি কত কম। কত সংকীর্ণতার মধ্যে তাঁরা জীবন কাটিয়ে এসেছেন। আর, সেটুকু নিয়েই কত স্ফীত হয়ে উঠেছেন নিজেদের মধ্যে!
...................................
বৃক্ষমানুষের ছায়া
দুর্লভ সূত্রধর
...................................

অলংকরণ : অদ্বয় দত্ত
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী

মুদ্রিত মূল্য : ৩৬০ টাকা

সুপ্রকাশ প্রকাশিতব্য

Comments

Popular posts from this blog

অনন্যবর্তী।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

অনন্যবর্তী।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।

অনন্যবর্তী।। দুর্লভ সূত্রধর।। সুপ্রকাশ।। পাঠপ্রতিক্রিয়া।।