দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা।। অনন্ত জানা ।। সুপ্রকাশ।।
সেটা বিগত শতকের নব্বই-এর দশকের মাঝামাঝি সময়। রাঢ় বাংলার একটা মাঝারি মাপের স্টেশনে আরও একগাদা মানুষের সঙ্গে কাঁচা-পাকা চুলওয়ালা একজন মানুষকে নামিয়ে দিয়ে দূরপাল্লার এক্সপ্রেস ট্রেনের ভারি ভারি চব্বিশ বগি তার প্রলম্বিত সর্পিল গা টেনে টেনে চলে গেল উত্তরবঙ্গের দিকে।
আপাতদৃষ্টিতে মানুষটির কোনো বৈশিষ্ট্য নেই— রোগাশোকা, মধ্য-বয়সী, গড় বাঙালির মতোই লম্বত্ব, গাত্রবর্ণ ঈষৎ বাদামি, সাধারণ প্যান্ট। প্যান্টের সঙ্গে হ্যান্ডলুমের পাঞ্জাবি পরনে— কাঁধ থেকে ঝুলছে সুপরিচিত নিত্যযাত্রীদের মতো একটা কালোরঙের সস্তার ছোটো কিট-ব্যাগ। তবু কেন যেন ভদ্রলোককে এখানকার স্থানীয় মানুষ বলে মনে হয় না। মুখে-চোখে, শরীরী ভাষায় কোথায় যেন গাঙ্গেয়-কোমলতা ছেয়ে আছে। ভদ্রলোকের চোখে ছিল আধা-অপরিচিতের উদ্ভ্রান্তি।
বর্ধমান পেরোবার পর এদিককার অনেক স্টেশনের প্ল্যাটফর্মই একটু নিচু, কিন্তু তুলনায় চওড়া এবং এই অঞ্চলের জনবিরল বসতিগুলোর চারপাশে ছড়িয়ে থাকা চাষের মাঠগুলোর মতোই একটু হা-হা ধরনের, ফাঁকাটে। প্ল্যাটফর্মের ওপর দোকানপাট নেই বললেই চলে।
যে জনতা ট্রেন থেকে নেমেছিল তারা দ্রুত-পায়ে নিষ্ক্রান্ত হওয়ায় প্ল্যাটফর্মটি অচিরেই জনশূন্যতার নৈঃশব্দে আক্রান্ত হলো। ভদ্রলোক একটু দাঁড়লেন, চারপাশটা একবার দেখে নিলেন। নাহ্, কোনো রেল-কর্মচারিরও দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। এই স্টেশনটির এমন চরিত্রের সঙ্গে তিনি অপরিচিত নন। তিনি জানেন যে, এখানে যত মানুষ ট্রেন থেকে নামে তাদের মধ্যে নব্বই শতাংশই এখানকার বাসিন্দা নন। তাঁরা যাবেন জেলা সদর বা সেখান থেকে বাস ধরে তার আশপাশে কোথাও। কিন্তু জেলা সদরে ট্রেন-যোগাযোগ না-থাকায় এখানে নেমে স্টেশনের সামনে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ট্যাক্সি, ট্রেকার বা অন্য কোনো ভাড়ার গাড়িতে বা রাজ্য সড়কে গিয়ে বাস ধরে মহকুমা-সদরে বা জেলা-সদরে যেতে হয়। তাই ট্রেন থেকে নেমে সকলেরই তাড়া থাকে। নিত্যযাত্রীদের অনেকে কয়েকজন মিলে মাসিক বন্দোবস্তে স্থায়ী ভাড়া গাড়িতে সদর থেকে যাতায়াত করে থাকেন।
স্টেশনের এই চরিত্র মানুষটির কাছে যথেষ্ট পরিচিত। কিন্তু সেই পরিচয়ের নাগাল পেতে আরও অন্তত দুটি দশক পেছিয়ে যেতে হবে।
এই আধা-গঞ্জেই বাবার চাকরি-সূত্রে থাকতেন তাঁরা— সেই কৈশোরে— সে যেন পুরাকালের কথা। এখানকার নতুন হওয়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পোস্টিং ছিলেন বাবা। বড়ো বড়ো শাল গাছের আলোছায়ায় সদ্য-হওয়া হেল্থসেন্টারের হলুদ রঙের নতুন বাড়ি— পাঁচ-ছয়টি ঘর নিয়ে একতলা ছোট্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্র। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পূর্বোত্তরে দু-কামরার আধা পাঁচিল-ঘেরা ডাক্তারবাবুর কোয়ার্টার— সেটার বহিরঙ্গের রঙও এলামাটির হলুদের মতো। অদূরে পলাশের নিমন্ত্রণ-ঘেরা রাজ্য সড়ক চলে গেছে বাঁ-দিকে মহকুমা শহর থেকে একেবারে সদর শহরের দিকে। এ-দুয়ের মাঝখানে সুবিস্তৃত হাইফেনের মতো ছিল এই গঞ্জটি।
সে এমন এক ছায়াচ্ছন্ন, মায়ানিষিক্ত উতলা সময়!
.
.
.
দেয়ালের লেখা : এক অন্তহীন প্রকীর্ণ শিল্পকথা
অনন্ত জানা
প্রচ্ছদ : সৌজন্য চক্রবর্তী
মুদ্রিত মূল্য : ৫৪০ টাকা
সুপ্রকাশ
Comments
Post a Comment